হ্যাঁ- যোহরা বেদনামাখা কণ্ঠে বললো- তিনি আমাকে ক্রয় করেছেন। আমি পালিয়েও কোথাও যেতে পারছি না। আমার অন্য কোন আশ্রয়ও নেই।
আশ্রয় পেলে পালিয়ে যাবে?
সেই আশ্রয় যদি আমার বর্তমান জীবন থেকে উন্নত হয়, তাহলে অবশ্যই পালাবো- যোহরা বললো এবং জিজ্ঞেস করলো- তিনি আমাকে এখানে কেন ডেকে পাঠিয়েছেন? তোমরা কারা? তিনি আমাকে বিক্রি করছেন নাকি?
তুমি যদি আমাদের নিকট এসে পড়ো, তাহলে রাজকন্যা হয়ে থাকবে- এক মেয়ে বললো- তোমাকে বলে দেবো, আমরা কারা। তবে তার আগে দেখতে হবে তুমি আমাদের সঙ্গে থাকার যোগ্য কিনা। তুমি কি আমাদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে আমাদের ন্যায় উলঙ্গ হয়ে পুকুরে গোসল করতে পারবে?
ঐ পশুটা থেকে আমাকে মুক্ত করে দাও, তো যা বলবে তা-ই করবো। যোহরা উত্তর দেয়।
এক ব্যক্তি যোহরাকে খাওয়ার জন্য ডাকতে আসে। বললো, নায়েব সালার খাবার সামনে নিয়ে আপনার অপেক্ষা করছেন।
যোহরা চলে গেলে যে খৃস্টান লোকটি হাবীবুল কুদ্দুসের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলো, সে কক্ষে প্রবেশ করে। মেয়েরা আনন্দ প্রকাশ করে বললো- মেয়েটা আমাদের কাজের এবং বৃদ্ধ স্বামীর প্রতি তার প্রচণ্ড ঘৃণা। তুমি অনুমতি দিলে আমরা তাকে নিজেদের রঙে রঙিন করে নিতে পারি। দেখেছো তো, কতো রূপসী। চঞ্চলতা, দুরন্তপনা আছে। দেহ কঠোরতা সহ্য করতে পারবে। প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
কিন্তু আমি ভাবছি লোকটা বলতো, এই স্ত্রীর উপর তার আস্থা আছে। বার্তা আদান-প্রদান করতে পারবে- খৃস্টান বললো- মেয়েটা সত্যিই যদি লোকটাকে ঘৃণা করে থাকে, তাহলে তো সে তাকে ধোঁকা দেবে এবং আমাদের প্রত্যেককে ধরিয়ে দেবে। তার অর্থ হচ্ছে, এ কাজে আমাদেরকে তাড়াহুড়া করা যাবে না। লোকটা আমাদের জালে এসে পড়েছে। আমাকে সে মিসরী মুসলমান ও দেশপ্রেমিক বলে বিশ্বাস করে নিয়েছে। সে আমাদের হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত হয়ে গেছে। মেয়েটা যদি তাকে ধোকা দিতে রাজি হয়, তাহলে আমরা তাকে ব্যবহার করতে পারি। আমি তাকে যাচাই করে দেখবো। তোমরা রাতে অল্প সময়ের জন্য তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। আমার কাছে রেখে কোনো এক বাহানায় তোমরা বেরিয়ে যাবে।
আহারের কিছুক্ষণ পর মেয়েরা পুনরায় গল্প করার নাম করে যোহরাকে নিয়ে আসে। তারা তাকে পূর্বের চেয়ে বেশি ফ্রি বরং বলা চলে অনেকটা বেহায়া বানিয়ে ফেলেছে। খৃস্টান এসে উপস্থিত হলে যোহরাকে রেখে মেয়ে দুটো বেরিয়ে যায়। মেয়েরা যোহরার সঙ্গে যে ধারায় কথা বলেছিলো, পুরুষটিও একই ধারায় কথা বলে। খৃস্টান তাকে যাচাই যা করার করে এক পর্যায়ে বাহুতে আকড়ে ধরে কাছে টানতে শুরু করে। যোহরা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো- আমি এমন সস্তা নই যে, একটু ইঙ্গিত করলেই কারো কোলে লুটিয়ে পড়বো।
