আমি কথাগুলো বারবার এ জন্য ব্যক্ত করছি, যাতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা- যা কিনা সময়ের বড় প্রয়োজন- তোমাদের হৃদয় জগতে অংকিত হয়ে যায় এবং পাছে আপন ভাইকে সামনে দেখে যে কিনা আমাদের ধর্মের শত্রু- তোমাদের তরবারী অবনত না হয়ে পড়ে। জাতির কেন্দ্র ও ঐক্য বিনষ্টকারী ভাই শত্রু অপেক্ষা ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে। আমি তোমাদেরকে বলেছি, আমরা তালখালেদ অবরোধ করতে যাচ্ছি এবং এটি আমাদের সর্বশেষ বিরতি। এর পরেই তালখালেদের অবস্থান। অবরোধে কার কার ইউনিট অংশগ্রহণ করবে, আমি তোমাদেরকে অবহিত করেছি। রিজার্ভ ফোর্স আমার সঙ্গে থাকবে। কমান্ডো বাহিনীটি ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে সেই পথগুলোকে আয়ত্ত্বে নিয়ে নেবে, যেসব পথে খৃস্টান বাহিনীর আসবার আশঙ্কা আছে কিংবা আর্মেনীয় বাহিনী অবরোধ ভাঙতে আসতে পারে। গোয়েন্দাদের রিপোর্ট মোতাবেক খৃস্ট বাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কা নেই। তারপরও সতর্ক থাকা আবশ্যক।
আমরা আর্মেনিয়া দখল করতে চাই না। আর্মেনীয় সম্রাটকে আমাদের শর্ত মান্য করতে বাধ্য করতে হবে। আমি তোমাদেরকে বলেছি, ইযযুদ্দীন আর্মেনীয় সম্রাটের সাহায্য প্রত্যাশী। আমাদেরকে আর্মেনিয়ার উপর আপদরূপে আবির্ভূত হতে হবে, যাতে আর্মেনিয়ার সম্রাট ইযযুদ্দীনকে সাহায্য দিতে না পারে। তবে আমি তোমাদেরকে কোনো প্রকার আত্ম প্রবঞ্চনায় লিপ্ত করতে চাই না। এমনো হতে পারে, আর্মেনীয় বাহিনী ও জনসাধারণ আমাদের এমন কঠোর মোকাবেলা করবে যে, আমাদেরকে পিছপা হতে হবে। আর তখন ইযযুদ্দীনও আমাদের উপর আক্রমণ করে বসতে পারে। আক্রমণ করতে পারে হালবের শাসনকর্তা ইমাদুদ্দীনও। আমাদের পতন দেখে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমীরগণও আমাদেরকে ঘোড়ার পায়ের তলায় পিষ্ট করার চেষ্টা করবে। এসব ফলাফল এবং আশঙ্কাসমূহকে সামনে রেখেই আমাদেরকে লড়াই করতে হবে। আমি তোমাদেরকে মানচিত্র দেখিয়েছি। কারো মনে কোনো সংশয় থাকলে দূর করে নাও। এই অবরোধ ও আক্রমণ আমাদেরকে এমন মহাবিপদে ফেলে দিতে পারে যে, আমরা পরাজয় বরণ করতে পারি।
***
সুলতান আইউবী যখন তাঁর শেষ ছাউনীতে নিজ সালারদেরকে পূর্বপ্রদত্ত নির্দেশনাবলী স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন রাতের শেষ প্রহর। মানচিত্রটা তার সম্মুখে পড়ে আছে। দারোয়ান তাবুতে প্রবেশ করে সুলতানের কানে কী যেনো বললো। সুলতান বললেন- এক্ষুনি ভেতরে পাঠিয়ে দাও।
দারোয়ান তাবুর পর্দা ফাঁক করে মাথায় ইঙ্গিত করে। ফাহদ তাবুতে প্রবেশ করে। সে পথে কোথাও না থেমে মসুল থেকে এখানে এসে পৌঁছেছে। চেহারাটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ঠোঁট শুষ্ক। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে। আসছে। গোয়েন্দা উপনেতা হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তাঁবুতে উপস্থিত।
