আমি জানি- আর্মেনীয় সম্রাট বললেন- খৃস্টানদের দৃষ্টিও হাবের উপর নিবদ্ধ হয়ে আছে।
সে কারণেই আমি খৃস্টানদের সঙ্গে কোনো চুক্তি করছি না- ইযযুদ্দীন বললেন- সাহায্যের বিনিময়ে আমাদের থেকে তারা হাল্ব দাবি করবে।
অবশ্যই করবে- কুতুবুদ্দীন গাজী বললেন- আমি মনে করি আপনাদের আপসে সন্ধি করে নেয়া উচিত। আপনাদের দুজনের বাহিনী একত্রিত হলে সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করতে পারে।
আমি জানতে পেরেছি, আইউবীর বাহিনী তালখালেদ অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছে। ইযযুদ্দীন বললেন।
আইউবীর সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই- আর্মেনীয় ম্রাট বললেন- আমার বিশ্বাস, তিনি আমার সীমান্তের কাছে ঘেঁষবেন না। আমি তার অগ্রযাত্রা পর্যবেক্ষণ করেছি। তিনি অন্য কোনো দিকে যাচ্ছেন।
আমার ক্রুসেডারদের উপর কোনো আস্থা নেই- ইযযুদ্দীন বললেন তারা আমাকে সব ধরনের সাহায্য প্রদান করছে বটে; কিন্তু যুদ্ধ শুধু সরঞ্জাম আর উপদেষ্টাদের দ্বারা পড়া যায় না। তাদেরকে পরামর্শ দিচ্ছি, আমি আইউবীকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলি আর তোমরা তার উপর আক্রমণ করো। তাদেরকে আমি এই পরামর্শও দিয়েছিলাম যে, তোমরা দামেশক এবং বাগদাদকে অবরোধ করে ফেলে। যদি তারা আমার এই পরামর্শ মোতাবেক কাজ করে, তাহলে সালাহুদ্দীন আমাদের সীমানা ত্যাগ করতে বাধ্য হবে। কিন্তু জানি না তারা কী চিন্তা করছে।
তারা আমাদের প্রত্যেককে তাদের প্রজা বানানোর চিন্তা করছে আর্মেনীয় সম্রাট বললেন- সালাহুদ্দীন আইউবী না থাকলে ক্রুসেডাররা আমাদেরকে খেয়ে ফেলতো। তাদের উপর আমাদের আস্থা না রাখা উচিত।
তাহলে আপনি আমাকে সাহায্য দিন- ইযযুদ্দীন বললেন- আমি এগিয়ে গিয়ে আইউরীর উপর আক্রমণ করি। আপনিও তার উপর হামলা করুন।
এ বিষয়টির উপর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মতবিনিময় হয়। শেষে আর্মেনীয় সম্রাট এই শর্তে ইযযুদ্দীনের প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করেন যে, তার বাহিনীর সেনা সদস্য এবং পশুদের খাদ্যের দায়িত্ব ইযযুদ্দীন বহন করবেন। ইযযুদ্দীন শর্তটা মেনে নেন এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তিনি সুলতান আইউবীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হবেন এবং আর্মেনীয় সম্রাটের বাহিনী সুলতান আইউবীর বাহিনীর উপর পেছন থেকে আক্রমণ করবে। ইনুদ্দীন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যোদ্ধা। তিনি যুদ্ধ লড়তেও জানেন, লড়াতেও জানেন। তিনি সেখানে বসেই যুদ্ধের পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলেন।
***
এখন রাত দ্বি-প্রহর। ইযযুদ্দীন ও আর্মেনীয় সম্রাট যুদ্ধের পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন। হঠাৎ কতগুলো ঘোড়ার পদশব্দে রাতটা যেনো কেঁপে ওঠে। আর্মেনীয় ম্রাট দারোয়ানকে ডেকে ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললেন- যেসব সৈন্যের ঘোড়া রশি খুলে ছুটে বেড়াচ্ছে, সকালে তাদেরকে এখানে নিয়ে আসবে। গাধাগুলো কেমন অসচেতনের ঘুম ঘুমাচ্ছে।
