যোহরা মেয়ে দুটোর সঙ্গে এমনভাবে একাকার হয়ে যায় যে, এখন বলার উপায় নেই, মেয়েটা কোনো সম্ভ্রান্ত পিতা-মাতার কন্যা এবং একজন মুসলিম নায়েব সালারের স্ত্রী। হাবীবুল কুদ্দুস তাকে নিজের অনুগত স্ত্রী মনে করতেন।
একদিন যোহরা মেয়েদের বললো, এই জীর্ণ ভবন আর পর্বতবেষ্টিত জগতে আমি অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছি। মেয়েরা বললো, ঠিক আছে, আমরা তোমাকে এই বাইরের জগত দেখানো ব্যবস্থা করবো। তারা এক পার্বত্য পথে তাকে একটি ঝিলের কিনারায় নিয়ে যায়। কূল বেয়ে বেয়ে আরো অগ্রসর হলে সে নীলনদ দেখতে পায়। এই নীল নদেরই পানি পার্বত্য অঞ্চলে ঢুকে ঝিলের সৃষ্টি হয়েছে। এক স্থানে এক পাহাড়ের আড়ালে একটি নৌকা বাঁধা আছে। তাতে, বৈঠা ও দুটি দাঁড় আছে। জায়গাটা খুবই সুদৃশ্য ও মনোরম। যোহরা মেয়েদের সঙ্গে সেখানে হাসি-তামাশা করতে থাকে।
এখানে ফেরাউনদের রাজকন্যারা খেলা করতো। এক মেয়ে বললো।
আর তোমরা দুজন তাদের প্রেতাত্মা। যোহরা রসিকতা করে।
তোমার তুলনায় আমরা প্রেতাত্মা-ই। অপর মেয়ে বললো।
শোনো, যোহরা!- এক মেয়ে বললো- তুমি কি বুঝতে পেরেছো, তোমার এই বৃদ্ধ স্বামী এখানে কেন লুকিয়ে বসে আছে এবং তোমাকে কেননা ডেকে এনেছে।
সে তো প্রথম দিনই আমাকে বলে দিয়েছেন- যোহরা বললো- আমি কাজটা করে দেবো। কিন্তু তিনি কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে বলছেন।
আর তুমি কি জানো, আমরা স্বাধীন মিসরের রাজকন্যা হবো?
আমাকে যদি এই স্বামী থেকে মুক্ত করিয়ে দিতে পারো, তাহলে আমি তোমাদেরকে রাজকন্যা মনে করবো। যোহরা বললো।
সে পরিকল্পনা ঠিক হয়ে আছে- এক মেয়ে বললল- কিন্তু তোমার স্বামী বিষয়টা জানে না। এ ক্ষেত্রে তোমাকে যে কাজটা করতে হবে তুমি কি তার জন্য প্রস্তুত আছো?
সময় আসলেই দেখবে- যোহরা বললো- আমার যদি এ কাজটা করতে না হতো, তাহলে স্বামীকে এখানেই খুন করে ফেলতাম। ভালোই সুযোগ ছিলো।
***
যোহরা পরদিনও মেয়েদের সঙ্গে নদীর কূলে চলে যায়। মেয়েরা তাকে যে পথে নদী পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে, একা গেলে এ পর্যন্ত যোহরা পথ খুঁজে পেতো না। পথটা প্রাকৃতিক এবং গোপন। যোহরা আবদার জানায়, চলো আমরা নৌকায় চড়ে নদীতে বেড়িয়ে আসি। কিন্তু মেয়েরা তাতে অসম্মতি জানায়।
হাবীবুল কুদ্দুসের উপরও এখন আগের মতো পাবন্দি নেই। তিনি নিশ্চিত করেছেন, তিনি স্বাধীন মিসরের সমর্থক এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর মসনদ না উল্টিয়ে ক্ষান্ত হবেন না। এখন তিনি আগ বাড়িয়ে কথা বলছেন। এক অভাবিতপূর্ব বিপ্লব এসে গেছে তার মধ্যে।
এক-দুদিন পর ভগ্ন প্রাসাদে আরো দুজন লোক আসে। একজন সুদানী, অপরজন মিসরী। তাদেরকে হাবীবুল কুদ্দুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করানো হলো। তিনি তাদেরকে চেনেন না। তাদের সঙ্গে সুদান, মিসর ও আরবের মানচিত্র আছে। আছে কিছু কাগজপত্রও।
