সুলতান আইউবী পত্রের নীচে সীল-মোহর এঁটে দূতের হাতে দিয়ে বললেন, রাতটা বিশ্রাম করে সকাল সকাল রওনা হয়ে যাও।
সময়টা ছিলো ইসলামের ইতিহাসের এক সংকটময় কাল। এদিকে। আরব ভূখণ্ড মুসলমানদের রক্তে লাল হয়ে চলেছে। খৃস্টান ও ইহুদীরা মুসলমানদের মাঝে গাদ্দার ও কুচক্রী সৃষ্টি করে মুসলমানদেরকে গৃহযুদ্ধে উস্কে দিয়েছে। ওদিকে মিসরে এই কাফেররাই মুসলিম কর্মকর্তাদের মাঝে গাদ্দার জন্মদানে ব্যস্ত রয়েছে। জনসাধারণের মাঝে সুলতান আইউবীর শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করছে এবং আইউবীর বাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত লজ্জাজনক সব অপবাদ প্রচার করে বেড়াচ্ছে। তারা এসব তৎপরতা চালাচ্ছে গোপনে- অতি সন্তর্পণে। আলী বিন সুফিয়ান এবং কায়রোর কোতওয়াল গিয়াস বিলবীস এসব অভিযান অপপ্রচারের প্রতিক্রিয়া দূর এবং অপরাধীদের পাকড়াও করার কাজে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন।
একজন নায়েব সালারের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সাধারণ ঘটনা নয়। কিন্তু তার কোনই সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। হাবীবুল কুদ্দুস বিশ্বাসঘাতকের দলে যোগ দিতে পারেন, কেউ ভাবতেই পারছেন না। কিন্তু সময়টাও এমন যে, গাদ্দারী একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে। হাবীবুল কুদ্দুস নিখোঁজ হওয়ার পর অনেকে মন্তব্য করেন, কেননা, তিনি ফেরেশতা তো আর নন। তার তিনজন স্ত্রী আছে। এটা কোনো দোষের বিষয় ছিলো না। তার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ঘরে চার-চারজন করে স্ত্রী আছে। হাবীবুল কুদ্দুস জীবনে কোনদিন মদ ছুঁয়ে দেখেননি। নামায-রোযার পাবন্দ মানুষ। যুদ্ধের ময়দানে দুশমনের জন্য আতঙ্ক হয়ে আবির্ভূত হওয়ার মতো দুঃসাহসী ও সমর বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব।
তার সবচে বড় গুণটি হচ্ছে, বাহিনীর প্রতিজন সৈন্যের তিনি প্রিয় মানুষ। তার অধীন কমান্ডার ও সৈনিকরা এমন ধারায় লড়াই করে, যেনো তার নির্দেশে নয়- ভক্তি-শ্রদ্ধার বলে যুদ্ধ করছে। অনেক সময় মনে হতো, এই বাহিনী তার নিজস্ব ফৌজ এবং তারা সুলতান আইউবীর নয়- হাবীবুল কুদ্দুসের ইঙ্গিতে লড়াই করছে। তার ইউনিটে তিন হাজার পদাতিক ও দুহাজার অশ্বারোহী সৈনিক আছে। তারা তীরন্দাজিতে এতো দক্ষ যে, অন্ধকারে শব্দ লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়লে তীর ব্যক্তির গায়ে গিয়ে আঘাত হানে।
আলী বিন সুফিয়ান অভিজ্ঞ গোয়েন্দা। গিয়াস বিলবীস পুলিশ প্রধান এবং সিভিল ইন্টেলিজেন্সে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এই দুজনেরই অভিমত হচ্ছে, দুশমন হাবীবুল কুদ্দুসকে জালে আটকে ফেলেছে। উদ্দেশ্য হতে পারে, তার মাধ্যমে তারা আমাদের পাঁচ হাজার সৈন্যকে বিদ্রোহী বানাতে চাচ্ছে। পাঁচ হাজার সৈন্য কম কথা নয়। হাবীবুল কুদ্সের নিখোঁজ হওয়ার পর এই সৈনিকদেরকে নিরস্ত্র করে ফেলার প্রস্তাব করা হয়েছিলো। কিন্তু আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীস এই বলে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন যে, এটা করা হলে তারা বিদ্রোহ করার না হলেও বিদ্রোহী হয়ে যাবে। তদস্থলে তাদের মাঝে নানা বেশে গোয়েন্দা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, যারা ব্যারাকে সৈনিকদের সঙ্গে মিশে গপশপ শুনতে থাকে। কমান্ডারদের প্রতিও নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়।
গভীর নজরদারি রাখা হয়েছে হাবীবুল কুন্দুসের ঘরের উপর। তার তিন স্ত্রীর একজনের বয়স ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। দুজন চব্বিশ পঁচিশ বছর বয়সী। জিজ্ঞাসাবাদে তারা শুধু এটুকু বললো যে, একদিন সন্ধ্যায় তার নিকট দুজন লোক এসেছিলো। তিনি তাদের সঙ্গে বেরিয়ে যান; পরে আর ফিরে আসেননি। চাকর-বাকরদের কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। তাদের থেকেও কোন তথ্য পাওয়া গেলো না। গোপনে স্ত্রীদের সম্পর্কে তথ্য নেয়া হলো। তাদের একজনও সন্দেহভাজন প্রমাণিত হলো না। শুধু এটুকু তথ্য পাওয়া গেলো যে, কম বয়সী দুজনের একজনের সঙ্গে তার সম্পর্ক বেশি ছিলো। তার নাম: যোহরা। মেয়েটি এক আরোহী প্লাটুন কমান্ডারের কন্যা।
কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করা হলো, নিজের সম্মান বয়সী একজন পুরুষের কাছে যুবতী মেয়েকে বিয়ে দিলে কেন? হাবীবুল কুদ্দুস কি তোমাকে বাধ্য করেছিলো?
না- কমান্ডার উত্তর দেয়- নায়েব সালার হাবীকুল কুদুল ইসলাম ও জিহাদের অতোটুকু অনুরক্ত, যতোটুকু আমি। আমি তার সঙ্গে অনেক যুদ্ধে লড়েছি। তিনি বলতেন, মুমিনের তরবারী খাপ থেকে বের হওয়ার পর দুশমনের সর্বশেষ সৈনিকটিকে শেষ না করা পর্যন্ত খাপে ফিরে না আসা উচিত। তিনি আরো বলতেন, কুফরের ফেতনা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত জিহাদ অব্যাহত থাকে। তিনি গাদ্দারদের এতো ঘৃণা করতেন যে, এক সীমান্ত লড়াইয়ে সুদানীরা আকস্মিকভাবে হামলা করলে আমাদের দুজন অশ্বারোহী সেনা পালাতে উদ্যত হয়। নায়েব সালার ঘটনাটা দেখে ফেলেন। তিনি তাদেরকে ধরে আনতে আদেশ করেন। তাদেরকে ধরে আনা হলো। নায়েব সালার তাদের কিছু জিজ্ঞেস করা বা কিছু বলা ব্যতিরেকেই তাদেরকে ঘোড়ার পেছনে বেঁধে পিঠে একজনকে বসিয়ে ঘোড়া হাঁকাতে নির্দেশ দেন। ঘোড়া যখন তাদের নিয়ে ফিরে আসে, তখন ঘোড়ার দেহ থেকে অঝোরে ঘাম ঝরছিলো এবং তাদের নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। পেছনে বাধা সৈনিকদের অবস্থা এই ছিলো যে, তাদের পরনে কাপড় ছিলো না এবং গায়ের চামড়া ছিলে ছিলে গোশত পর্যন্ত খসে পড়েছে। যখন যুদ্ধ শেষ হয়, ততোক্ষণে সুদানীদের অধিকাংশ সৈনিক মারা গেছে। কিছু ধরা পড়েছে এবং বাদ বাকিরা পালিয়ে গেছে। হাবীবুল কুদ্দুস বাহিনীর সকল সৈন্যকে একত্রিত করে নিজের সৈনিক দুজনের লাশ দেখিয়ে বললেন, আল্লাহর পথে লড়াই করা থেকে পলায়নকারীদের এই শাস্তি ইহকালীন। পরকালে তাদের দেহ অক্ষত হয়ে যাবে এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
