কাছে গিয়ে প্রহরী দেখে, লোকটির সারা গায়ে রক্ত, যেন রক্ত দিয়ে গোসল করে এসেছে। তুলে তাকে কমাণ্ডারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ করা হয়। কিন্তু রক্ষা করা গেলো না তাকে। মৃত্যুর পূর্বে সে বলেছিলো, নিজের এক সিপাহী সঙ্গীকে সে হত্যা করে এসেছে। ক্যাম্প থেকে আধা ক্রোশ দূরে একটি তাঁবুতে পড়ে আছে তার লাশ। তার বর্ণনা মতে সেখানে তিনটি তাঁবু আছে। অধিবাসীরা যাযাবর। তাদের কাছে আছে অনেক রূপসী তরুণী। অনেক সিপাহী সেখানে রাতে যাওয়া-আসা করে।
তাঁবুর যাযাবর অধিবাসী মেয়েরা শুধু দেহ ব্যবসায়ী-ই নয়–তাদের প্রতিটি মেয়ে আপন আপন খদ্দেরের মনে এই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো যে, আমার জীবন তোমার জন্য উৎসর্গিত। বিয়ে করে আমি তোমার স্ত্রী হয়ে জীবন কাটাতে চাই। পরে তদন্ত করে জানা গেছে, তারা তাদের খদ্দের সিপাহীদের মধ্যে পরস্পর বিরোধ সৃষ্টি করার কাজে লিপ্ত ছিলো। তার-ই ফলে এই দু সিপাহী যাযাবরদের তাঁবুতে পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং অপরজন আহত হয়ে ক্যাম্পে ফিরে এসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে প্রাণ হারায়।
যাযাবরের তাঁবুতে নিহত সিপাহীর লাশ আনার জন্য কয়েকজন লোক প্রেরণ করা হয়। একজন কমাণ্ডারও আছে তাদের সাথে। ক্যাম্পে মৃত সিপাহীর দেয়া নির্দেশনা মোতাবেক তারা এক স্থানে গিয়ে পৌঁছে। কিন্তু তাঁবু নেই। পড়ে আছে শুধু একটি লাশ। আলামতে বুঝা যাচ্ছে, এখানে তাঁবু ছিলো; তুলে নেয়া হয়েছে। রাতের বেলা পালিয়ে যাওয়া যাযাবরদের খুঁজে বের করা সম্ভব ছিলো না। তারা সিপাহীর লাশ তুলে নিয়ে ফিরে আসে।
সুলতান আইউবীকে এ দুর্ঘটনার রিপোর্ট দেয়া হয়। রিপোর্টে এ-ও বলা হয় যে, সেনাবাহিনীর মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেছে। চুরি হয়েছে তিনটি ঘোড়া। সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানকে ডেকে বললেন, সিপাহী বেশে ব্যারাকে গুপ্তচর ঢুকিয়ে তথ্য নাও, এসব অপরাধ বাড়লো কেন। আল-বার্কের বাহিনীকেও সুলতান আইউবী এ ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করেন।
এই কেনর জবাব নগরীতে-ই বিদ্যমান। কিন্তু সে পর্যন্ত পৌঁছার সাধ্য নেই আলী বিন সুফিয়ানের গুপ্তচরদের। এটি দুর্গম একটি ভবন। একটি মিসরী পরিবার বাস করে এখানে। এই ভবন ও ভবনের অধিবাসীরা নগরীতে বেশ খ্যাতিমান। বিপুল পরিমাণ দান-খয়রাত বণ্টন হয় এখানে। গরীব-অসহায় মানুষ এখান থেকে আর্থিক সাহায্য পায়। মহড়ার সময় এরা সৈন্যদের জন্য দু থলে স্বর্ণমুদ্রা দান করেছিলো সুলতান আইউবীকে। এটি একটি ব্যবসায়ী পরিবার। সুলতান আইউবীর আগমনের আগে এ ভবনটি ছিলো সুদানী বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের মেহমানখানা। সুলতান আইউবী এসে সুদানীদের নির্মূল করে দেয়ার পর এরা সুলতানের অফাদারী মেনে নেয়।
