আমাকে মোবারকবাদ সেদিন জানাবে; যেদিন তোমরা ক্রুসেডারদের পরাজিত করে বিজয়ী বেশে ফিরে আসবে। একদিন সুলতান আইউবী তাঁর সালারদের বললেন। তারা দিয়ারে বকরের বিজয়ের পর সুলতানকে মোবারকবাদ জানাতে এসেছিলো। শুনে তার চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে ওঠে, যেনো তিনি উদাত অশ্রুধারা প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন- তোমরা হয়তো ভুলে গেছো, আমরা ক্রুসেডারদেরকে পরাজিত করতে এবং তাদেরকে আমাদের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করতে ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। কর গণনা করে বললো, তোমরা ক বছর যাবত আপন ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছো? হিসাব করো, আমরা একে অপরের কী পরিমাণ রক্ত ঝরিয়েছি। একে কি তোমরা বিজয় বলবে? এই গৃহযুদ্ধে আমি যে বিজয় অর্জন করছি, তা আমার-তোমার বিজয় নয়- সেসব ক্রুসেডারদেরই বিজয়। দুভাই যখন আপসে লড়াই করে, তখন তাদের উভয়ের শত্ৰু সফল হয়। আমরা আপন ভাইদের উপর যে বিজয় অর্জন করেছি, আমি তাকে বিজয় বলতে প্রস্তুত নই।
ক্রুসেডাররা দমে গেলো কেনো?- এক সালার বললেন- আমরা আপনাকে তাদের উপরও বিজয় অর্জন করে দেখাবো।
তারা যেখানে থমকে বসে রয়েছে, সেখান থেকে তাদের বের হওয়ার এবং যুদ্ধ করার প্রয়োজন কী?- সুলতান আইউবী বললেন যুদ্ধের প্রথম নীতি কী? শত্রুর সামরিক শক্তিকে ধ্বংস করা। খৃস্টানরা আমাদের সামরিক শক্তিকে আমাদের ভাইদের হাতে ধ্বংস করানোর সকল ব্যবস্থা করে রেখেছে। আমরা আপসে যুদ্ধ করে করে দুর্বল হয়ে চলেছি আর ক্রুসেডাররা সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে দিন দিন শক্তিশালী হয়ে ওঠছে। ফিলিস্তিনীদের উপর তাদের কজা শক্ত হয়ে চলছে। শাসন-রাজত্ব মূলত আল্লাহর। মানুষের উপর যখন রাজত্বের নেশা চেপে বসে, তখন ধর্ম ও জাতির মর্যাদা মূল্য হারিয়ে ফেলে। ক্ষমতালি মানুষ আপন কন্যাদেরকে উলঙ্গ নাচাতে শুরু করে। মিথ্যা ও প্রতারণাকে বৈধ ও জরুরি মনে করে। ক্রুসেডাররা উম্মতে রাসূলকে রাজ্যে রাজ্যে বিভক্ত করে চলেছে আর আল্লাহর সৈনিকদেরকে এই রাজ্যে রাজ্যে ভাগ করে ইসলামের সামরিক শক্তিকে টুকরো টুকরো করে ফেলছে।
আমরা এসব অঞ্চল থেকে ফৌজের জন্য অনেক ভর্তি পাচ্ছি- এক সালার বললেন- ভালো ভালো সৈনিক ও অশ্বারোহী সৈন্য ভর্তি হচ্ছে।
কিন্তু আমি এতে আনন্দিত নই- সুলতান আইউবী সকলকে চমকে দিয়ে বললেন- এরা আমাদের বাহিনীতে শুধু এই জন্য ভর্তি হচ্ছে যে, তারা জানে, আমরা যে শহর জয় করি, আমাদের বাহিনী সেখানে লুট করে বেড়ায় এবং সেখানকার রূপসী মেয়েরা তাদের হয়ে যায়।
আমরা তো আমাদের বাহিনীকে এমন লুটতরাজ ও নারীর শ্লীলতাহানির অনুমতি কখনো দেইনি! অপর এক সালার বললেন।
