এই যেসব সৈনিক লুটতরাজের লোভে ভর্তি হচ্ছে, এরা কি গোটা বাহিনীকে নষ্ট করবে না? সালার জিজ্ঞেস করেন।
তুমি কি দেখোনি তাদেরকে কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে সুলতান আইউবী বললেন- আমি তোমাদেরকে প্রশিক্ষণে সামরিক মহড়ার যে নতুন পদ্ধতি শিখিয়েছি, তা-ই তাদেরকে সঠিক চিন্তা চেতনার উপর নিয়ে আসবে। আমি বাহিনীতে তাদেরকে এমনভাবে বণ্টন করছি যে, তারা বাহিনীর উপর নয় বরং বাহিনী তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করবে। আমি অনতিবিলম্বে এই মর্মে লিখিত আদেশ জারি করতে যাচ্ছি যে, আমাদের কোনো সৈনিককে লুটতরাজ কিংবা কোনো নারীর প্রতি হাত বাড়াতে দেখলে তাকে ঘটনাস্থলেই শায়েস্তা করে ফেলবে। দুশমনের অভিযোগসমূহকে ভুল ও মিথ্যা প্রমাণের একটা পন্থা হলো, ফৌজ আপন চরিত্র বলে বিজিত লোকদের উপর এবং স্বজাতিরও মন জয় করে নেবে। আমাদেরকে সবসময় স্মরণ রাখতে হবে, ইহুদী-খৃষ্টানরা সর্বকালে ইসলামের সৈনিক ও জনগণের মাঝে বৈরিতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে থাকবে। তারা যেমন আমাদের জনসাধারণের চরিত্র ধ্বংসের চেষ্টা করবে, তেমনি সেনাবাহিনীরও। এভাবে উভয় পক্ষের ঈমান ও জাতীয় চেতনা বিনষ্ট করে একে অপরের শত্রুতে পরিণত করে রাখবে। কাজটা তারা মুসলমানদের হাতে করাবে।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ফোরাত নদীর তীরে তাবুতে অবস্থান করছেন। ইতিমধ্যে তিনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি মুসলিম প্রজাতন্ত্রের শাসকদেরকে অনুগত বানিয়ে নিয়েছেন এবং বেশকটি দুর্গও জয় করে ফেলেছেন। এরা সেসব মুসলিম শাসক, যারা গোপনে গোপনে ক্রুসেডারদের বন্ধু এবং সুলতান আইউবীর বিরোধী ছিলেন। সুলতান আইউবীর গন্তব্য বাইতুল মুকাদ্দাস, যাকে খৃস্টানরা দখল করে জেরুজালেম নাম রেখেছে। কিন্তু আপন মুসলিম শাসক ও আমীরগণ তার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ফৌজকে দিন কয়েকের বিশ্রাম দেয়ার লক্ষ্যে সুলতান ফোরাতের তীরে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এখানে বসে বসে তিনি ঘোড়া, খচ্চর, উট ও রসদের অভাব পূরণ করে নিচ্ছেন।
অল্প পরেই সূর্যটা অস্ত যাবে। সুলতান আইউবী ফোরাতের তীরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সঙ্গে তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর সালার এবং গেরিলা বাহিনীর অধিনায়ক সারেম মিসরী উপস্থিত আছেন। তাদের থেকে সামান্য দূরে সাদা জুব্বা পরিহিত এক ব্যক্তি দণ্ডায়মান। লোকটি দুআর জন্য হাত উত্তোলন করে রেখেছেন। সুলতান আইউবী ওদিকে এগিয়ে যান। নিকটে পৌঁছে দেখেন, সেখানে চারটি কবর বিদ্যমান। একটি কবরের শিয়রে একটি লাঠি প্রোথিত আছে। তার সঙ্গে একখানা তক্তা বাঁধা। তক্তায় লাল বর্ণে আরবীতে লেখা আছে
ওমর আল-মামলুক!
আল্লাহ তোমার শাহাদাত কবুল করুন।
–নাসরুল্ল মামলুক
তার পার্শ্বের কবরের উপর তেমনি অপর এক তক্তায় অনুরূপ লাল হরফে লেখা আছে
নাসরুল মামলুক!
