এক হতে পারে, আমি ফেরত চলে যাবো– হাবীবুল কুদ্দুস বললেন- এটিই উত্তম পন্থা। তবে আমার ফেরত না যাওয়াই উচিত। কারণ, গেলে আমাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোথায় ছিলাম। যোহরা আমাকে বলেছে, আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীস বলছেন, আমি আপন মর্জিতে শত্রুর নিকট চলে এসেছি। ফিরে গেলে এই সন্দেহের ভিত্তিতে তারা আমাকে হেফাজতে নিয়ে নেবেন। তারপর শুরু হওয়ার আগেই আমাদের খেল খতম হয়ে যাবে। আমি আসলে স্ত্রীকে এখানে ডেকে এনে ভুল করেছি। যদি তাকেও ফেরত পাঠিয়ে দেই, তার সঙ্গেও অসদাচরণ করা হবে। আমাকে এখানেই থাকতে হবে। আপনারা আমাকে ভাববার সুযোগ দিন, আমি কোন্ কোন্ কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করবো।
হাবীবুল কুদ্দুসের অফাদারিতে আর কোনো সন্দেহ থাকলো না।
***
হাবের অবরোধ তামাশা হবে না- সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ফোরাতের তীরে বসে তার সালারদের বলছেন- তোমাদের প্রত্যেকের স্মরণ থাকবে, পূর্বেও একবার আমরা এই নগরীটা অবরোধ করেছিলাম। কিন্তু হাবের মানুষ এমন প্রাণপণ লড়াই করে যে, আমরা অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। সে ছিলো হাল্ববাসীদের বীরত্ব, যা আমাদেরকে ফিরে আসতে বাধ্য করেছিলো। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। তথাপি আমাদেরকে প্রতিটি আশঙ্কার মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। এখান থেকে ফৌজে যে ভর্তি নেয়া হয়েছে, তাদের উপর এখনো ভরসা করা যাবে না। মিসর থেকে সাহায্য চেয়ে পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। আমি নায়েব সালার হাবীবুল কুদ্দুসের বাহিনীটাকে নিয়ে আসবো। বলেই সুলতান নীরব হয়ে যান। তার চেহারার রং বদলে যায়। তিনি চাপা চাপা কণ্ঠে বললেন- আমি মানতে পারছি না, হাবীবুল কুদ্দুস আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। লোক্টা গেলো কোথায়? আমি যখন মিসর থেকে রওনা হই, তখন সে আমাকে বলেছিলো, আপনি মিসুরের চিন্তা মাথা থেকে ফেলে দিন। ক্রুসেডার কিংবা সুদানীদের যদি আপনার অনুপস্থিতিতে মিসরের উপর আক্রমণ চালায়, তাহলে আমার তিন হাজার পদাতিক আর দুই হাজার অশ্বারোহী তাদের আক্রমণ প্রতিহত করে দেবে। আর যদি মিসরের ভেতর থেকে কেউ মাথা জাগায়, তাহলে তার মাথা ধড়ের সঙ্গে থাকতে পারবে না। আমরা আল্লাহর সৈনিক। কিন্তু হাবীবুল কুদ্দুস তো আল্লাহর সিংহ ছিলো।
মনে হয় তার এসব গুণাবলী দেখেই দুশমন তাকে গুম করে ফেলেছে- এক সালার বললেন- আমাদের অর্ধেক ফৌজের উপর তার গভীর প্রভাব রয়েছে। এদিক থেকে তিনি স্বয়ং একটি শক্তি। দুশমন আমাদেরকে সেই শক্তি থেকে বঞ্চিত করে দিলো।