তারা হাবীবুল কুদ্দুসের সঙ্গে বিদ্রোহের বাস্তব পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ আলাপ করে। হাবীবুল কুদ্দুস শুধু আন্তরিকতাই প্রকাশ করেননি। বরং তাদেরকে এমন সব পরামর্শ প্রদান করেন, যা ইতিপূর্বে তাদের মাথায় আসেনি। তারা হাবীবুল কুদ্দুসকে আরো কয়েক ব্যক্তির নাম জানায়, যারা মিসরের ফৌজ ও প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং গোপনে গোপনে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে পরিবেশ সৃষ্টি করছে। লোক দুজন আরো জানায়, মিসরের সীমান্ত এলাকায় মিসরী ফৌজের যে বাহিনীটি কর্তব্য পালন করছে, তাদেরকে ভুল নির্দেশ দিয়ে, সীমান্ত প্রতিরক্ষায় এমন একটা ফাটল ধরাতে হবে, যার সুযোগে সুদানের কিছু সৈন্য ভেতরে অনুপ্রবেশ করে বিদ্রোহে সহযোগিতা দিতে পারে।
বিদ্রোহ সফল হলে মিসরের আমীর কে হবেন? হাবীবুল কুদ্দুস জিজ্ঞেস করেন।
সংগঠন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, স্বাধীন সেনাপতি আপনি হবেন। সেই সুবাদে আমীরও হবেন আপনিই। মিসরী বললো- সালাহুদ্দীন আইউবী আক্রমণ করবেন, তাতে সন্দেহ নেই এবং যুদ্ধ দীর্ঘরূপ লাভ করতে পারে। সে কারণে স্বাধীন মিসরের প্রথম আমীর প্রধান সেনাপতিই হওয়া যুক্তিযুক্ত। কেননা, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অসামরিক লোককে ক্ষমতার গদিতে বসানো ঠিক হবে না। আর আপনার মধ্যে যে গুণাবলী আছে, অন্য কোন সালারের মধ্যে তা নেই।
হাবীবুল কুদ্দুসের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে যায়। বুকটা ফুলে যায়। ঘাড়টা মোটা হয়ে যায়। মিসরের আমীর হওয়া কি চাট্টিখানি কথা!
প্রয়োজন দেখা দিলে আমরা খৃস্টানদের থেকেও সাহায্য নেয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছি। আশা করি, এতে আপনার কোনো আপত্তি থাকবে না। সুদানী বললো।
তাদেরকে বিনিময়টা কীভাবে দেবেন? হাবীবুল কুদ্দুস জিজ্ঞেস করেন।
তাদের জন্য বিনিময় এটুকুই যথেষ্ট যে, আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো এবং মিসরকে তার থেকে মুক্ত করবো–মিসরী বললে তারা মিসর চায় না। তারা ফিলিস্তীনকে আইউবীর হাত থেকে রক্ষা করার কাজে ব্যস্ত। মিসর হাতছাড়া হয়ে গেলে আইউবী মিসরের সেনাবাহিনী, এখানকার রসদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়বেন। তিনি মিসরের উপর আক্রমণ চালালে তার সঙ্গে যেসব মিসরী সৈন্য আছে, তারা তাদের মিসরী ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। খৃস্টানদের জন্য এ এক বিরাট পাওয়া।
হাবীবুল কুদ্দুস তাদেরকে চমৎকার চমৎকার সব বুদ্ধি শিখিয়ে দেন এবং তাদের নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, আমার অধীনে যে পাঁচ হাজার সৈন্য আছে, তারা আমার এক ইঙ্গিতে বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাদেরকে বিদ্রোহের জন্য রাজি করানোর পন্থা কী হবে।
