আমার দ্বারা তুমি কী কাজ করাতে চাও?
আপনি যদি আমার বক্তব্য বুঝে থাকেন, তাহলে আমি বলতে পারি, আপনি কী কাজ করতে পারেন- খৃস্টান উত্তর দেয়- আপনার মনে যদি সন্দেহ থাকে, তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করুন। আগে সন্দেহ দূর করুন। আমি আপনাকে চিন্তা করার সুযোগ দিলাম। আপনি এইমাত্র ঘুম থেকে জাগ্রত হয়েছেন। হতভাগ্যদের দেয়া হাশিশের ক্রিয়া এখনো, দূর হয়নি। আমি আপনার জন্য নাস্তা পাঠাচ্ছি। এতোদিনে লোকগুলো আপনাকে গোসল করার সুযোগটা পর্যন্ত দেয়নি। আমি আপনাকে একটি কূপে নিয়ে যাবো।
খৃস্টান লোকটি উঠে বাইরে বেরিয়ে যায়। সামান্য পরে অপর এক ব্যক্তি এসে বললো- আমার সঙ্গে চলুন। নাস্তার আগে গোসলটা সেরে নিন।
জীর্ণ ভবন থেকে হাবীবুল কুদ্দুসকে অন্য এক পথে বের করে নেয়া হয়। পথটি পার্বত্য অঞ্চলের ভেতরের দিকে চলে গেছে। খানিক দূরে একটি ঝরনা, যার স্ফটিকস্বচ্ছ পানি ক্ষুদ্র একটি প্রাকৃতিক পুষ্করিনীতে গিয়ে সঞ্চিত হচ্ছে। হাবীবুল কুদ্দুস কয়েকটি পর্বত ঘুরে ঘুরে ঝরনার নিজট গিয়ে পৌঁছুলে দেখতে পান, দুটি মেয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় গোসল করছে আর একে অপরের গায়ে পানি ছিটাচ্ছে। হাবীবুল কুদ্দুস অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেন। মেয়ে দুটো হঠাৎ চিৎকার জুড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। এই বিজন ভূমিতে মেয়ে দুটোকে জিন-পরী বলে মনে হলো। হাবীবুল কুদ্দুস এদিক ওদিক তাকান। সবদিকেই পাহাড়। তিনি পেছন দিকে দৃষ্টপাত করেন। তার সঙ্গে আসা লোকটি তার সামনে সামনে হাঁটছে।
হাবীবুল কুদ্দুস হঠাৎ ছোঁ মারার মতো করে এক বাহু দ্বারা লোকটার ঘাড় ঝাঁপটে সাধ্য পরিমাণ চেপে ধরে অপর হাত দ্বারা পূর্ণ শক্তিতে তার পেটে তিন-চারটি ঘুষি মারেন। লোকটি দম আটকে মরে যায়। হাবীবুল কুদ্দুস লাশটা টেনে-হেঁচড়ে একটি ঘন ঝোঁপের পেছনে ফেলে দিয়ে নিজে পালাতে উদ্যত হন। এক পাহাড়ের মধ্যকার পথটা আগেই দেখে নিয়েছেন। সেখানে পৌঁছে দেখতে পান, এক ব্যক্তি বর্শা তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটি শুধু বললো- ফেরত। হাবীবুল কুদ্দুস নিরস্ত্র। অগত্যা মাথানত করে পেছন পানে মোড় ঘোরান। কয়েক পা অগ্রসর হয়েছেন মাত্র। হঠাৎ উক্ত খৃস্টান লোকটি তার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে যায়। লোকটি মিটি মিটি হাসছে।
আমি আপনাকে বুদ্ধিমান মনে করি- খৃস্টান বললো- আপনি এই অঞ্চল থেকে বের হতে পারবেন না। অযথা বোকা সাজবেন না। গোসল করে আমার সঙ্গে আসুন।
হাবীবুল কুদ্দুস সুবোধ বালকটির ন্যায় পুকুরে নেমে গোসল করে কাপড় পরিধান করেন। খৃস্টান লোকটি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। পথে তিনি খৃস্টানকে জিজ্ঞেস করেন- এই মেয়েগুলো কি তোমাদের সঙ্গে থাকে?