তাকে যদি খুঁজে না-ই পাওয়া গেলো, তাহলে তার বাহিনীকে এখানে নিয়ে আসবো- সুলতান আইউবী বললেন- তবে এতো তাড়াতাড়ি ডাকবো না। মিসরের প্রতিরক্ষা বেশি জরুরি। আশঙ্কার ব্যপার হচ্ছে, মিসরের বাইরে থেকে অতোটুকু সমস্যা নেই, যতোটুকু ভেতর থেকে আছে। ঈমান বিক্রেতারা আমাদের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। তারা ফিলিস্তীনকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পরম বিশ্বস্ত এবং যোগ্যতাসম্পন্ন নায়েব সালার কায়রো থেকে দূরে পাহাড়বেষ্টিত এক ভীতিকর জীর্ণ প্রাসাদে বসে মিসরে বিদ্রোহ করার সকল আয়োজন-পরিকল্পনা সম্পন্ন করে ফেলেছেন। এখন রাত। জীর্ণ প্রাসাদে উৎসব চলছে। বাইরে থেকে কোনো লোক এখানে এলে ভয়ে পালিয়ে যেতো। এই গোটাকতক পুরুষ আর রূপসী মেয়েদের দেখলে জিন-পরী মনে করতো।
এরা আট-দশজন পুরুষ। হাবীবুল কুদ্দুস প্রথম দিন থেকে পরিচিত খৃষ্টান লোকটা আর পরে আসা মিসরী ও সুদানী লোক দুজনকে ছাড়া আর কাউকে চেনেন না। অন্যদেরকে এই আজই প্রথমবার দেখলেন। তারা সকলে এই প্রাসাদে হাবীবুল, কুন্দুসের আগমনের পূর্ব থেকেই অবস্থান করছে। কিন্তু তারা পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে লুকিয়ে পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো। হাবীবুল কুদ্দুস পালাতে গিয়ে যে লোকটাকে হত্যা করেছিলেন, এরা তারই সহকর্মী। এখন আর পাহারার প্রয়োজন নেই। হাবীবুল কুদ্দুস তাদের বিশ্বস্ত ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে গেছেন। তারা গোপনে গোপনে তাকে পরীক্ষাও করে দেখেছে।
আজ রাত পুরো দলটি উৎসবে উপস্থিত। কোনো রাজপ্রাসাদে যেরূপ নিমন্ত্রণের আয়োজন করা হয়, আজ এখানেও অনুরূপ আয়োজন করা হয়েছে। একের পর এক মদের সোরাহি শূন্য হচ্ছে। মেয়ে দুটো নাচ দেখিয়েছে। হাবীবুল কুদ্দুস অনুষ্ঠানে শরীক ছিলেন। কিন্তু তিনি মদপান করতে অস্বীকার করেন। তাকে বাধ্য করা হলো না। যোহরা অন্য মেয়েদের ন্যায় মদ পরিবেশন করে। কিন্তু নিজে পান করেনি। খৃস্টান লোকটি সুদানী ও মিসরীয়কে যোহরা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলে দিয়েছে। অন্যথায় হাবীবুল কুদ্দুস বিগড়ে যেতে পারে। যোহরা অনুষ্ঠানের আনন্দ-উল্লাসে অংশগ্রহণ করলেও অন্য মেয়েদের ন্যায় অশ্লীলতা প্রদর্শন করেনি।
মধ্যরাত নাগাদ সকলে মদে মাতাল হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে। মিসরী ও সুদানী লোকটি মেয়ে দুটোকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। যোহরা হাবীবুল কুদ্দুসকে চোখে ইশারা করে। হাবীবুল কুদ্দুস উঠে যান। মিসরী ও সুদানী মেয়ে দুটোকে নিয়ে যে কক্ষে গিয়েছিলো, যোহরা সেই কক্ষে উঁকি দিয়ে তাকায়। চারজনই বিবস্ত্র পড়ে আছে। একজনেরও সংজ্ঞা নেই। ওদের অস্ত্র কোথায় থাকে, যোহরার জানা আছে। সে একটা বর্শা, একটা তরবারী, দুটো ধনুক ও তীর ভর্তি দুটিকে তৃনীর তুলে নেয়। হাবীবুল কুদ্দুস তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। যোহরা এলে তিনি তার হাত থেকে তরবারীটা নিয়ে নেন। একটা ধনুক ও একটা নীর কাঁধে ঝুলিয়ে নেন। আরেকটা তৃনীর ও বর্শা যোহরার কাছেই থেকে যায়।
