সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আপনাকে সালাম বলেছেন একজন বললো- তিনি বলেছেন, তাঁর কাউকে গ্রেফতার করার ইচ্ছে নেই। ইযযুদ্দীন ফেরত যান এবং মসুল চলে যান এবং ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন। আর আর্মেনীয় সম্রাটের জন্য সুলতানের বার্তা হচ্ছে, সুলতানের ফৌজ তালখালেদের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আপনি সন্ধ্যা নাগাদ সংবাদ পেয়ে যাবেন। আপনার ফিরে পৌঁছার আগে আপনার রাজধানী আমাদের দখলে চলে আসবে। আপনি যদি মিসর-সিরিয়ার সুলতানের শর্তাবলী কবুল করে নেন, তাহলে তালখালেদ থেকে ফৌজ ফিরে আসতে পারে। তবে আপনার যদি মোকাবেলার ইচ্ছা থাকে, তাহলে আপনার জন্য আগে পরিণতি ভেবে দেখার পরামর্শ আছে। আপনি উত্তর দিন। এই মুহূর্তে আপনি আমাদের ঘেরাওয়ের মধ্যে অবস্থান করছেন।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে আমার সালাম বলবে আর্মেনীয় সম্রাট বললেন- আমি বিকাল নাগাদ আমার এক মন্ত্রীকে সুলতানের নিকট প্রেরণ করছি।
উভয় আরোহী ফিরে যায়। আর্মেনীয় সম্রাটের যে মন্ত্রী এ মুহূর্তে তার সঙ্গে আছে, তার নাম বকতিয়োর। সম্রাট তাকে বললেন, আমাদের আইউবীর সঙ্গে শত্রুতায় জড়িয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। ওদিকে তালখালেদ অবরুদ্ধ, এদিকে আমরা। তুমি যাও, সালাহুদ্দীন আইউবীকে বলো, আপনি আপনার ফৌজ প্রত্যাহার করে নিন। আমরা আপনার কোনো শত্রুর সঙ্গে কোনো সন্ধি বা ঐক্য গড়বো না।
বকতিমোর বিচক্ষণ মন্ত্রী। তিনি সুলতান আইউবীর সঙ্গে কথা বলেন। সুলতান কঠিন কঠিন শর্ত আরোপ করেন। বকতিয়োর সকল শর্ত মেনে নেয়। তিনি লিখিত প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন, আর্মেনীয় সম্রাটের বাহিনী সুলতান আইউবীর কোনো শত্রুকে সাহায্য করবে না।
সুলতান আইউবী অবরোধ তুলে নেন এবং আর্মেনীয় সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করেই তালখালেদ অভিমুখে রওনা হয়ে যান।
***
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়ারে বকর। সে যুগে জায়গাটার নাম, ছিলো উমাইদা। সামরিক দিক থেকে জায়গাটার অপরিসীম গুরুত্ব ছিলো। তার আশপাশের অঞ্চলে যারা বসবাস করতো, তাদের অনেকেই যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলো। সুলতান আইউবীর বহু সৈনিক অত্র অঞ্চলের বাসিন্দা। সেনা সংকট দেখা দিলে সুলতান আইউবী এখান থেকে লোক নিয়ে তা পূরণ করতেন। এখানকার সাধারণ মানুষ সুলতান আইউবীর সমর্থক ছিলো বটে; কিন্তু শাসকরা নিজ নিজ ক্ষমতার স্বার্থে আইউবীর বিরোধী ছিলো এবং মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও খৃস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের প্রচেষ্টায় রত ছিলো।
সুলতান আইউবী তাঁর বাহিনীকে দিয়ারে বকর অভিমুখে যাত্রা করার আদেশ দেন। অগ্রযাত্রা ছিলো বিদ্যুগতিসম্পন্ন। সুলতান আইউবী তাঁর সালারদেরকে শুধু এতোটুকু অবহিত করেন যে, দিয়ারে বকর অবরোধ করে জায়গাটা দখল করে নিতে হবে। বিজয় অর্জিত হলে তার আমীরের কোনো শর্ত মান্য করা হবে না এবং তার প্রতি কোনো প্রকার মমতা প্রদর্শন করা হবে না।
আমার অভিমত হচ্ছে ঐ আমীরদের উপর কোনো প্রকার জুলুম না করাই উচিত হবে- এক সালার বললেন- তাদের বাহিনীকে আমাদের বাহিনীতে যুক্ত করে নিয়ে তাদেরকে নামমাত্র আমীর থাকতে দিন।
এখন আর আমি জাতির আস্তিনে কোনো সাপই পুষবো না সুলতান আইউবী বললেন- আমি সংবাদ পেয়েছি, এই লোকটি তার অঞ্চলের লোকদেরকে আমাদের বাহিনীতে যোগ দিতে বাধা সৃষ্টি করছে এবং খেলাফতের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। একটা কথা সবসময় মনে রাখবে, যে শাসক কেন্দ্র থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন হতে চায়, তারা অবশ্যই বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত। তাদের এই গাদ্দারী খুবই ভয়ানক হয়ে থাকে। কেননা, তারা জাতির শত্রু থেকে সাহায্য নিয়ে সেই সাহায়্য জাতিরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করে থাকে। আমি এজাতীয় ব্যক্তিদের মস্তক পিষে ফেলতে চাই। যাতে আমার প্রকৃত শত্রু তথা খৃস্টানরা যখন আমার মুখোমুখি লড়াইয়ে লিপ্ত হবে, তখন পেছন থেকে আমার উপর আক্রমণ করার মতো কেউ না থাকে এবং মাটি ফুড়ে বেরিয়ে কোনো সাপ যেনো আমাকে দংশন করতে না পারে। দিয়ারে বকর আল্লাহর সৈনিকদের ভূখণ্ড। আমাদের বাহিনীর এক-চতুর্থাংশ সৈনিক এই ভূখণ্ডের লোক। আমরা যদি আমাদের সেই যোদ্ধাদের বিশ্বাসঘাতক শাসকদের ক্ষমা করি, তাহলে অত্র ভূখণ্ডের সাধারণ লোকদের ঈমানও নষ্ট হয়ে যাবে এবং তাদের যুদ্ধবিদ্যাও হারিয়ে যাবে।
সমগ্র জাতি তথা কোনো দেশের সকল মানুষ গাদ্দার কিংবা বেঈমান হয় না। শাসক যদি ঈমান বিক্রেতা হয়; তাহলে জাতির ঈমানও নষ্ট হয়ে যায়, উন্নততর জাতিও মর্যাদাহীন হয়ে পড়ে। তাদের চেতনা মরে যায়। পরিণতিতে জাতি একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে জীবিত থাকে না। আমাদেরকে এ জাতীয় শাসকদের পর্তন ঘটিয়ে সালতানাতে ইসলামিয়ার জন্য একটি কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। আপনারা দেখেছেন, বাগদাদের খেলাফত পঙ্গু হয়ে গেছে। খেলাফতের আদেশ-নিষেধ পালিত হলে আমাদেরকে এসব সেনা অভিযান পরিচালনা করে ফিরতে হতো না। দেশের অস্থিতিশীলতা দূর করা এবং ঈমান নিলামকারী শাসকদের নির্মূল করা সেনাবাহিনীর কর্তব্য। আমি পুনর্ব্যক্ত করতে বাধ্য যে, ইতিহাস বলবে, হিজরী ষষ্ঠ শতকের বাহিনী অকর্মণ্য ছিলো। তারা না তাদের খেলাফতের মর্যাদা অটুট রেখেছে, না শত্রুকে দমন করেছে।
