এদের সব কজনকেই হত্যা, করবো? যোহরা হাবীবুল কুদ্দুসকে জিজ্ঞেস করে।
আমাদের এক্ষুনি বেরিয়ে যাওয়া আবশ্যক- হাবীবুল কুদ্দুস বললেন- আমাকে নদী পর্যন্ত নিয়ে চলো।
যোহরা পথটা দেখে রেখেছে। আগে না দেখলে এ পথে বের হওয়ার সাধ্য তাদের ছিলো না। যোহরা আগে আগে হাঁটতে শুরু করে। তারা পা টিপে টিপে হাঁটছে। কান চারটা একদম খাড়া। যোহরা বর্শা আর হাবীবুল কুদ্দুস তরবারী তাক করে রেখেছে।
যোহরা হাবীবুল কুদ্দুসকে নৌকার কাছে নিয়ে যায়। এটি খৃস্টানদের লুকিয়ে রাখা নৌকা। দুজনে বাঁধন খুলে নিয়ে নৌকায় চড়ে বসে। হাবীবুল কুদ্দুস আস্তে আস্তে দাঁড় বাইতে শুরু করে, যাতে শব্দ না হয়। প্রতি মুহূর্তে এবং প্রতি পদে ভয়, কোনো না কোনো দিক থেকে কেউ বেরিয়ে আসে কিনা কিংবা কোনো দিক থেকে তীর ছুটে আসে কিনা। কিন্তু কিছুই হলো না। নৌকা পর্বতমালার সরু পথে বেরিয়ে যায়। নদীর শোর কানে আসতে শুরু করে।
আল্লাহর নাম নাও যোহরা?- হাবীবুল কুদ্দুস বললেন- আর একটা দাঁড় তুমিও হাতে নাও। তুমি জিহাদে অংশ নেয়ার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছিলে। আল্লাহ তোমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন। আমরা এখনো বিপদ থেকে বের হইনি। নৌকাটা নদীর মাঝে নিয়ে চলল।
দুজনে দাঁড় বাইতে শুরু করে। নৌকা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে। পর্বতমালার কালো দৈত্যগুলো পেছনে সরে যেতে এবং ধীরে ধীরে ছোট হতে শুরু করেছে।
***
পানিতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ নীলনদ। সময়টা নদ-নদীর ভর যৌবনের। কূল ঘেঁষে ঘেঁষে স্রোতের গতিতে চলা নিরাপদ। মাঝে বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালা একটির উপর একটি আছড়ে পড়ছে। কাজেই, মাঝ নদী অনিরাপদ। কিন্তু কূল ঘেঁষে চলায় অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ। শত্রুর তীর এসে ইহলীলা সাঙ্গ করে দিতে পারে দুজনের। অগত্যা কূল ত্যাগ করে মাঝ পথেই যাওয়াই শ্রেয় মনে করলেন হাবীবুল কুদ্দুস।
নৌকার গতি ঘুরিয়ে দিলেন মাঝের দিকে। শত্রুর কবল থেকে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে হঠাৎ অনুভব করলেন, কোনো একটা শক্তি তাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে গেছে। শক্তিমান ঢেউ মাথায় করে নৌকাটা উপরে তুলছে, আবার আছড়ে ফেলে দিচ্ছে। স্রোতের গতিতে নৌকা এগিয়ে চলছে তর তর করে। হাবীবুল কুদ্দুস যোহরাকে বললেন ভয় পেও না। আমরা ডুববো না। আমি দিকটা একটু নির্ণয় করে নিই।
আপনি আমার চিন্তা করবেন না- যোহরা বললো- ডুবে যদি যাই তো কী হবে? কাফেরদের কবল থেকে তো বেরিয়ে এসেছি।