সুলতান আইউবী যেদিন আল-বারক ও আলী বিন সুফিয়ানকে সেনাবাহিনীর অপরাধ প্রবণতার রহস্য উদঘাটনের নির্দেশ দেন, সেদিন এই ভবনটির একটি কক্ষে বসা ছিলো দশ-বারোজন লোক। কক্ষে মদের আসর চলছিলো। এমন সময়ে কক্ষে প্রবেশ করে এক বৃদ্ধ। বৃদ্ধকে দেখে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যায় সকলে। সঙ্গে ছিলো তার অতিশয় সুন্দরী একটি মেয়ে, যার মুখমণ্ডলের অর্ধেকটা নেকাবে টাকা। তারা কক্ষে প্রবেশ করামাত্র দরজা বন্ধ হয়ে যায়। মেয়েটি তার মুখের নেকাব সরিয়ে ফেলে। সে বৃদ্ধের সঙ্গে এক পাশে বসে পড়ে।
সেনাবাহিনীতে জুয়াবাজী ও অপকর্ম বেড়ে যাওয়ার সংবাদ এই গতকাল-ই সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছেছে। আমাদের আজকের এই বৈঠক অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সুলতান আইউবী সিপাহীদের বেশে সেনাবাহিনীতে গুপ্তচর ঢুকিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের এই গুপ্তচরবৃত্তিকে ব্যর্থ করতে হবে। আমি যে তাজা সংবাদটি নিয়ে এসেছি, তা বড়-ই আশাব্যঞ্জক। এক মেয়েকে কেন্দ্র করে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে দুজন সিপাহী একে অপরকে হত্যা করেছে। এটি আমাদের সাফল্যের সূচনা। বললো বৃদ্ধ।
তিন মাসে মাত্র দুজন মুসলমান সিপাহী খুন হয়েছে। সাফল্যের এই গতি বড়-ই ধীর। প্রকৃত সফল তো তখন হবো, যখন সুলতান আইউবীর কোন নায়েব সালার তার সালারকে হত্যা করবে। বৃদ্ধের কথা কেটে বললো আরেকজন।
আমি তো বরং কামিয়াবী: তাকে বলবো, যখন কোন সালার কিংবা নায়েব সালার সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করবে। আমি জানি, কোন বাহিনীর এক হাজার সিপাহী খুন হলেও তেমন কিছু যায় আসে না। আমাদের টার্গেট আইউবী। আইউবীকে হত্যা করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। গত বছরের ঘটনা দুটোর কথা আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে। সমুদ্রতীরে আইউবীকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া তীরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গেলো। রোম থেকে আমাদের বাহিনী আসলো, কিন্তু তারা সকলেই ধরা পড়লো। এতে বুঝা যায়, আপনারা সুলতান আইউবীকে হত্যা করা যতো সহজ মনে করছেন, বিষয়টা ততো সহজ নয়। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে যে, আইউবী নিহত হলে তার স্থলে যিনি আসবেন, তিনি আরো কঠোর ও কট্টর মুসলমান হবেন। তাই আমার প্রস্তাব, তার বাহিনীকে সেই লোভনীয় ধ্বংসের পথে নিক্ষেপ করো, যে পথে ক্রুশের পূজারীরা নিক্ষেপ করেছে বাগদাদ ও দামেশকের আমীর-শাসকদের। বললো বৃদ্ধ।
ক্রুশের অনুসারী ও সুদানী বাহিনী পরাজিত হলো এক বছর কেটে গেছে। এই এক বছরে আপনি কী কী কাজ করেছেন? আপনি বড় দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন। দুজন লোককে যে করে হোক হত্যা করতেই হবে। সালাহুদ্দীন। আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ান। বললো একজন।
