***
হার্যাম একটি মনোরম জায়গা। চারদিকে সবুজের সমারোহ। ঝর্নাধারা ও ঘন গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ণ। আছে সবুজে ঢাকা টিলা-পর্বতও। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপর আরো রং চড়িয়ে সাজিয়ে-গুছিয়ে জায়গাটাকে জান্নাতে পরিণত করে নিয়েছেন আর্মেনিয়ার সম্রাট। ক্যানভাসে শামিয়ানায় তৈরি তাবুটা যেনো এক রাজপ্রাসাদ। ভেতরে রঙিন আলোর ঝাড়-লণ্ঠন। সম্মুখে দণ্ডায়মান ছয়টি ঘোটকযান ও রক্ষী বাহিনী। নাচ গানের বিশেষ আয়োজন করা আছে। আর্মেনিয়ার সবচে রূপসী গায়িকাদের এনে হাজির করা হয়েছে। হেরেমের নির্বাচিত মেয়েদের জন্য আলাদা তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। আর্মেনীয় সম্রাট ক্ষরদীনের আমীরকেও আমন্ত্রণ করেছেন। মারদীন আর্মেনিয়ারই সন্নিকটস্থ একটি অঞ্চল, যার আমীর কুতুবুদ্দীন গাজী। মারদীন তার জমিদারী। শামিয়ানা-ক্যানভাস ও তাঁবু থেকে সামান্য দূরে আর্মেনীয় সম্রাটের দুপ্লাটুন সৈন্য তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান নিয়েছে।
আর্মেনীয় সম্রাট মারদীনের আমীরের সঙ্গে দুতিন দিন যাবত শিকার খেলতে থাকেন। তারপর একদিন মসুলের শাসনকর্তা ইযযুদ্দীন এসে পৌঁছেন। তিনিও সঙ্গে করে দুপ্লাটুন নির্বাচিত সৈন্য নিয়ে আসেন। রাতে নাচ-গানের আসর বসে। সোরাহির পর সোরাহি মদ শূন্য হতে থাকে। মদ আর নারী এমনই এক অবস্থার সৃষ্টি করে যে, এই মুসলিম আমীর-উজীর ও সালারগণ প্রথম কেবলার সঙ্গে খানায়ে কাবাকেও ভুলে গেছেন। রাতটা বিলাসিতার মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করে তারা দিনভর গভীর ঘুম ঘুমান। অপরদিকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সেখান থেকে দুআড়াই মাইল দূরে এক স্থানে একটি গেরিলা ইউনিটের সঙ্গে পাথুরে মাটির উপর ঘুমিয়ে আছেন। তিনি ছোট্ট একখানা সফরী তবু সঙ্গে রেখেছেন, যাতে স্থাপন করতে ওঁ গুটাতে বেশি সময় না লাগে। এখানে তিনি সুলতান নন গেরিলা সৈনিক হয়ে এসেছেন।
সুলতান আইউবী হারযামের উক্ত রাজকীয় ক্যাম্পটার পরিসংখ্যান নেয়া এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য যাযাবরের বেশে গুপ্তচর পাঠিয়ে দিয়েছেন। ফাহদও আছে তাদের মধ্যে। ফায়ূদের পরণে পুরাতন ছেঁড়া কাপড়। তিন চারজন গোয়েন্দা আপন আপন উটের লাগাম ধরে ক্যাম্পের চতুর্পার্শ্বে ঘুরতে থাকে। কেউ তাদেরকে সরে যেতে বললে তারা হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাচ্ছে। ফাহ্দ রাজকীয় শামিয়ানার নিকট দিয়ে অতিক্রম করলে সেই যুবতী সেবিকাকে দেখতে পায়, যে তাকে রোজি খাতুনের বার্তা পৌঁছিয়েছিলো। ফাঁদ মেয়েটিকে চিনে ফেলে। মেয়েটি ইযুদ্দীনের খাস সেবিকা। এখানে তারই সঙ্গে এসেছে।
ফাহদ ভিখারীর ন্যায় হাঁক দেয়- শাহজাদী! আপনার গোলাম সফরে আছে। কিছু খেতে দিন না।
ভাগো এখান থেকে মেয়েটি দূর থেকে ধমক দেয়- অন্যথায় ধরা খাবে।
ফাহ্দকে মসুলে কেউ ধরতে পারেনি- ফাহদ আসল কণ্ঠে বললো এখানে তুমি ধরিয়ে দেবে!