মনে হচ্ছে বিশ্রাম ছাড়াই তুমি পথ অতিক্রম করেছো- সুলতান আইউবী ফাহদকে উদ্দেশ করে বললেন- বসে পড়ো। সুলতান দারোয়ানকে ডাক দিয়ে বললেন- এর খাবার এখানেই নিয়ে আসো।
সংবাদটা এমন ছিলো যে, বিশ্রামের সুযোগ নেয়া অপরাধ মনে হচ্ছিলো ফাঁদ ক্ষীণকণ্ঠে বললো- আমার ঘোড়াটা বোধ হয় জীবিত নেই।
খবর বলো।
আর্মেনিয়ার সম্রাট তার রাজধানীতে নেই- ফাহদ রিপোর্ট প্রদান করে তিনি হারযামে তাঁবু গেড়েছেন। ইযযুদ্দীন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হারযাম যাচ্ছেন। বুঝাই যাচ্ছে, তারা আমাদের ফৌজের বিরুদ্ধে চুক্তিবদ্ধ হবে। আর্মেনীয় সম্রাটের সঙ্গে তার দুপ্লাটুন সৈন্যও থাকবে। ইযযুদ্দীনও দুতিন প্লাটুন সৈন্য নিয়ে আসছেন।
এই রাজারা রাজকীয় ধারায় একত্রিত হচ্ছে- সুলতান আইউবী মুচকি হেসে বললেন- মসুলে খৃস্টানদের মতিগতি কী?
ক্রুসেডারদেরকে কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা মনে হচ্ছে- ফাহদ উত্তর দেয়— তাদের অস্ত্র ডিপোর ধ্বংসের সংবাদ আপনি শুনেছেন। আমরা ওখানকার লোকদের অন্তর থেকে প্রথম দরবেশের প্রভাব-প্রবঞ্চনা দূর করে দিয়েছি।
আর্মেনীয় সম্রাট ও ইযযুদ্দীনের হারমে সাক্ষাৎ ঘটবে এ সংবাদ তোমরা কোথা থেকে পেয়েছো?- সুলতান আইউবী জিজ্ঞেস করেন আমি কীভাবে বিশ্বাস করবো এ তথ্য সঠিক?
রোজি খাতুনের তথ্য ভুল হতে পারে না। ফাহদ উত্তর দেয়।
আল্লাহ এ মহিয়সী নারীকে হেফাজত করুন। সুলতান আইউবী বললেন। আবেগের আতিশয্যে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।
রোজি খাতুন আপনাকে সালাম বলেছেন- ফাহ্ বললো- বলেছেন, ইযযুদ্দীনের পা যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগেই উপড়ে গেছে। ভয় তাকে পেয়ে বসেছে। একটা আঘাত হানতে পারলে তার হাঁটু ভেঙে যাবে।
মসুলে কোনো সামরিক তৎপরতা চোখে পড়ছে কি?- সুলতান আইউবী জিজ্ঞেস করেন- কোনো যুদ্ধ প্রস্তুতি?
খৃস্টান গুপ্তচর ও উপদেষ্টারা তৎপর- ফাহদ উত্তর দেয়- কোনো যুদ্ধ প্রস্তুতি চোখে পড়েনি। ইযযুদ্দীন খৃস্টানদের থেকে যে ধরনের সাহায্য প্রার্থনা করছেন, তাতে আপনি ভালোভাবেই জানেন। নগরীতে আমাদের লোকেরা পূর্ণ সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে এবং রোজি খাতুন ও তাঁর কন্যা শামসুন্নিসার প্রচেষ্টায় দুর্গ ও প্রাসাদের প্রতিটি কোণ ও প্রতিটি গোপন তথ্য আমাদের নজরে থাকছে।
শাবাশ! বন্ধু শাবাশ!- সুলতান আইউবী দাঁড়িয়ে ফায়ূদের গালে হাতের পরশ বুলিয়ে বললেন- তুমি জানো না, তুমি যে সংবাদ নিয়ে এসেছো তা কতো মূল্যবান। আমি আশাবাদী, এখন আর অতো রক্তারক্তি হবে না, যতোটুকু অবরোধ ও আক্রমণে হয়ে থাকে। সুলতান সালারদের উদ্দেশ করে বললেন- এখন আর আমরা তালখালেদ অবরোধ করবো না। ফৌজ ওদিকেই যাবে। গেরিলাদের একটি মাত্র ইউনিট আমার সঙ্গে হারাম অভিমুখে যাবে।
