যে যাবত সালাহুদ্দীন আইউবী জীবিত আছেন কিংবা যতোক্ষণ পর্যন্ত মিসরের উপর তার রাজত্ব আছে, সে যাবত না আমি তোমার, মিসর তোমার।
আমি তাকে খুন করে ফেলবো- হাবীবুল কুদ্দুস বললেন- আমি আইউবীকে হত্যা করবো।
থামো- কক্ষে একটি ক্ষুব্ধ কণ্ঠ গর্জে ওঠে। লোকটা খৃস্টান। মিসরী ভাষায় কথা বলছে- তোমরা হাসান ইবনে সাব্বাহর অনুসারীরা হাশিশ আর গুপ্তহত্যা ব্যতীত কিছুই জানো না। মেয়েটাকে তার কাছে থাকতে দাও। তুমি আমার সঙ্গে আসো।
লোকটি তাকে সঙ্গে করে বাইরে নিয়ে বললো- এখন আর ওকে হাশিশ দিও না। তার নেশা কেটে যেতে দাও। তার হাতে সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করাতে হবে। তার মাধ্যমে তার বাহিনীকে বিদ্রোহে উস্কে দিতে হবে। আমার এসে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অন্যথায় আমি তার এই অবস্থা হতে দিতাম না। সংজ্ঞা ঠিক রেখে তাকে সালাহুদ্দীন আইউবীর শত্রু বানাতে হবে। তোমরা লোকটাকে যেরূপ দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সাথে অপহরণ করে এনেছো, আমি অন্তর থেকে তার জন্য তোমাদের প্রশংসা করি। এর বিনিময়ে তোমাদেরকে এতো পরিমাণ পুরস্কার দেয়া হবে, যা তোমরা অতীতে কখনো পাওনি। কিন্তু হাশিশ প্রয়োগ করে তোমরা আমাদের কাজ কঠিন করে দিলে। এখন তার নেশা দূর করার ব্যবস্থা নাও।
ক্রুসেডারদের গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা এবং মুসলিম যুবকদের চরিত্র ধ্বংসের পন্থা-পদ্ধতি অত্যন্ত পরিপক্ক। তাদের এই বিদ্যার বিশেষজ্ঞগণ মানবীয় স্বভাবের দুর্বলতা ও চাহিদা সম্পর্কে সম্যক অবগত। তাদের দৃষ্টি সুলতান আইউবীর ফৌজ ও প্রশাসনের প্রতিজন অফিসার-কর্মকর্তার উপর নিবদ্ধ। অপরদিকে আরবের আমীর-উজির এবং বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের মুসলিম শাসকদের দুর্বলতা সম্পর্কেও তারা অবহিত। তাদের প্রচেষ্টা, অধিক থেকে অধিকতর শাসক ও কর্মকর্তা তাদের অধীন হয়ে যাক এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াক। ইহুদীরা সম্পদ ও নারী দিয়ে তাদের পুরোপুরি সাহায্য করে যাচ্ছে। কাফেরদের বিশেষজ্ঞগণ মুসলিম শাসক প্রমুখদেরকে কয়েকটি দলে বিভক্ত করে রেখেছে।
একদল সুন্দরী নারী, মদ আর হীরা-জহরতের বিনিময়ে নিজেদের ঈমান বিক্রি করে ফেলেছে। একটি দল তাদের, যারা স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে তার স্বাধীন শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তৃতীয় দলে আছে তারা, যারা দেশ ও জাতির অফাদার এবং পরিপক্ক মুসলমান। এই তৃতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হাত করা ক্রুসেডারদের স্বতন্ত্র একটি মিশন। সুলতান আইউবীর গোপন পলিসি-পরিকল্পনা সময়ের আগে অবগত হওয়া এবং তাঁর সৈন্যদের দ্বারা তারই বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করানো ইত্যাদি নানা উদ্দেশ্যে তারা এই মিশন পরিচালনা করছে। এই পরিপক্ক দীনদার ও নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদদের হাত করার জন্য তাদের নিকট কয়েকটি পন্থা আছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে অপহরণ করে দলে ভেড়ানো। একটি হচ্ছে হত্যা করা। প্রয়োজন হলে হাসান ইবনে সাব্বাহর ঘাতকদের ভাড়া নেয়া হতো।
নায়েব সালার হাবীবুল কুদ্দুস এমন একজন কর্মকর্তা, যাকে হত্যা করায় ক্রুসেডারদের কোনো লাভ নেই। বরং তাকে হাত করে তার বাহিনীকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে উস্কে দিতে হবে। ক্রুসেডাদের মুসলিম এজেন্টরা তাদের অবহিত করেছে, হাবীবুল কুদ্দুস ঈমান নয় জীবন দেয়ার মতো মানুষ এবং তার মধ্যে এমন জযবা ও অস্বাভাবিক যোগ্যতা আছে, যদি তাকে তার বাহিনীসহ এক লাখ শত্রুসেনার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়, তাহলে মাত্র পাঁচ হাজার সৈন্য দ্বারা এই বিশাল শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না।
ক্রুসেডাররা বিষয়টা যাচাই করে দেখেছে। কখনো করেছে অস্বাভাবিক রূপসী যুবতীকে নিরাশ্রয় এতীম নির্যাতিতার বেশে সাহায্যের জন্য কিংবা কোনো মেয়েকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে প্রেরণ করে। কখনো বা ভোজসভা কিংবা খেলাধুলার অনুষ্ঠানে কোনো সুন্দরী মেয়েকে তার পেছনে লেলিয়ে দিয়ে। কিন্তু হাবীবুল কুদ্দুস কখনোই তাদের জালে আটকা পড়েননি, যেন তিনি পাথর।
মিসরে বিদ্রোহ করানো ক্রুসেডারদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা, সালাহুদ্দীন আইউবী সিরিয়া ও ফিলিস্তীনের অঞ্চলগুলোতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মুসলিম আমীদেরকে যুক্তি-প্রমাণ কিংবা তরবারীর মাধ্যমে নিজের অনুগত বানিয়ে চলেছেন। এরপরই তিনি ফিলিস্তীন অভিমুখে যাত্রা করবেন। ফিলিস্তীন থেকে তার মনোযোগ সরানোর একটা পন্থা এই হতে পারে যে, মিসরে তাঁর যে ফৌজ আছে, তাদেরকে বিদ্রোহের জন্য উস্কে দেয়া হবে।
ইতিপূর্বে ক্রুসেডাররা সুদানীদেরকে মিসরী ফৌজের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলো। সুদানী বাহিনী হামলাও করেছিলো। কিন্তু সুদানী বাহিনীর অধিকাংশ সৈনিক ছিলো হাবশী এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। দ্বিতীয়ত তারা ছিলো হুজুগে মাতাল। এই একযোগে লড়াই করে তো এই একসঙ্গে পালিয়ে যায়। ক্রুসেডাররা তাদেরকে মিসরের বিরুদ্ধে উস্কে রাখে; কিন্তু যুদ্ধ করাবার কথা ভাবেনি। এখন তারা মিসরী বাহিনীরই দ্বারা বিদ্রোহ করানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তাদের বিবেচনায় হাবীবুল কুদ্দুসই এ কাজের জন্য যথোপযুক্ত ব্যক্তি। তাই খৃস্টান গোয়েন্দা ও বিশেষজ্ঞগণ তাকে অপহরণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং হাসান ইবনে সাব্বাহর ফেদায়ীদের দ্বারা কর্মটা করিয়ে ফেলে।