হ্যাঁ, এমনি বিজন অঞ্চলে এমন চাকচিক্য সঙ্গে রাখতে হয়- খৃস্টান বললো- আপনারও তো ওখানে তিনটি বউ ছিলো। এখন প্রয়োজন হলে আপনিও এদের যাকে পছন্দ হয়, সঙ্গে রাখতে পারেন।
এমন সময় এক মেয়ে নাস্তা নিয়ে আসে। হাবীবুল কুদ্দুস তার প্রতি তাকিয়ে থাকেন। মেয়েটি তার পাশে বসে পড়ে। খৃস্টান লোকটি বেরিয়ে যায়। মেয়েটি কথা ও আচরণে হাবীবুল কুদ্দুসকে পাগল করে তোলে। অনেক পরে যখন খৃস্টান ফিরে আসে, তখন মেয়েটি চলে যায়। তখন হাবীবুল কদুসের মনে আক্ষেপ জাগে।
আপনি স্বাধীন মিসরের প্রধান সেনাপতি হবেন- খৃস্টান বললো আপনার বাহিনীতে যে তিন হাজার পদাতিক এবং দুহাজার অশ্বারোহী আছে, তারা প্রত্যেকে আপনার অনুগত ও অনুরক্ত। আপনি তাদেরই সাহায্যে মিসরের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিতে পারেন।
সালাহুদ্দীন আইউবী যদি আক্রমণ করেন, তাহলে কি আমি এই বাহিনী দ্বারা মিসরকে তার থেকে রক্ষা করতে পারবো?
মিসরের বাহিনীতে যেসব সুদানী মুসলমান রয়েছে, তারা আমাদের সঙ্গে থাকবে- খৃস্টান বললো- আইউবীর বাহিনীতে যেসব মিসরী আছে, আমরা তাদের নিকট সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবো, এটা গৃহযুদ্ধ নয়- মিসরীয়দের মিসরকে মুক্ত করার লড়াই। আপনি আপনার বাহিনী দ্বারা বিদ্রোহ করাবেন। আপনাকে সামরিক শক্তি সরবরাহ করার দায়িত্ব আমাদের।
খৃস্টান লোকটি স্ববিস্তার হাবীবুল কুদ্দুসকে তাদের পরিকল্পনা ব্যক্ত, করে। হাবীবুল কুদ্দুস এখন আর আপত্তি করছেন না। বরং এমনভাবে প্রশ্ন করছেন, যেন তিনি সম্মত হয়ে গেছেন।
আমি কায়রো ফিরে না গেলে বিদ্রোহ কীভাবে করাবো? হাবীবুল কুদ্দুস জিজ্ঞেস করেন।
আপনাকে কায়রো যেতে হবে না- খৃস্টান বললো- আপনি এখান থেকেই আপনার নির্ভরযোগ্য সঙ্গীদেরকে বার্তা প্রেরণ করবেন। বার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা আমরা করবো। আপনি আমাদের একজন মূল্যবান লোককে হত্যা করে ফেলেছেন। সেই অপরাধে আমরা আপনাকে মেরে ফেলতে পারি। আমাদের বাহু এতো লম্বা যে, আপনার বংশের প্রতিজন সদস্যকে আমরা খুন করতে পারি। আপনি যদি আমাদেরকে ধোকা দেন, তাহলে আমরা তা-ই করে দেখাবো।
তার মানে, এখানে আমাকে বহুদিন থাকতে হবে। হাবীবুল কুদ্দুস বললেন।
কিছুদিন তো থাকতেই হবে। খৃস্টান উত্তর দেয়।
আমার একটি প্রয়োজন পূরণ করে দাও- হাবীবুল কুদ্দুস বললেন তুমি আমাকে দুটি মেয়ে পেশ করেছে। আমি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে চাই। এমনও হতে পারে, এরূপ রূপসী মেয়েদের জালে আটকা পড়ে আমি নিজের আসল উদ্দেশ্য ভুলে যাবো। তার চেয়ে বরং আমার ছোট স্ত্রীকে এখানে এনে দাও। তার নাম যোহরা। আমি তাকে বার্তা আদান-প্রদানেও ব্যবহার করতে পারবো।
