না- হাবীবুল কুদ্দুস উত্তর দেন- এ পন্থাটা তোমার আসার পরে আপনা থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমি অন্য কিছু চিন্তা করেছিলাম। তোমাকে আমার মুক্তির জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিলো। ইচ্ছা ছিলো, তোমাকে বার্তাবাহক বানাবো। কিন্তু এখানে এসে মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার পর আমার মাথায় এ বুদ্ধিটা আসে। তোমার বুদ্ধিমত্তা ও সাফল্যে এখন আমরা মুক্ত। আমরা বাড়াবাড়ি না করে লোকগুলোর প্রতি আস্থা ও সমর্থন জ্ঞাপন করি। আমি জানতাম, ওরা অস্বাভাবিক চালাক হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা যদি ঈমান ও হুশ-জ্ঞান অটুট রাখি, তাহলে ওরা নির্বোধ। আমার সঙ্গে তুমি যে লোকটাকে দেখেছিলে, সে নিজেকে মিসরী মুসলমান দাবি করতো। আমি প্রথম দিনই বুঝে ফেলেছি, লোকটা খৃস্টান এবং আমি খৃস্টানদের জালে এসে পড়েছি।
***
পাহাড়ি অঞ্চল থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছেন হাবীবুল কুদ্দুস ও যোহরা। মাঝ নদীটা এখন পূর্বের চেয়ে বেশি উত্তাল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নৌকাটা নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নীলের দয়ার উপর ছেড়ে দিয়েছে। দাঁড় বৈঠা কোনো কাজ করছে না। নদীর উতলার তীব্রতায় বোঝা যাচ্ছে, এ স্থানটায় এসে নদী সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এই সেই বাঁক, যার সম্মুখে মিসরের সামরিক চৌকির অবস্থান। হঠাৎ নৌকা দাঁড়িয়ে গিয়ে চক্কর কেটে ঘুরে যায়। হাবীবুল কুদ্দুস বৈঠাটা শক্ত করে ধরে রেখেছেন। নদীর শোর আরো বেড়ে গেছে। নৌকা ঘূর্ণিপাকে পড়ে গেছে। হাবীবুল কুদ্দুস নৌকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হলেন না। দুই আরোহীসহ নৌকা নীলের অতলে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
যোহরা- হাবীবুল কুদ্দুস চীৎকার করে বললেন- আমার পিঠে চড়ে বস।
যোহরা হাবীবুল কুদ্দুসের পিঠে সওয়ার হয়ে উভয় বাহু দ্বারা শক্তভাবে গলায় জড়িয়ে ধরে রাখে। হাবীবুল কুদ্দুস বললেন- আরো শক্ত করে ধরো। আমার থেকে আলাদা হয়ো না। বলেই পাকের উপর সাঁতরাতে সাঁতরাতে নৌকা থেকে এমনভাবে লাফিয়ে পড়েন, যেনো ঘূর্ণিপাক থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন।
হাবীবুল কুদ্দুস যোহরাকে নিয়ে পানির ভেতর চলে যান এবং দেহের সবটুকু শক্তি প্রয়োগ করে আবার ভেসে ওঠেন। তিনি ঘূর্ণিপাক থেকে বেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু জায়গাটা বাঁক। উভয় দিকে চড়া। ফলে তরঙ্গ অত্যন্ত উঁচু এবং বিক্ষুব্ধ। যোহরা সাঁতার জানে না। সে আল্লাহর নিকট দুআ করতে শুরু করে। হাবীবুল কুদ্দুস তাকে পিঠে বহন করে তরঙ্গমালার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তার ও যোহরার মুখ যাতে পানির বাইরে থাকে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ ঢেউ বারংবার তাকে ডুবিয়ে উপর দিয়ে অতিক্রম করছে।