আল্লাহ আমার শাহাদাত কবুল করুন।
সুলতান আইউবী লেখা দুটি পড়ে কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে যে লোকটি ফাতিহা পাঠ করছিলেন, তার প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। পোশাকে-ধরনে লোকটাকে বিজ্ঞ আলেম মনে হলো। সুলতান তার প্রতি তাকালে তিনি সামান্য অবনত হয়ে বললেন- আমি এ মহল্লার মসজিদের ইমাম। যখনই জানতে পাই অমুক স্থানে শহীদের কবর আছে, সেখানে ছুটে গিয়ে ফাতিহা পাঠ করি। আমার বিশ্বাস, যে স্থানে শহীদের রক্ত ঝরে, সে জায়গা মসজিদের ন্যায় পবিত্র হয়ে যায়। আমি মানুষকে বলে থাকি, মুজাহিদ এমন এক মহান ব্যক্তিত্ব, যাঁর ঘোড়ার ক্ষুরের উড়ানো ধূলিকে আল্লাহও সম্মান করেন। মহান আল্লাহ তার পথে জিহাদকে সর্বোত্তম ইবাদত আখ্যা দিয়েছেন।
কিন্তু যারা আল্লাহর পথে জীবন কুরআন করে শাহাদাতবরণ করে থাকে, তাদের কেউ চেনে না। ইতিহাসে তাদের নয়- আমার নাম আসবে। অথচ যাদের মাধ্যমে আমি মর্যাদা লাভ করেছি, তারা হচ্ছে এরা, আপনি যাদের কবরে ফাতিহা পাঠ করছেন। সুলতান তাঁর সালারদের প্রতি তাকান এবং কবরের ফলক দুটোতে হাত বুলিয়ে বললেন- এই শব্দগুলো লাল রঙে আঙুল চুবিয়ে লেখা হয়েছে। উভয় ফলকের লেখক একই ব্যক্তি মনে হচ্ছে।
লাল রং নয়, সুলতানে মুহতারাম!- গেরিলা বাহিনীর সালার সারেম মিসরী বললেন- এ রক্ত। ওমর আল-মামলুকের ফলকের লেখাটা নাসরুল মামলুক নিজ দেহের রক্ত দ্বারা লিখেছেন। আর নিজ কবরের ফলকও নিজের রক্তে লিখে শাহাদাতবরণ করেছেন। ষোল সতের দিন আগে আমরা নদী থেকে বড় একটা নৌকা পাকড়াও করেছিলাম। তাতে দুশমনের গেরিলাদের জন্য রসদ বহন করা হচ্ছিলো। সে তথ্য আপনি জানেন। নৌকাটা আমাদের আটজন গেরিলা পাকড়াও করেছিলো। তাদের এ চারজন শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা প্রথমে সংবাদ পাই, রাতে নদীপথে বড় একটি নৌকা অতিক্রম করবে, তাতে দুশমনের রসদ ও অস্ত্র থাকবে। আমি আমার আটজন সৈনিক প্রেরণ করি। তারা ছোট্ট একটি নৌকায় করে অভিযান পরিচালনা করে।
মধ্যরাতের দিকে নদীর অপর তীর ঘেঁষে ঘেঁষে নৌকাটা যাচ্ছিলো। আমাদের কাছে তথ্য ছিলো, তাতে চার-পাঁচজন লোক থাকবে। কিন্তু আমাদের গেরিলাদের নৌকা তার কাছে গিয়ে পৌঁছুলে দেখা গেলো, তারা অন্তত বিশজন। আমাদের গেরিলারা দুশমনের নৌকায় আঁপিয়ে পড়ার আগেই দুশমনের তরবারীধারী সৈনিকরা আমাদের নৌকায় লাফিয়ে এসে পড়ে। আমাদের গেরিলাদের নৌ-যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিলো। তারা নৌকা থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে দুশমনের নৌকায় উঠে গিয়ে তার পালের রশি কেটে দেয়। উভয় নৌকায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। আমাদের গেরিলারা দুশমনের বড় নৌকা থেকে আমাদের নৌকায় অবস্থানরত দুশমনের প্রতি তীর ছোঁড়ে। মোটকথা, আমাদের সৈনিকরা বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলে যুদ্ধ করে উভয় নৌকা নিয়ে ফিরে আসে। দুশমনের প্রাণে রক্ষা পাওয়া সৈন্যরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ওপারে পৌঁছে যায়।