উহ!- মেয়েটি এদিক-ওদিক তাকিয়ে লোকটির নিকটে চলে আসে তুমি এসে পড়েছো? দেখলে তো, আমার সংবাদ মিথ্যা ছিলো না। কিন্তু এখানে আর একদণ্ডও দাঁড়িয়ে থেকো না। রাতে কোথায় থাকবে? আজ রাত আশা করি তাড়াতাড়ি অবসর হয়ে যাবো।
তুমিই তো বলেছিলে, কর্তব্যের উপর আবেগকে জয়ী হতে দিও না ফাহদ বললো- আমাদের কর্তব্য এখনো পালিত হয়নি। বেঁচে থাকলে দেখা হবে।
সবকিছু দেখে নিয়েছো?- মেয়েটি জিজ্ঞেস কর- সুলতান কোথায়?
সুলতান শীঘ্রই এসে পড়বেন। ফাঁদ উত্তর দেয়।..
ঐ, লোকটা কে রে?- কারো কণ্ঠ শোনা যায়- হতভাগাকে তাড়িয়ে দাও ওখান থেকে।
মেয়েটি ফাহদকে ধমকাতে শুরু করে। ফাহদ সেখান থেকে চলে যায়। মেয়েটি একটি তাঁবুর আড়ালে আড়ালে ফাঁদের চলে যাওয়া দেখতে থাকে। ভাবে, ফাঁদের দায়িত্ব কতোই না ঝুঁকিপূর্ণ, কতোই না কষ্টকর। মেয়েটির চোখ থেকে অশ্রু বেরিয়ে আসে। এই সুঠাম যুবকটাকে মনে প্রাণে কামনা করে মেয়েটি। কিন্তু যখন তার সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে সাক্ষাৎ করে, তখন আলোচনা আবেগের কম এবং কর্তব্যের বেশি করে থাকে। সুলতান আইউবী যে কটি যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন, সেসব এই ফান্দ আর মেয়েটির ন্যায় গোয়েন্দাদের বদৌলতেই জিতেছেন। এরা শত্রুর ঘরে অবস্থান করে গোপন যুদ্ধ লড়ে থাকে। এদের জীবন প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখে থাকে। এই যুবক ফাহদ আর সেবিকা মেয়েটির মাঝে ভালোবাসা আছে। কর্তব্য যদি প্রতিবন্ধক না হতো, তাহলে মেয়েটি তাকে এভাবে জীবন হাতে নিয়ে ঘুরে-ফিরতে বারণ করে দিতো। মেয়েটি জানে, ফাহদ এই পাথুরে ভূমিতে রাতে কোথায় ঘুমায়।
যাক গে, আমরা আল্লাহর সান্নিধ্যে মিলিত হবো। মেয়েটি মনে মনে বলে নিজ কাজে চলে যায়।
রাতের প্রথম প্রহর। হারযামের শাহী ক্যাম্পে আজ নাচ-গানের কোনো প্রোগ্রাম নেই। সর্বত্র নীরবতা বিরাজ করছে। আর্মেনীয় ম্রাটের শামিয়ানায় তার সঙ্গে ইযযুদ্দীন ও মারদীনের আমীর কুতুবুদ্দীন গাজী উপবিষ্ট। ইযযুদ্দীন বলছেন—
সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, সালাহুদ্দীন তার সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করছে। আমরা যদি তার জোটভুক্ত হয়ে যাই, তাহলে সে আমাদেরকে তার গবর্নর নিযুক্ত করে রাখবে। আমরা স্বাধীন থাকতে পারবো না। ইতোমধ্যে তিনি মুসলিম আমীরদের বেশ কটি দুর্গ দখল করে নিয়েছেন এবং তার সামরিক শক্তিতে ভীত হয়ে সে সকল আমীর ও দুর্গপতি তার আনুগত্য বরণ করে নিয়েছেন। এমতাবস্থায় আমি যদি তাকে প্রতিহত না করি, তাহলে তিনি মসুল দখল করেই ক্ষান্ত হবেন নাহাবের উপরও চড়াও হয়ে বসবেন। কিন্তু আমি একা তো আর তার সঙ্গে লড়াই করতে পারবো না। ইযুদ্দীন আমার সঙ্গে আছেন। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে সালাহুদ্দীন বাহিনী নিয়ে লুটেরার ন্যায় ঘুরে ফিরছে, সেই পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দীনকে তার বাহিনী হাব থেকে বের হতে দেয়া সমীচীন হবে না। হাবের প্রতিরক্ষা অধিক জরুরি। কারণ, অঞ্চলটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
