সবার আগে হাবীবুল কুদ্দুস খৃস্টানকে দেখতে পায়। তার পা দুটো টলমল করছে। মাথাটা এদিক-ওদিক দুলছে। তাকে পাকড়াও করা হলো। সে বিড় বিড় করে ওঠে। সাত-আটজন লোক রাতে যেখানে শুয়েছিলো, সেখানেই অচেতন পড়ে আছে। এক কক্ষে সুদানী, মিসরী এবং মেয়ে দুটো বস্ত্র ও বেহুশ পড়ে আছে। সৈনিকরা তাদের প্রত্যেককে তুলে নেয়। তাদের মালামাল তুলে নেয়া হলো। সব কজনকে ঘোড়ার পিঠে তুলে চৌকিতে নিয়ে আসা হলো। অততক্ষণে যোহরার চৈতন্যও ফিরে এসেছে।
দুপুরের পর থেকে বন্দিদের হুঁশ ফিরে আসতে শুরু করেছে। এখন তারা কায়রোর পথে। লোকগুলো ঘোড়ার সঙ্গে বাধা। বিশজন সৈনিক তাদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হাবীবুল কুদ্দুস তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলছেন না। কাফেলা চলতে থাকে।
মধ্যরাতের পর আলী বিন সুফিয়ানের চাকর তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে বললো, গবর্নর আপনাকে ডেকেছেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে গবর্নরের কক্ষে চলে যান। গিয়াস বিলবীসও সেখানে উপস্থিত। হাবীবুল কুদ্দুসকে উপবিষ্ট দেখে আলী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। হাবীবুল কুদ্দুস সেই সকল সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নাম বললেন, যাদের ব্যাপারে খৃস্টান সন্ত্রাসীদের আস্তানা থেকে জেনে এসেছেন। এরা বিশ্বাসঘাতক। এদের বিদ্রোহ সফল করে ভোলার কাজে অংশগ্রহণের কথা ছিলো। ভারপ্রাপ্ত গবর্নর তকিউদ্দীনের নির্দেশে লোকগুলো ঘরে ঘরে তৎক্ষণাৎ হানা দেয়া হলো এবং সব কজনকে গ্রেফতার করা হলো। তাদের ঘর থেকে যেসব হীরা-জহরত, সোনা মাণিক্য উদ্ধার হয়েছে, তা-ই তাদের অপরাধ প্রমাণ করছিলো।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী হাল অবরোধের লক্ষ্যে নগরীর সন্নিকটে আল-আখদার নামক স্থানে ছাউনি ফেলে অবস্থান করছেন। তিনি সিরিয়া ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে নিজ বাহিনীর কিছু কিছু সৈন্য তলব করে এনেছেন। হাল্ব সম্পর্কে সালারদের বলে রেখেছেন, এই নগরীর সাধারণ মানুষ মরণপণ লড়াই করবে, যেমনটি প্রথমবারের অবরোধে করেছিলো। যদিও ভেতর থেকে তার গোয়েন্দারা রিপোর্ট করেছিলো, কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধে হাবের অধিবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গী বদলে গেছে। সুলতান সতর্ক থাকার পক্ষপাতি। ওখানকার শাসক এখন ইমাদুদ্দীন, যিনি শাসক হিসেবে জনগণের প্রিয় নন। তারপরও সুলতান আইউবী আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হতে চাচ্ছেন না। তিনি এদিক ওদিক থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে আল-আখদারে অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
