নৌকা দুটি কূলে এসে ভিড়ে। সংবাদ পেয়ে আমি তাদের দেখতে যাই। সূর্য উদিত হচ্ছিলো। এক নৌকায় ওমর আল-মামলুক এবং তার দুসঙ্গীর লাশ। অন্যরা সকলে আহত। নাসরুল মামলুক বেশি আহত। তার গায়ে দুটি গভীর জখম বর্শার আর দুটি তরবারীর। তার সংজ্ঞা ছিলো। ব্যান্ডেজ-চিকিৎসার পর বললেন, আমাকে একখানা তক্তা এনে। দিন। আমি তাকে তক্তা এনে দিলাম। এ সময় তিনি আর তার চিকিৎসা করতে দেননি। তক্তা পেয়ে তাতে তিনি নিজের রক্তে শাহাদাত অঙুলি ডুবিয়ে ডুবিয়ে ওমর আল-মামলুকের নাম ও এই লেখাগুলো লিখেন। তারপর তক্তাটা আমাকে দিয়ে বললেন, এটি ওমর আল-মামলুকের কবরের উপর স্থাপন করে দেবেন। আমি তক্তাখানা একটি লাঠির মাথায় বেঁধে ওমর আল-মামলুকের শিয়রে গেড়ে রাখি।
নাসরুল মামলুকের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত বেরুতেই থাকে। কোনোক্রমেই রক্ত বন্ধ হচ্ছিলো না। তৃতীয় দিন তার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমি তাকে দেখতে আসলে ডাক্তার নিরাশা প্রকাশ করেন। স্বয়ং নাসরুল মামলুক অনুভব করতে শুরু করেছেন, তিনি বাঁচবেন না। তিনি অনুরূপ আরেকখানা তক্তা দিতে বললেন। তক্তার ব্যবস্থা করে দিলে তিনি তক্তাখানা নিজের কাছে রেখে দেন। রাতে সংবাদ পাই, নাসরুল মামলুক শহীদ হয়ে গেছেন। আমি গেলাম। তার এক আহত সঙ্গী তক্তাখানা আমাকে দিয়ে বললো, নাসর নিজের এক জখম থেকে পট্টি খুলে ফেললে ক্ষতস্থান থেকে দর দর করে রক্ত বের হচ্ছিলো। তিনি নিজ রক্তে আঙুল ডুবিয়ে ডুবিয়ে এই লেখাটা লিখেছেন–নাসরুল মামলুক! আল্লাহ আমার শাহাদাত কবুল করুন। সঙ্গী জানায়, নাসরুল মামলুক বলেছিলেন, তাকে যেনো তার বন্ধু ওমর আল-মামলুকের পার্শ্বে দাফন করা হয়। এভাবে এই দুটি ফলক একই শহীদের রক্তে লেখা হয়েছে।
এরা দুজন মামলুক ছিলো মহামান্য ইমাম- সুলতান আইউবী ইমামকে উদ্দেশ করে বললেন- আপনি জানেন, মামলুক কোন্ বংশের মানুষ। এরা সেই গোলাম বংশের মানুষ, যাদেরকে মুক্ত করা হয়েছিলল। আমাদের প্রিয়নবী (সা.) দাস প্রথা নিষিদ্ধ করে বলেছেন, মানুষ মানুষের গোলাম হতে পারে না। দেখছেন না, এই গোলামরা কিরূপ কীর্তি দেখালো। এরা আটজন ছিলো। কিন্তু বিশজন সৈনিকের হাত থেকে,এতো বড় নৌকাটা ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে। আমার ফৌজে মামলুক আর তুর্কিদের প্রতি আমার যতোটুকু আস্থা আছে, অন্যদের প্রতি তো নেই।
এখন মানুষ পুনরায় মানুষের গোলামে পরিণত হতে যাচ্ছে- ইমাম বললেন- সিংহাসনের মালিক হওয়ার কসরত এ জন্যই করা হচ্ছে যে, মানুষকে গোলাম বানানো হবে। কিন্তু মানুষ বোঝে না, সিংহাসন কোনদিন কারো সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেনি। ফেরাউনও মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। আল্লাহ সেই সকল মানুষকে শিক্ষামূলক শাস্তি দান করেছেন, যারা সিংহাসনে আসীন হয়ে মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে।
সুলতান আইউবীর রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার এক ব্যক্তিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসছে। লোকটির অবস্থা বলছে, সে দীর্ঘ সফর করে এসেছে। কমান্ডার নিকটে এসে বললো- কায়রো থেকে দূত এসেছে।
কী সংবাদ নিয়ে এসেছো? সুলতান আইউবী দূতকে জিজ্ঞেস করেন।
সংবাদ ভালো নয়। বলেই দূত কটিবন্ধ থেকে ভাজকরা একখানা কাগজ বের করে সুলতান আইউবীর হাতে দেয়। সুলতান নিজ তাঁবুতে চলে যান।
***
তাঁবুতে বসে সুলতান কাগজের ভাঁজ খোলেন। গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ানের লেখা চিঠি আলী লিখেছেন
