তাহলে তো তাকে অপহরণ করতে হবে- খৃষ্টান বললো- আমরা যদি বলি, আপনি তাকে আসতে বলেছেন, তাহলে তিনি বিশ্বাস করবেন না। তাছাড়া তিনি আমাদেরকে ধরিয়েও দিতে পারেন। বরং আমি আপনাকে যে উত্তম বিকল্প পেশ করেছি, আপনি তাই বরণ করে নিন। সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য অন্য কারো ঠিকানা দেন।
তাহলে তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো- হাবীবুল কুদ্দুস বললেন- আমাকে কায়রো পৌঁছিয়ে দাও। আমি এক মাসের মধ্যে বিদ্রোহ করিয়ে দেবো।
এ হতে পারে না- খৃস্টান বললো- আমরা যা কিছু করছি মুহতারাম! মিসরের স্বার্থেই করছি। আর তাতে আপনারও স্বার্থ আছে। আমি কিংবা আমার সংগঠনের কোন সদস্য মিসরের শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখি না। আপনি বুঝবার চেষ্টা করুন।
আমি বুঝে ফেলেছি- হাবীবুল কুদ্দুস বললেন- আর আমি বুঝে শুনেই কথা বলছি। তোমরা আমার স্ত্রী যোহরাকে আমার নিকট চলে আসতে সংবাদ পাঠাও। সে যে কাজ করতে পারবে, অন্য কেউ তা পারবে না। তার চলে আসার পর দেখবে, আমি কীভাবে পরিকল্পনা সফল করে তুলি।
***
যে মহিলা যোহরার পথ আগলে দাঁড়ালো, সে এক ভিখারিনী। মহিলা দুতিন দিন যাবতই দেখে আসছে, প্রতি দিন দুপুরের পর যোহরা হাবীবুল কুদ্দুসের ঘর থেকে বের হয়ে পিতার ঘরে যাচ্ছে। ভিখারিনী : তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো- নায়েব সালার হাবীবুল কুদ্দুস আপনাকে যেতে বলেছেন। এই নিন তার নিজ হাতে লেখা চিঠি।
যোহরা কাগজখানা হাতে নিয়ে ভাজ খুলে পড়ে। তার স্বামীরই হাতের লেখা। ভিখারিনী বললো- তিনি যেখানেই আছেন নিজে গেছেন। এতো বড়ো ব্যক্তিত্বটাকে কেউ তুলে নিয়ে যেতে পারে না। তিনি কেবলই আপনাকে কামনা করছেন এবং বলছেন, আমি যোহরাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। আমি আপনাকে এও বলে দিচ্ছি, যদি আপনি আমাকে ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন কিংবা পুলিশে খবর দেন, তাহলে দুজনকেই হত্যা করা হবে। আপনার হাবীবুল কুদ্দুসের নিকট যাওয়া খুবই জরুরি।
আমি তোমাকে কীভাবে বিশ্বাস করবো? যোহরা জিজ্ঞেস করে।
আমি ভিখারিনী নই- মহিলা জবাব দেয়- এটা আমার ছদ্মবেশ। আমিও আপনার ন্যায় রাজকন্যা। আমাদের উদ্দেশ মহৎ ও পবিত্র। আপনি মনে কোনো সংশয় রাখবেন না।
মহিলা আরো এমন অনেক কথা বলে, যদ্বারা যোহরা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। সে মহিলার কথা মতো রাতে একস্থানে চুপি চুপি উপস্থিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। সে এই ভয়ে কাউকে কিছু বলেনি যে, মহিলা বলেছিলো বিষয়টা আপনার ও আপনার স্বামীর জীবন-মরণের এবং মিসরের স্বাধীনতা ও গোলামীর সাথে সম্পৃক্ত।
রাতে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে যোহরাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ভিখারিনীর সঙ্গে দুজন পুরুষ এসে হাজির হয়। অন্ধকারে যোহরা লোক দুজনকে চিনতে পারেনি। ভিখারিনীকে চিনেছে তার কণ্ঠে। কিন্তু এখন তার ভিখারিনীর বেশ নেই- এক রূপসী তরুণী। সে যোহরাকে বললো- আল্লাহর উপর ভরসা করে এদের সঙ্গে চলে যান। অন্তরে কোনো ভয় রাখবেন না।