কিন্তু আমাদের শত্রুরা আমাদের ফৌজের বিরুদ্ধে প্রচার করে বেড়াচ্ছে, সালাহুদ্দীন আইউবী তার বাহিনীকে লুটতরাজ ও বিজিত অঞ্চলের যুবতী মেয়েদের তুলে এনে উপভোগ করার অনুমতি দিয়ে রেখেছে। আমাদের ফৌজের বিরুদ্ধে তাদের এই অপপ্রচারের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে স্বয়ং মুসলমানদেরই অন্তরে ইসলামী ফৌজের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে যায় এবং আমরা কোথাও থেকে জনগণের সাহায্য না পাই। বরং কোনো নগরী অবরোধ করলে সেখানকার মানুষ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও যেনো আমাদের বাহিনীর মোকাবেলা করে। মনে রেখো আমার বন্ধুরা! সেনাবাহিনী ব্যতীত জনগণ আর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা ব্যতীত সেনাবাহিনী দুশমনের জন্য সহজ হয়ে যায়। তোমরা আপন শত্রুর পরিচয় লাভ করো। তোমাদের শত্রু বুদ্ধিমান। তারা আমাদের জাতি ও ফৌজের মাঝে বৈরিতা সৃষ্টি করার উত্তম ব্যবস্থা করে রেখেছে। কুরআন সীসাঢালা প্রাচীরের রূপ ধারণ করার আদেশ শুধু জনগণকে কিংবা শুধু সেনাবাহিনীকে প্রদান করেনি। সীসাঢালা প্রাচীর জনগণ ও সেনাবাহিনী মিলেই কেবল গড়তে পারে। এই প্রাচীরে ফাটল ধরানোর সকল পন্থা হচ্ছে সেনাবাহিনীকে অযোগ্য, কাপুরুষ ও দস্যুতে পরিণত করা, যাতে তারা জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে।
দিয়ারে বকরের মানুষদের উপর তো এমন কোনো ক্রিয়া দেখা যায়নি- সারেম মিসরী বললেন- তারা যখনই জানতে পারলো, অবরোধকারী আমরা এবং তাদের শাসকরা তাদের বাহিনীকে ইসলামী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাচ্ছে, তৎক্ষণাৎ তারা আমাদের জন্য নগরীর ফটক খুলে দিয়েছে।
সেখানে আমাদের অনেক গোয়েন্দা ছিলো- সুলতান আইউবী বললেন- সেখানকার সবকটি বড় মসজিদের ইমাম আমাদের লোক ছিলেন। তারা সেখানকার মানুষদেরকে শুধু নামায-রোযা-হজ্ব যাকাতের ওয়াজই শোনননি। সেই সঙ্গে তাদেরকে ক্রসেডারদের প্রত্যয়-পরিকল্পনা এবং নিজেদের ঈমান নিলামকারী আমীর-শাসকদের সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করেছেন। তারা জনসাধারণকে এই ধারণা প্রদান করেছেন যে, কোনো মুসলমান যখন অপর মুসলমানের রক্ত ঝরায়, তখন আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে এবং আল্লাহ সেই লোকালয়টির উপর গজব নাযিল করেন। তোমরা বোধ হয় জানো না, দিয়ারে বকরে দরবেশ, সুফী ও আলেমের বেশে ক্রুসেডারদের গোয়েন্দারা অবস্থান করছিলো এবং মুসলমানদের চেতনা ধ্বংসের জন্য কাজ করছিলো। কিন্তু আমাদের লোকেরা তাদের কতিপয়কে গোপনে অপহরণ করে হত্যা করেছে এবং তাদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা এখন যে ভূখণ্ডে অবস্থান করছি, এখানে ক্রুসেডারদের। নাশকতা-অরাজকতা সফল হয়ে চলছে।
