***
দিয়ারে বকর অবরোধের কাজটা এত দ্রুত সম্পন্ন হয় যে, ভেতরের লোকেরা মোকাবেলা করার সুযোগই পায়নি। সুলতান আইউবী ঘোষণা করেছেন, চেষ্টা করবে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি যতো কম হয়। ভেতরে আইউবীর গোয়েন্দা ছিলো। তাছাড়া সুলতান নিজেও নগরীর শাসকদের মহল ও হেডকোয়ার্টার সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। কাজেই মিনজানিকের সাহায্যে যেসব তরল দাহ্য পদার্থের পাতিল নিক্ষেপ করা হলো, সবই সরকারি : ভবনগুল্মের উপরই নিক্ষিপ্ত হয়েছে। বাইরে থেকে ঘোষণা করা হয়েছে- দিয়ারে বকরের আমীর! অস্ত্র ত্যাগ করে বেরিয়ে আসো। কিন্তু দুর্গোর পাচিলের উপর দাঁড়িয়ে আমীর পাল্টা ঘোষণা দেন, অস্ত্র ত্যাগ করা হবে না। পারো যদি যুদ্ধ করে শহর দখল করে নাও।
দিয়ারে বকরের বাহিনী দৃঢ়পদে মোকাবেলা করে। সুলতান আইউবী অবরোধের অভিজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু প্রতিরোধ দেখে তিনি বুঝে ফেললেন, এই অবরোধ দীর্ঘ হবে এবং এর জন্য অপেক্ষাকৃত বেশিই কুরবানী দিতে হবে।
পাঁচিল ভাঙার দায়িত্বে নিয়োজিত সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে পাঁচিলের নিকট পৌঁছে যায়। কিন্তু উপর থেকে তাদের উপর আগুন ও ভারি পাথর নিক্ষেপ করা হয়। প্রধান ফটকের উপর মিনজানিকের সাহায্যে দাহ্য পদার্থ ভর্তি পাতিল নিক্ষেপ করে সলিতাওয়ালী তীর ছোঁড়া হয়। তাতে ফটকের কাঠের অংশটা পুড়ে যায় বটে; কিন্তু লোহার অংশ অটুট থাকে, যার মধ্যদিয়ে অতিক্রম করা সম্ভব নয়। তথাপি ফটক অতিক্রম করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। আকাশে তীর উড়ছে।
সুলতান আইউবী বিস্মিত যে, ভেতরের লোকেরা এতো কঠোর মোকাবেলা কেন করছে! রহস্যটা পরে উনোচিত হয় যে, অবরোধের সংবাদ প্রকাশ পাওয়ামাত্র শহরে ঘোষণা করে দেয়া হয়, ক্রুসেডাররা শহর অবরোধ করেছে। এই ঘোষণায় নগরবাসী জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। তারা ফৌজের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেখা গেছে, চারদিকে ফৌজের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যুদ্ধ করছে। কিন্তু সুলতান আইউবী তারপরও নির্দেশ দেননি, নগরীর উপরও গোলা নিক্ষেপ করো।
অবরোধ আট দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। বেশি ক্ষতি আইউবীর বাহিনীর হচ্ছিলো। কেননা, তাঁর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেনাদল একের পর এক সম্মুখে এগিয়ে যাচ্ছিলো আর তীরের নিশানায় পরিণত হচ্ছিলো। কিন্তু পরে বিস্ময়কর ঘটনা এই ঘটে যে, হঠাৎ একদিন নগরীর পাঁচিলে ধ্বনিত হয়ে ওঠে। এরা ক্রুসেডার নয়- ইনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী! তার পতাকা দেখো। মুসলমানগণ! তোমরা আপসে লড়াই করছে। পরক্ষণে সুলতান আইউবীর বাহিনীতে দিয়ারে বকরের যেসব সৈন্য ও কমান্ডার ছিলো, তারা উচ্চকণ্ঠে হাঁক দিতে শুরু করে। আমরা তোমাদেরই সৈন্য- তোমাদেরই ভাই। দুর্গের ফটক খুলে দাও।