কিন্তু এই ঘোড়া তার ফৌজের নয়। এরা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গেরিলা সৈনিক। সংখ্যায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশজনের মধ্যে। এটা তাদের কমান্ডো অপারেশন।
খানিক পরেই বাইরে প্রলয় শুরু হয়ে যায়। আইউবীর গেরিলারা দুভাগে বিভক্ত হয়ে ধেয়ে এসে ক্যাম্প অতিক্রম করে চলে যায়। তাদের হাতে প্রদীপ ছিলো। এই প্রদীপের আগুন দ্বারা ফৌজের তাঁবুগুলো ভষ্ম করে চলে যায়। কয়েকটি তাঁবুতে আগুন ধরে যায়। ঘুমন্ত সৈনিকরা বিড়বিড়িয়ে ওঠে। পরক্ষণেই বাহিনীর আরেকটি ঢেউ ধেয়ে আসে, যারা বর্শা ও তরবারী দ্বারা যাকেই সামনে পাচ্ছে, কেটে কেটে অতিক্রম করে যাচ্ছে। প্রজ্বলমান তাঁবুগুলো আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। এবার শুরু হয় তীরের বর্ষণ। জ্বলন্ত সলিতাওয়ালা তীরও আছে। রশিবাধা উট-ঘোড়াগুলোর মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আহতদের আর্তচিৎকার কেয়ামতের বিভীষিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এবার পশুগুলোর বাঁধন খুলে যায় এবং উট-ঘোড়াগুলো ছুটে এদিক-ওদিক পালাতে শুরু করে। এই ঘটনাযজ্ঞ ও হাঁক-চিৎকারের মধ্যে ক্যাম্পের আশপাশ থেকে উচ্চকণ্ঠের শব্দ ভেসে আসে অস্ত্র ফেলে দাও। ইযযুদ্দীন! তুমি আমাদের হাতে এসে ধরা দাও। আর্মেনিয়ার সম্রাট! তোমার তালখালেদ আমাদের অবরোধে আছে।
কিন্তু একজনও এসে ধরা দিচ্ছেন না। ইযযুদ্দীন তার এক অনুগত কমান্ডারকে বললেন, আমাকে একটা ঘোড়া দাও। কমান্ডার বড় কষ্টে তাকে একটা ঘোড়া এনে দেয়। তিনি তাতে আরোহণ করে সুযোগ বের করে এই কেয়ামতের মধ্য থেকে বেরিয়ে যান। নিজ বাহিনী, ব্যক্তিগত আমলা-কর্মকর্তা এবং সঙ্গে করে আনা মেয়েদের কী হবে, তার কোনো ভাবনাই ভাবলেন না। আপন জীবনটা রক্ষা করে কোনো মতে পালিয়ে যান।
সেকালের এক ঐতিহাসিক আসাদুল আসাদী লিখেছেন, সুলতান আইউবী ঘেরাও সংকীর্ণ করে সেই শাসকগুলোকে ধরে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। তার একটি কারণ এই হতে পারে, তিনি সেই শাসকমণ্ডলীকে নিজের জোটভুক্ত করে ফিলিস্তীন জয়ে ব্যবহার করতে চাচ্ছিলেন। তবে কারণ যাই থাকুক, ১১৮৩ সালের এই যুদ্ধটা সুলতান আইউবী তার গেরিলাদের দ্বারা এভাবেই লড়িয়েছেন। তিনি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে কাউকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করেননি। এই গেরিলা অভিযানটা সুলতান আইউবী নিজে পরিচালনা করেছেন।
আর্মেনীয় সম্রাট পালানোর পরিবর্তে সেখানেই অবস্থান করা সঙ্গত মনে করলেন। রাত কেটে যায়। ভোর হলে এবার দেখা গেলো আসল চিত্র। ক্যাম্পে ভস্মীভূত তাবুমালার ছাই-ভস্ম ছড়িয়ে রয়েছে। মৃতদেহগুলো এখানে-সেখানে পড়ে আছে। আহতরা ছটফট করছে। উট-ঘোড়াগুলো ওদিক-ওদিক ঘুরে ফিরছে। যারা আক্রমণ করলো, তারা কোথায় গেলো পাত্তা নেই। আর্মেনীয় সম্রাট জানতেন, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এখানেই কোথাও অবস্থান করে থাকবেন। আইউবীকে কোথায় পাওয়া যাবে ভাবতে শুরু করেন। ইত্যবসরে তিনি দুজন আরোহীকে দেখতে পান। তারা এগিয়ে আর্মেনীয় সম্রাটের সম্মুখে এসে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে সালাম করে। লোক দুজন সুলতান আইউবীর সামরিক কর্মকর্তা।
