এক সন্ধ্যায় দুজন লোক হাবীবুল কুদ্দুসের ঘরে যায়। তারা একটি গ্রামের নাম উল্লেখ করে বললো, ওখানকার একটি মসজিদের ছাদ ধসে গেছে। এখন পুরো মসজিদটিই নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। এলাকাবাসী আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে কাজটা করে ফেলতে প্রস্তুত। এখন আমাদের একজন মুরুব্বীর প্রয়োজন। আপনি এলে কাজটা সহজে হয়ে যাবে। এ মর্মে তারা বেশকিছু আবেগময় কথা বলে হাবীবুল কুন্দুসের হৃদয়টা গলিয়ে ফেলে। তিনি তাদের সঙ্গে রওনা হয়ে যান। নগরী থেকে বেরিয়ে গেলে আরো চার ব্যক্তি তাদের সঙ্গে এসে যোগ দেয়। হঠাৎ ছয়জন মিলে তাকে ঝাঁপটে ধরে ফেলে উল্লিখিত স্থানে নিয়ে যায়। ওখানে পৌঁছেই তার অজান্তে তারা তাকে হাশিশ খাইয়ে দেয়।
***
কায়রোতে মিসরী গোয়েন্দারা হাবীবুল কুন্দুসের অনুসন্ধানে গলদঘর্ম সময় অতিবাহিত করছে। সকলেরই ধারণা, তিনি সুদানী কিংবা ক্রুসেডারদের নিকট চলে গেছেন। নিজ বাহিনীর উপর হাবীবুল কুদ্দুসের কী পরিমাণ প্রভাব বিদ্যমান, আলী বিন সুফিয়ানের তা জানা আছে। সে কারণে তিনি মিসরের ভারপ্রাপ্ত গভর্নরের অনুমতিক্রমে বিষয়টা সুলতান আইউবীকে অবহিত করে রেখেছেন। ধারণা ছিলো, তিনি তার নির্ভরযোগ্য কমান্ডারদের নিকট কোন বার্তা প্রেরণ করবেন। গোয়েন্দারা চতুর্দিকে সতর্ক দৃষ্টি মেলে রাখে। কিন্তু কারো প্রতি তার কোনো বার্তা আগমনের কোনো তথ্য পাওয়া গেলো না। তার বাহিনীর কোনো কমান্ডার উধাও হয়ে যায় কিনা সেদিকেও কড়া নজর রাখা হচ্ছিলো। কিন্তু এতোদিনে একজন কমান্ডারও উধাও হয়নি।
খৃস্টান লোকটি গোটা রাত হাবীবুল কুদ্দুসের নেশার ক্রিয়া দূর হওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। পরদিন সে হাবীবুল কুদ্দুসের পাশে গিয়ে বসে। হাবীবুল কুদ্দুস এখনো ঘুম থেকে জাগ্রত হননি। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে তিনি এদিক-ওদিক তাকান। খৃস্টান লোকটির উপর চোখ পড়ামাত্র তিনি উঠে বসেন এবং গভীর দৃষ্টিতে তার প্রতি তাকিয়ে থাকেন।
আমি দুঃখিত যে, লোকগুলো আপনার সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছে- খৃস্টান বললো- আপনি এতো বিস্মিত ও অস্থির হবেন না। অভাগারা আপনাকে হাশিশ পান করিয়ে সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিলো। আপনি হাশিশ আর ফেদায়ীদের পন্থা-পদ্ধতি সম্পর্কে নিশ্চয়ই অবগত আছেন। তারা আপনাকে অপমান করেছে। এর জন্য আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি আপনাকে কোনো স্বপ্ন দেখাবো না। আমি আপনার সম্মুখে অত্যন্ত সুদর্শন এক বাস্তবতা উপস্থাপন করবো। আপনি নিজেকে কয়েদি ভাববেন না। আমি আপনার মর্যাদা উঁচু করে দেবো। আপনার একবিন্দু অপমান হতে দেবো না।
এরা প্রতারণার মাধ্যমে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলো- হাবীবুল কুদ্দুস বললেন- পরে বোধ হয় অন্য কোথাও নিয়ে গিয়েছিলো। তিনি দৃষ্টি ঘুরিয়ে চারদিকে তাকান এবং বিস্মিত কণ্ঠে বললেন- সেটা অত্যন্ত সুন্দর ও মনোরম জায়গা ছিলো। আমাকে এখানে কে নিয়ে এসেছে?
