আমরা সকলে জিহাদ ও শাহাদাঁতের জযবায় উদ্দীপ্ত। একদিন আমার এই মেয়েটা আমার সঙ্গে ছিলো। আমার পিতা আমাকে যে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন, আমিও মেয়েকে সেই প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছি। আমার এক পুত্র এই মুহূর্তে সুলতান আইউবীর ফৌজের সঙ্গে সিরিয়ায় অবস্থান করছে। আমি মেয়েকে বলতাম, আমাদের নায়েব সালার হাবীবুল কুদ্দুস সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ন্যায় এক মর্দে মুজাহিদ। সেদিন নায়েব সালার আমার মেয়েটাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, এ কে? বললাম, আমার মেয়ে এবং মুজাহিদা। অনেক দিন পর তিনি আমাকে বললেন, আমি তোমার সেই মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাই। আমি মেয়ের মায়ের সঙ্গে আলাপ করি। সে বললো, মেয়ে তো আগে থেকেই লছে, সে ইসলামের একজন সৈনিকের স্ত্রী হতে ইচ্ছুক। এভাবে আমি খুশি মনে আমার এই মেয়েকে নায়েব সালারের নিকট বিয়ে দিই। এখন শুনেছি, তার নাকি কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আমি আপনাকে নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি, এই দুর্ঘটনায় কেউ যদি অন্তর থেকে ব্যথা পেয়ে থাকে, তো সে শুধু আমার কন্যা। তার অপর দুই স্ত্রী বলছে, মরে গেলে অন্য কাউকে বিয়ে করে নেবো।
***
আমি এখন নিশ্চিত, তার মস্তিষ্ক আমাদের কজায় এসে পড়েছে এই কণ্ঠ কায়রো থেকে বহু দূরে সেসব ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে উত্থিত হলো, যেখানে কোনো এক ফেরাউন তার আমলে প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলো। সে যুগে জায়গাটা অত্যন্ত সুন্দর, মনোরম ও সবুজ-শ্যামল ছিলো। অঞ্চলটা পাহাড়ি এবং নীল নদের কূলে অবস্থিত। পর্বতমালা গাছ-গাছালি ও সবুজ-শ্যামলে ঢাকা। নদীটা খানিক পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে ঢুকে গেছে। এখন এলাকাটা এক ভীতিময় জায়গা। প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষের গায়ে শেওলার আস্তর জমে আছে। চিলের ন্যায় বড় বড় চামচিকারা দল বেঁধে উড়ে বেড়াচ্ছে। ধ্বংসাবশেষের অলিন্দ ও কক্ষগুলোতে মানুষের অসংখ্য হাড়-খুলি পড়ে আছে। সেকালের নানা রকম অস্ত্রও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে রয়েছে। এখন কেউ সেদিকে মুখ করে না। জনশ্রুতি আছে, জায়গাটায় এখন জিন-পরী ও ভূতেরা বাস করে, যারা জীবিত মানুষদেরকে শিকার করে বেড়ায়।
সেই ভয়ংকর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বসে এক ব্যক্তি বলছে- আমি নিশ্চিত, তার মস্তিষ্ক আমাদের কজায় এসে পড়েছে। তবে না-ই যদি আসে, তাহলে এখান থেকে জীবিত যেতে দেবো না।
আমরা লোকটাকে হত্যা করতে এখানে আনিনি- অন্য একজন বললো- হত্যা করাই যদি উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ঘর থেকে বের করে এখানে তুলে আনার প্রয়োজন ছিলো না। আমরা তাকে বিশেষ এক কাজের জন্য এনেছি। সে কাজের জন্য তাকে প্রস্তুত করতে হবে।
হাশিশ ক্রিয়া করছে।
হাশিশ দ্বারা তোমরা কারো ঈমান ও দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করতে পারবে না। এই লোকটি পাঁচ হাজার সৈনিকের সামরিক শক্তির মালিক। শুধু তাকে নয়- আমাদেরকে তার গোটা বাহিনীকে হাতে আনতে হবে এবং তাদেরকে মিসরের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাতে হবে। তারপর মিসর আমাদের হয়ে যাবে এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর অবস্থা সেই সিংহের ন্যায় হয়ে যাবে, যে বহু শিকারের বেষ্টনীতে আবদ্ধ থেকে গর্জন করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তার ভাগ্যে মৃত্যু অবধারিত হয়ে আছে। সালাহুদ্দীন আইউবীর এই নায়েব সালার যদি তার বাহিনীকে একটু ইশারা করে, তো কোনো প্রকার চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই তারা তার আদেশ মান্য করবে।
হাবীবুল কুদ্দুস উক্ত ধ্বংসাবশেষের এক কক্ষে উপবিষ্ট। নীচে নরম গালিচা বিছানো, পেছনে গোল তাকিয়া। আয়েশের সকল উপকরণই সেখানে বর্তমান। এক ব্যক্তি সম্মুখে বসে তার চোখে চোখ রেখে আছে এবং বলছে- মিসর আমার রাজ্য। সালাহুদ্দীন আইউবী ইরাকী কুর্দি। তিনি আমার রাজ্য দখল করে আছেন। আইউবী আমার রাজ্যের রূপসী মেয়েদের দ্বারা নিজ হেরেম পরিপূর্ণ করে রেখেছেন। আমার পাঁচ হাজার জানবাজ সৈন্য সমগ্র মিসর দখল করে নেবে।
হাবীবুল কুদ্দুসের ঠোঁটে মুচকি হাসি। চেহারায় খুশির আভা। তিনি বিড় বিড় করে ওঠেন- আমার তরবারী কোথায়? আমার ঘোড়া প্রস্তুত করো। আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করবো। আমার পাঁচ হাজার জানবাজ সৈন্য একদিনে মিসরের বাহিনীকে অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য করে ফেলবে।
ক্রুসেডাররা আমার বন্ধু- লোকটি তার চোখে চোখ রেখে বললো- তারা আমাকে সাহায্য করবে। বন্ধু তো সে, যে বিপদের সময় সাহায্য করে।
আমার তরবারী কোথায়?- হাবীবুল কুদ্দুস খানিক স্পষ্ট কণ্ঠে বলতে শুরু করেন- মিসর অনেক সুন্দর হয়ে গেছে। মিসরের মেয়েরা অত্যন্ত রূপসী হয়ে গেছে। মিসর আমার, মিসর আমার।
একটি মেয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। মেয়েটার পরিধানের পোশাক এমন, যেনো উলঙ্গ। মাথার রেশম-কোমল চুলগুলো খোলা। হাল্কা গোলাপী বর্ণের সুঢৌল দেহ। মেয়েটা হাবীবুল কুদ্দুসের গা-ঘেঁষে বসে পড়ে। একটা বাহু হাবীবুল কুদ্দুসের কাঁধের উপর আলগোছে রেখে দেয়। তার রেশমী চুলগুলো হাবীবুল কুদ্দুসের গণ্ডদেশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তিনি আচ্ছন্ন কণ্ঠে বললেন- মিসর অনেক সুন্দর হয়ে গেছে।
মেয়েটি এক ধারে সরে গিয়ে বললো- কিন্তু আমাকে সুলতান আইউবী দখল করে আছেন।
হাবীবুল কুদ্দুস অকস্মাৎ মেয়েটিকে টেনে কাছে এনে বাহুতে জড়িয়ে ধরে বললেন- তোমাকে কেউ দখল করতে পারবে না। তুমি আমার। মিসর আমার।