উত্তরটা খৃস্টান লোকটার ভালো লাগে। যে কারো হাতে আসবার মতো মেয়ে নয়। তাদের গোয়েন্দা ও নাশকতাকারী মেয়েদের যেসব। গুণ থাকে, এর মধ্যেও সেসব বিদ্যমান। সামান্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। যোহরা তাকেও বলেছে, স্বামীটার প্রতি আমার প্রচণ্ড ঘৃণা। কিন্তু যেহেতু সে বাধ্য এবং ঘৃণার কথা প্রকাশ করতে পারে না, তাই তিনি মনে করেন, আমি তাকে ভালোবাসি।
এখনো ঘৃণা প্রকাশ করবে না- খৃস্টান বললো- আমি তোমাকে তার থেকে মুক্ত করিয়ে দেবো। তুমি রাজকন্যাদের ন্যায় জীবন-যাপন করবে। তুমি এখানেই বসে থাকো। আমি তোমার বান্ধবীদেরকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
খৃস্টান কক্ষ থেকে বেরিয়ে মেয়েদের নিকট চলে যায়। বললো মেয়েটা কাজের। নিজেদের ছায়ায় নিয়ে নাও। হাবীবুল কুদ্দুস মেয়েটাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসে। আমরা তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে নিয়ে সংবাদ আদান-প্রদানে কাজে লাগাবো। তাকে জালে আটকানো তোমাদের কাজ। রাজকীয় জীবনের মুলা দেখাও। আর তাকে কী উদ্দেশ্যে কীভাবে প্রস্তুত করতে হবে, তোমরা জানো।
যোহরা হাবীবুল কুদ্দুসের সঙ্গে হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা প্রকাশ করতে থাকে, এবং খৃস্টান পুরুষ ও মেয়ে দুটোকে বলতে থাকে, স্বামীর প্রতি আমার অন্তহীন ঘৃণা। মেয়ে দুটো তাকে সঙ্গে রাখতে এবং বাইরে নিয়ে যেতে শুরু করেছে। ঝরনার পুকুরে নিয়ে গেলে যোহরা অবলীলায় পরিধানের সমুদয় কাপড় খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে পুকুরে নেমে মেয়ে দুটোর সঙ্গে খেলতে শুরু করে। তারপর এটা তার নিত্যদিনের কর্মসূচিতে পরিণত হয়ে যায়। যোহরা রাত কাটাচ্ছে স্বামীর সঙ্গে। আর দিবস অতিবাহিত করছে মেয়ে দুটোর সাথে। মাঝে-মধ্যে দিনের বেলা খৃষ্টান পুরুষও তার সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ কথাবার্তা বলছে। চার-পাঁচ দিনেই যোহরা সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে মেয়ে দুটোর রঙে রঙিন হয়ে যায়। তার চাঞ্চল্য ও দুরন্তপনা বেহায়াপনার রং ধারণ করতে শুরু করেছে। মেয়েরা ধীরে ধীরে তাকে তাদের রহস্যময় জীবন সম্পর্কে ধারণা দিতে শুরু করেছে।
ইতিমধ্যে খৃস্টান লোকটি হাবীবুল কুদ্দুসের সঙ্গে বিদ্রোহের পরিকল্পনা প্রস্তুত করে ফেলেছে। পরিকল্পনা প্রণয়নে হাবীবুল কুদ্দুস তাকে বেশ সাহায্য করেছেন। হাবীবুল কুদ্দুস এখন তার পূর্ণ আস্থাভাজন ব্যক্তি। সে হাবীবুল কুদ্দুসকে মিসরী ফৌজের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ দুজন অফিসারের নাম বলে, যারা গোপনে গোপনে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরোধিতা করছে এবং বিদ্রোহের কথা চিন্তা করছে। হাবীবুল কুদ্দুসকে হাত করার চিন্তা প্রথমে তাদেরই মাথায় আসে। এই খৃস্টান লোকটি নিজেকে দেশপ্রেমিক মিসরী মুসলমান পরিচয় দিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। তার দায়িত্ব মিসরে সেনা বিদ্রোহ ঘটানো।