যোহরাকে একটি ঘোড়ায় তুলে বসানো হয়। তারাও ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। যোহরা এমন এক সফরে রওনা হয়, যার গন্তব্য তার জানা নেই। মহিলা ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। শহর থেকে দূরে এক স্থানে পৌঁছে আরোহীরা যোহরাকে বললো, তোমার চোখে পট্টি বাঁধতে হবে। যোহরা একা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের শক্তি তার নেই। তার চোখে পট্টি বেঁধে দেয়া হলো।
দুদিন পরে খবর হলো, নায়েব সালার হাবীবুল কুদ্দুসের ছোট স্ত্রীও নিখোঁজ হয়ে গেছে। প্রাথমিক তদন্ত করা হলো। গোয়েন্দারা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয় তাকে অপহরণ করা হয়েছে। হাবীবুল কুদ্দুস। সম্পর্কেও সকলের ধারণা, তিনি ক্রুসেডার কিংবা সুদানীদের নিকট চলে গেছেন। এখন মানুষ বলছে, তার স্ত্রীও তার কাছে চলে গেছে। কেউ জানে না, মহিলা কখন কীভাবে গেছে।
এতোক্ষণে যোহরা হাবীবুল কুদ্দুসের নিকট পৌঁছে গেছে। সেই কক্ষে তার চোখ খোেলা হলো, যেখানে তার স্বামী তার সম্মুখে দণ্ডায়মান। মেয়েটা এই গোটা রাত এবং আগের আধা দিন সফরে ছিলো। পথে খাওয়া-দাওয়ার সময় শুধু তার চোখ খুলে দেয়া হয়েছে। অপহরণকারীরা তার সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কথা বলেনি। তারা তাকে অভয় দিয়ে দিয়ে নিয়ে আসে।
হাবীবুল কুদ্দুসকে দেখার পর যোহরার দেহে প্রাণ ফিরে আসে। খৃস্টান লোকটা সঙ্গে আছে। হাবীবুল কুদ্দুস যোহরাকে বললো- ইনি আমাদের বন্ধু। আমরা এখানে কারো কয়েদি নই। তুমি অনেক ক্লান্ত। আজ রাতটা বিশ্রাম নাও। কাল সকালে বলবো, তোমাকে কী করতে হবে। তুমি অনেক সময় বলতে, তোমার পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জিহাদ করতে ইচ্ছে হয়। আমার এই বন্ধু তোমার জন্য বেশ ভালো সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
খৃস্টান দুজনকে একাকি রেখে বাইরে বেরিয়ে যায়।
যোহরা এখনো তরুণী। রূপে আকর্ষণ আছে। ছেলেবেলার চাঞ্চল্য, দুরন্তপনা এখনো পুরোপুরি বিদ্যমান। হাবীবুল কুদ্দুস যে দুটি মেয়েকে পুকুরে গোসল করতে দেখেছিলেন, সন্ধ্যার খানিক আগে তারা যোহরার কক্ষে এসে পড়ে। এসেই এমনভাবে আলাপ জমিয়ে ফেলে, যেনো যোহরা তাদের বহুদিনের চেনা। তারা যোহরাকে অন্তরঙ্গ বান্ধবীর ন্যায় সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এলাকাটা ভয়ংকর এক ধ্বংসাবশেষ বটে, কিন্তু মেয়েগুলো যেখানে থাকে, সেটি এখন সাজানো-গোছানো কক্ষ। রঙিন ঝাড়বাতি জ্বলছে। এই কক্ষে প্রবেশ করলে ধ্বংসাবশেষের কল্পনাও মনে আসে না। যোহরা অল্প সময়ে তাদের সঙ্গে মিশে যায়। এক মেয়ে যোহরাকে বললো- তোমার বাবা-মা কতো নিষ্ঠুর, তারা তোমার ন্যায় ফুটন্ত কলিটাকে এই বৃদ্ধের পায়ে নিক্ষেপ করেছে। লোকটা তোমাকে ক্রয় করেনি তো?