আমাদের সর্বাপেক্ষা বেশি দীনদার ও দুঃসাহসী নায়েব সালার হাবীবুল কুদ্দুস দশদিন যাবত নিখোঁজ। ক্রুসেডারদের নাশকতা ও অপতৎপরতা দিন দিন বেড়ে চলছে। এখানে আমরা আন্ডারগ্রাউন্ড যুদ্ধ লড়ছি। ঈমান বিক্রেতাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে এ সমস্যায় আপনাকে পেরেশান হওয়ার আবশ্যক নেই। আমরা দুশমনকে সফল হতে দেবো না। পেরেশানী সৃষ্টি করেছেন হাবীবুল কুদ্দুস। তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তার শুধু নিখোঁজ হওয়াই অস্থিরতার কারণ, নয়। আমরা আরো একটি আশঙ্কা অনুভব করছি। আপনি জানেন, হাবীবুল কুদ্দুসের অধীনে যে কটি সেনা ইউনিট রয়েছে, প্রতিজন সৈনিক তার এতোই অনুরক্ত যে, তারা তার ইঙ্গিতে জীবন কুরবান করে দিতে প্রস্তুত থাকে। আশঙ্কা হচ্ছে, যদি তিনি নিজ থেকে দুশমনের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়ে থাকেন, তাহলে অধীন সৈন্যদেরকে তিনি সালতানাতের-বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উস্কে দিতে পারেন। আমি তার অনুসন্ধানে এখনো নিরাশ হইনি। আপনার নিকট আমি অনুমতি প্রার্থনা করছি, অনুসন্ধানকালে যদি তিনি সামনে এসে পড়েন আর আমার তাকে হত্যা করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাহলে হত্যা করবো কিনা। আপনার স্থলাভিষিক্ত আমীরে মেসের আমাকে এর অনুমতি দেননি। তিনি এই অনুমতি সরাসরি আপনার থেকে নিতে বলেছেন। আমি যদি তাকে খুঁজে বের করতে না পারি, তাহলে আপনি আমার নিকট জবাব চাইবেন। আর যদি তিনি আমার হাতে খুন হন, তা-ও হয়তো আপনি পছন্দ করবেন না। এই নায়েব সালারের দুশমনের কাছে থাকা আমাদের জন্য বড় বিপজ্জনক।
সুলতান আইউবী তৎক্ষণাৎ কাতেব ডেকে পত্রের উত্তর লেখাতে শুরু করেন—
প্রিয় আলী বিন সুফিয়ান!
তোমার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। হাবীবুল কুন্দুসের উপর আমার যতোটুকু আস্থা ছিলো, ততোটুকু আছে তোমারও উপর। যে লোক নিজের ঈমান বিক্রি করতে সম্মত হয়ে যায়, সে আল্লাহকে ভয় করে না। এমতাবস্থায় সে আমার ন্যায় একজন সামান্য মানুষকে ভয় করবে কেনো? হাবীবুল কুন্দুসের মতো মানুষও ধোকা দিতে পারে, এর জন্য তোমাদেরকে বিস্মিত না হওয়া উচিত। ঈমান একটা শক্তি, একটা সম্পদ। কিন্তু এই শক্তি-সম্পদ হীরা-জহরতের ন্যায় চিক চিক করে না। এর মধ্যে নারীর রূপের আকর্ষণ নেই। তাছাড়া ঈমান ক্ষমতার মসনদও নয়। মানুষের মধ্যে যখন দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতা ও হীরা-জহরতের লোভ সৃষ্টি হয়ে যায়, তখন তার ঈমান পরিত্যাগ করতে সময় লাগে না। হাবীবুল কুদ্দুসকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করো। প্রয়োজন মনে করলে আমি তাকে হত্যা করে ফেলার অনুমতি দিলাম। তবে জানবার চেষ্টা করো, তাকে অপহরণ করা হয়েছে কিনা। পরিস্থিতি তুমি ভালো জানো। যা ভালো মনে হয় করো। সালতানাতের স্বার্থ আর, ধর্ম অগ্রগণ্য। যেখানে হাজার হাজার সৈনিক শক্রর হাতে জীবন দিচ্ছে, সেখানে একজন মানুষের জীবন-মৃত্যু বড় কোনো বিষয় নয়। হাবীবুল কুদ্দুস গাদ্দার প্রমাণিত হলে তার পেছনে বেশি সময় ব্যয় করো না। সময় অনেক মূল্যবান। আল্লাহর নিকট গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকো। আমরা সকলে গুনাহগার। একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সত্ত্বাই পবিত্র। তোমরা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে থাকবেন।