ঊর্মিমালা হাবীবুল কুদ্দুসকে নদীর বাঁক থেকে বের করে নিয়ে যায়। এবার নদীটা চওড়া হয়ে গেছে। হাবীবুল কুন্দুসের বাহু ও পা অবশ হয়ে গেছে। তিনি শক্তির শেষ বিন্দুটুকু একত্রিত করে এই স্রোত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জোর চেষ্টা চালাতে শুরু করেন। তিনি অনুভব করেন, সোহরাব বন্ধন ঢিলা হয়ে গেছে। হাবীবুল কুদ্দুস বুঝে ফেলেন, যোহরার সুখ ও নাকের পথে পানি ঢুকে গেছে। তাকে রক্ষা করা ও নিজে সাঁতার কাটা দু হয়ে পড়েছে। তিনি এক হাতে যোহরাকে ধরে সর্বশক্তি ব্যয় করে সাঁতার কেটে খরস্রোত থেকে বেরিয়ে যান। কূল এখনো অনেক দূরে। এখন সাঁতার কাটা সহজ হয়ে গেছে। হাবীবুল কুদ্দুস সাহায্যের জন্য চীৎকার করতে শুরু করেন। হাবীবুল কুদ্দুসের দেহটা নিস্তেজ হয়ে আসে। যোহরাও তার হাত থেকে ছুটে যাওয়ার উপক্রম হয়। এমন সময় একটা নৌকা তার নিকটে এসে যায়। কানে শব্দ ভেসে আসে- কে? হাবীবুল কুদ্দুস শেষবারের মতো অবশ হাতটা উপরে তোলে খপ করে নৌকার কিনারা ধরে ফেলে বলে ওঠেন- ওকে আমার পিঠ থেকে তুলে নাও। নৌকার লোকেরা যোহরাকে টেনে উপড়ে তুলে নেয়। মেয়েটা চৈতন্য হারিয়ে ফেলেছে। নৌকাটা তারই বাহিনীর। এখানেই তাদের চৌকি। তারা হাবীবুল কুদ্দুসের ডাকে এদিকে এসেছে।
চৌকিতে পৌঁছে হাবীবুল কুদ্দুস জানান, আমি নায়েব সালার হাবীবুল কুদ্দুস। চৌকির কমান্ডার তাকে চিনে ফেলেন এবং অত্যন্ত বিস্মিত হন। যোহরা অচেতন পড়ে আছে। হাবীবুল কুদ্দুস তাকে উপুড় করে শুইয়ে পিঠ ও পাজরে সজোরে চাপ দেন। তাতে মুখ ও নাকের পথে অনেক পানি বেরিয়ে আসে। তবে এখনো তার সংজ্ঞা ফিরে আসেনি। হাবীবুল কুদ্দুস কমান্ডারকে বললেন, দুটি বড় নৌকায় দশ দশজন করে সৈনিক আরোহণ করাও এবং পার্বত্য অঞ্চলের দিকে রওনা হও। তিনি জানান, পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে যে পুরাতন জীর্ণ প্রাসাদ আছে, তাতে দশ বারোজন খৃস্টান সন্ত্রাসী সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে আছে। তাদেরকে তুলে আনতে হবে। আমার স্থল পথের রাস্তাটা জানা নেই।
আমি চিনি- কমান্ডার বললো- স্থল পথেই যাওয়া সহজ হবে।
বিশজন অশ্বারোহীর সম্মুখে হাবীবুল কুদ্দুস ও চৌকির কমান্ডার। ভোরের আলো এখনো ফোটেনি। আবছা অন্ধকার। তারা পার্বত্য এলাকায় ঢুকে পড়েছে। নীরবতার খাতিরে ঘোড়াগুলো বাইরেই রেখে তারা পায়ে হেঁটে এগিয়ে যায়। নদী হাবীবুল কুদ্দুসের দৈহিক শক্তি চুষে নিয়েছিলো। তারপরও হাঁটছেন তিনি। স্ত্রীকে অচেতন অবস্থায় চৌকিতে রেখে এসেছেন। স্ত্রীকে সারিয়ে তোলার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার। পাহাড়-টিলার সরু অলি-গলি অতিক্রম করে এগিয়ে যায় তারা। কিছুক্ষণ পর প্রাসাদ চোখে পড়তে শুরু করে।