নগরীর ভেতরে সুলতান আইউবীর যে চর ও আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মী ছিলো, অবস্থা বেগতিক দেখে তারাই ছুটে গিয়ে জনতার কানে দিয়েছে, অবরোধকারীরা খৃস্টান বাহিনী নয়- মুসলমান এবং ইনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। কাজটা সহজ ছিলো না। একজন শত্রুর গোয়েন্দা জনগণকে স্বাধীনতা ও সরকারী ঘোষণার পরিপন্থী কথা বলতে পারে না। এই অভিযানে দুচারজন গোয়েন্দা ধরাও পড়েছে। তারা সাফল্য অর্জন করে ফেলেছে। অবরোধের ৯ দিনের মাথায় ফৌজ ও সাধারণ নাগরিকদের চিন্তা-চেতনা বদলে যায়। জনগণ প্রশাসনের বাধা ও হুমকি উপেক্ষা করে নগরীর ফটক খুলে দেয়। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নগরীতে প্রবেশ করলে জনগণ তাকবীর ধ্বনি তুলে তাঁকে স্বাগত জানায়। নারীরা বাড়ির ছাদ ও বারান্দা থেকে মাথার ওড়না ছুঁড়ে ফেলে সুলতানকে স্বাগত জানায়।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী দিয়ারে বকরের আমীরকে নগরী ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। তিনি নুরুদ্দীন ইবনে কারা আরসালানকে নগরীর আমীর নিযুক্ত করেন। সুলতান আইউবী তাকে জরুরি নির্দেশনা প্রদান করে উক্ত অঞ্চল থেকে আরো সৈন্য সংগ্রহের নির্দেশ প্রদান করেন।
১১৮৩ সালের মে মাসে সুলতান আইউবী দিয়ারে বকরের ক্ষমতা দখল করে হাল্ব অভিমুখে রওনা হন। হাবের শাসনকর্তা ইমাদুদ্দীন এবং মসুলের শাসনকর্তা ইযযুদ্দীন তাঁর সবচে বড় মুসলিম দুশমন। তাই হালব-মসুল এখন তার টার্গেট।
৮.২ হাবীবুল কুদ্দুস
হাবীবুল কুদ্দুস
বিজয় অর্জন করে কে না আনন্দিত হয়? সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কোনো যুদ্ধ কিংবা অবরোধে জয়ী হলে তারও চেহারায় আনন্দের দ্যুতি ভেসে ওঠতো। তার বাহিনী উল্লাস করতো, উট-বকরি-দুম্বা জবাই করে ভালো খাবারের আয়োজন করতো এবং আরামে একটা ঘুম দিতো। কিন্তু ১১৮৩ সালের এই দিনগুলোতে তার চেহারায় আনন্দের কোনো ছাপ ছিলো না। তার সৈন্যদেরও উল্লাস করতে দেখা যায়নি। অথচ এক বছর সময়ে তিনি বেশকটি দুর্গ জয় করে নেন এবং আর্মেনীয় সম্রাটের ন্যায় শক্তিশালী শাসক থেকে পরাজয়ের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে তাকে কঠিন থেকে কঠিনতর শর্ত মান্য করতে বাধ্য করেন।
ঐতিহাসিকগণ এ সময়টাকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিজয়ের কাল আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু তার মানসিক অবস্থাটা ছিলো, যেনো প্রতিটি জয়ের পর তার চেহারায় একটা করে রেখা জন্ম নিচ্ছে বার্ধক্য ও হতাশার বলিরেখা। এর একটি বিজয়েও তিনি আনন্দিত নন। তার গেরিলা বাহিনীর অধিনায়ক সারেম মিসরী বিজয়ীর ঢংয়ে একের পর এক রিপোর্ট দিচ্ছেন, গত রাতে আমার বাহিনী অমুক স্থানে গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে দুশমনের এ পরিমাণ ক্ষতি করেছে, অমুক সময় আমরা এই সাফল্য অর্জন করেছি ইত্যাদি। কিন্তু রিপোর্ট শুনে সুলতান আইউবী শুধু মাথা দুলিয়ে তাকে সাধুবাদ জানিয়েই মাথাটা নত করে ফেলছেন, যেনো তার হৃদয়ের ওপর এমন এক বোঝা এসে চেপেছে, যা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই।