হাবীবুল কুদ্দুস চোখ তুলে পর্বতমালার দিকে তাকান। উঁচু উঁচু পর্বতগুলো এখন মাটির টিপির ন্যায় মনে হচ্ছে। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন- আমি এ জায়গাটা চিনি। এই অঞ্চলেরই এক স্থানে আমি আমার বাহিনীকে পাহাড়ি যুদ্ধের মহড়া করিয়েছিলাম। এদিকে নদীর দিকটা সম্পর্কে অবহিত ছিলাম না। আমরা সোজা কায়রোই যাচ্ছি। নীলনদ আমাদেরকে অতি দ্রুততার সাথে কায়রো নিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর শোকর আদায় করো যোহরা। এটা আল্লাহর সাহায্য। আল্লাহ মানুষের নিয়ত বোঝেন। তবে আমাদেরকে কায়রোর আগে অন্য এক স্থানে থামতে হবে। কিছুদূর আগে নদীর বাঁক আছে। তারই সন্নিকটে আমাদের ফৌজের চৌকি। সামুদ্রিক টহলের জন্য তাদের কাছে অনেক নৌকা আছে। এ চৌকির সৈন্যদের দ্বারাই আমরা ওদের সকলকে পাকড়াও করাতে পারবো। কিন্তু তারা সজাগ হয়ে যাবে।
আমি আশা করি, কাল দুপুর পর্যন্ত তাদের একজনেরও ঘুম ভাঙবে না- যোহরা বললো- তারা আমার হাতে মদ খানিকটা বেশিই পান করেছে। আমি ভরা সোরাহী থেকে তাদেরকে যে এক এক পেয়ালা করে পান করিয়েছিলাম, তাতে খাকি বর্ণের সামান্য পাউডার মিশিয়ে দিয়েছি।
ওটা কী জিনিস?
মেয়ে দুটোর হৃদয়ে আমি কী পরিমাণ আস্থা অর্জন করে নিয়েছিলাম, তাতে আমি প্রতি রাতে আপনাকে অবহিত করেছি যোহরা বললো- গতকালের ঘটনা। তারা আমাকে হাশিশ দেখিয়ে তার ব্যবহার প্রণালী বুঝিয়ে দিয়েছে। পড়ে একটি ডিবা খুলে আমাকে এই পাউডারগুলো দেখিয়ে বললো, কোনো কোনো লোককে অনেক সময় অজ্ঞান করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এখান থেকে সামান্য পাউডার শরবত পানি কিংবা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাইয়ে দিলে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর তাকে যেখানে খুশি তুলে নিয়ে যাও। আজ রাত যখন আমি মটকা থেকে সোরাহী ভরতে গেলাম, তখন ওখান থেকে অর্ধেক পাউডার তাতে মিশিয়ে নিয়েছিলাম। বস্তুটার ক্রিয়া যদি সেরূপই হয়, যেরূপ মেয়েরা বলেছে, তাহলে কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের সংজ্ঞা ফিরে আসবার কথা নয়।
হাবীবুল কুদ্দুসের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু করে। এ অশ্রু আনন্দের। এ অশ্রু আবেগের। এ অশ্রু যোহরার কৃতিত্ব ও সাহসিকতার প্রশংসার। তিনি রুদ্ধকণ্ঠে বললেন- আমি তোমাকে অনেক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছিলাম যোহরা। তোমাকে আমি যে জগতের রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলাম, সে হচ্ছে পাপের, নোংরা অথচ অত্যন্ত সুদৃশ্য জগত। আমার জন্য তুমি অনেক কুরবানী দিয়েছে।
আপনার জন্য নয়। ইসলামের জন্য যোহরা বললো- আমি আপনার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি যে, আপনি আমাকে এই পবিত্র কর্তব্য পালনের সুযোগ দিয়েছেন। আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না, আমি পাপের সেই চিত্তাকর্ষক জগতে গিয়েও নিজের আঁচলকে পাপ থেকে পবিত্র রেখেছি। ভালোই হলো যে, এখানে নিয়ে আসার পর তারা আমাকে আপনার সঙ্গে নির্জনে থাকতে দিয়েছে। অন্যথায় আপনি আমাকে জানাতে পারতেন না, তারা আপনাকে বিদ্রোহ করার জন্য অপহরণ করেছে। আচ্ছা, আপনি কি আমাকে এ কাজের জন্যই ডেকে পাঠিয়েছিলেন?