আপনি নিজেকে জাগ্রত করুন- খৃস্টান বললো- এসব হাশিশের ক্রিয়া। আপনি প্রথম দিন থেকেই এখানে আছেন।
আমাকে অপহরণ করা হয়েছে?- হাবীবুল কুদ্দুস বাস্তবতায় ফিরে আসতে শুরু করেছেন। খানিক ভয়জড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন- তুমি কে?
আমি আপনার এক মুসলমান ভাই- খৃস্টান বললো- আমার আপনার থেকে নেয়ার মতো কিছু নেই। আমি আপনাকে কিছু দিতে চাই।
আমি যদি এই লেনদেন অস্বীকার করি, তাহলে?
তাহলে আপনি জীবিত ফেরত যেতে পারবেন না- খৃস্টান বললো আপনি কায়রো থেকে এতো দূরে আছেন যে, আমরা আপনাকে মুক্ত করে দিলেও আপনি মরে যাবেন।
সেই মৃত্যুকেই আমি বরণ করে নেবো- হাবীবুল কুদ্দুস বললেন আমি শত্রুর কয়েদখানায় মৃত্যুবরণ করতে চাই না।
আপনি না আটক আছেন, না আপনি আমাদের শত্রু- খৃস্টান বললো- অপদার্থগুলো আপনার সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করে আপনার মধ্যে কুধারণা সৃষ্টি করে দিয়েছে। আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।
কথাগুলো বলার জন্য অপহরণ করে আমাকে এতো দূরে নিয়ে আসার কী প্রয়োজন ছিলো?
আমি যদি কায়রোতে বসে আপনার সঙ্গে কথা বলতাম, তাহলে আমরা উভয়ে এতোদিনে কয়েদখানার পাতাল প্রকোষ্ঠে চলে যেতাম খৃস্টান বললো- ওখানে আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীস পায়ে পায়ে গোয়েন্দা দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
হাবীবুল কুদ্দুসের মস্তিষ্ক পরিষ্কার হয়ে গেছে। দেমাগ তার ভাববার যোগ্য হয়ে গেছে। তিনি বুঝে ফেলেছেন, তিনি খৃস্টান নাশকতাকারীদের কবলে এসে পড়েছেন। জিজ্ঞেস করেন- তুমি ক্রুসেডারদের লোক, নাকি সুদানীদের?
আমি মিসরের লোক- খৃস্টান জবাব দেয়- আপনিও মিসরী। আপনি বাগদাদী, শামী কিংবা আরবী নন। মিসর মিসরীদের। এ দেশটা নুরুদ্দীন জঙ্গী-সালাহুদ্দীন আইউবীর পৈতৃক জমিদারি নয়। এটা ইসলামী রাষ্ট্র। এখানে আল্লাহর রাজত্ব চলবে। এবার শাসন করবে মিসরী মুসলমানরা। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেননি, যারা আমাদের উপর রাজত্ব করছেন, তারা বাগদাদ ও দামেশক থেকে এসেছেন এবং মিসরকে সিরিয়ার সঙ্গে একীভূত করে এক রাজ্য গঠন করেছেন?
তুমি কি আমাকে মিসরকে সালাহুদ্দীন আইউবী থেকে মুক্ত করার জন্য উস্কানি দিচ্ছো?
আমি জানি, আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীকে পয়গম্বর না হলেও পীর-মুরশিদ অবশ্যই মনে করেন- খৃস্টান বললো- আমি তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলবো না। আইউবীর মধ্যে অনেক গুণ আছে। আপনি তাকে যতোটুকু পছন্দ করেন, আমি তার চেয়ে কম করি না। কিন্তু আমাদেরকে ভেবে দেখতে হবে, লোকটা আর কতোদিন বেঁচে থাকবেন। তারপর মিসর তার যে ভাই কিংবা পুত্রের হাতে আসবে, তার মধ্যে তো আর আইউবীর গুণাবলী থাকবে না। তখন মিসর আরেক ফেরাউনের কজায় চলে যাবে।