সুলতান আইউবী তার সালারদের সর্বশেষ নির্দেশনা প্রদান করছেন। তাদের জানান কায়রো থেকে দূত এসেছে। দূতের নিয়ে আসা পত্রখানা পাঠ করার পর সুলতানের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি উচ্চস্বরে বলে ওঠেন- আমার মন বলছিলো হাবীবুল কুদ্দুস আমাকে ধোকা দেবে না। আল্লাহ ইসলামের প্রতিজন কন্যাকে যোহরার জযবা ও ঈমান দান করুন।
আলী বিন সুফিয়ান নায়েব সালার হাবীবুল কুদ্দুসের ফিরে আসার সমস্ত কাহিনী লিখে পাঠিয়েছেন। পত্রে তার স্ত্রী যোহরার কথাও উল্লেখ করেছেন। সুলতান তৎক্ষণাৎ পত্রের উত্তর লেখান। তাতে গ্রেফতারকৃত গাদ্দারদের শাস্তির কথাও উল্লেখ করেন। তাদেরকে ঘোড়ার পেছনে বেঁধে ঘোড়া শহরে শহরে হাঁকাও। গাদ্দারদের গায়ের গোশত হাড়ি থেকে আলাদা না হওয়া পর্যন্ত ঘোড়া যেনো না থামে।
দুদিন পর সুলতান আইউবী হাবের উপর চড়াও হন। অবরোধ নয়- আক্রমণ অভিষান। বড় মিনজানিকের সাহায্যে নগরীর ফটকের উপর পাথর ও তরল দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ করা হয়। নগরীর পাঁচিলের উপর এবং ভেতরেও পাতিল নিক্ষেপ করে অগ্নিতীরের বৃষ্টিবর্ষণ করা হয়। দেয়াল ভাঙার জন্য নিয়োজিত সেনারা দেয়াল ভাঙতে শুরু করে। কিন্তু নগরবাসী ও ফৌজের পক্ষ থেকে তেমন শক্ত প্রতিরোধ এলো না। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তার রোজনামচায় লিখেছেন, হাবের শাসনকর্তা ইমাদুদ্দীনের আমীর-উজীরগণ তাঁর সহযোগিদের সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তিনি খৃস্টানদের থেকে সামরিক সাহায্য ছাড়াও বহু সোনা-জহরত গ্রহণ করেছিলেন। তার আমীর-উজীরদের লোভাতুর দৃষ্টি সেই সম্পদের উপর নিবদ্ধ { ভাগ দাও তো যুদ্ধ করবো। অন্যথায় নয়। তারা এমন দাবি-দাওয়া উত্থাপন করে বসে যে, সুলতান আইউবীর আক্রমণের ভয়ে পূর্ব থেকেই তটস্থ ইমাদুদ্দীন আরো সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন।
ইমাদুদ্দীন হাবের দুর্গপতি হুসামুদ্দীনকে এই আবেদন নিয়ে আইউবীর নিকট প্রেরণ করেন যে, আপনি আমাকে মসুলের সামান্য একটু অঞ্চল দান করুন। সুলতান আইউবী তার আবেদন মঞ্জুর করে নেন। এ সংবাদ নগরীতে ছড়িয়ে পড়লে জনতা ইমাদুদ্দীনের বাসভবনের সম্মুখে এসে জড়ো হয়। ইমাদুদ্দীন ঘোষণা করে দেন, হ্যাঁ, আমি হাবের ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি। তোমরা প্রতিনিধি প্রেরণ করে আইউবীর সঙ্গে বোঝাপড়া করে নাও।
নগরীর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ইযযুদ্দীন জ্বরদুক এবং যাইনুদ্দীকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করে সুলতান আইউবীর নিকট প্রেরণ করেন। তারা ১১৮৩ সালের ১১ জুন মোতাবেক ৫৭৯ হিজরীর ১৭ সংকর সুলতান আইউবীর নিকট গিয়ে পৌঁছেন। তারা হাবের সকল সৈন্যকে নগরীর বাইরে ডেকে এনে সুলতান আইউবীর হাতে তুলে দেন। ফৌজের সঙ্গে হাবের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং আমীর-উজীরগণও বেরিয়ে আসেন। সুলতান আইউবী তাদের প্রত্যেককে মূল্যবান পোশাক উপহার দেন।
