এক স্থানে উটের পিঠ থেকে মালপত্র নামানো হচ্ছে। ফাহদও মালপত্র নামাচ্ছে। ফাহদ মেয়েটিকে দেখে ফেলে। কাছ ঘেঁষে অতিক্রম করতে করতে মেয়েটি ফাঁদের চোখে চোখ রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ফাহদ তাড়াতাড়ি উটের পিঠ থেকে মালামাল খালাস করে মেয়েটির পেছনে চলে যায়। এক উটের লাগাম হাতে ধরা। অপরটির লাগাম এটির পেছনে বাঁধা। মানুষ আসছে, যাচ্ছে। ফাহদ মেয়েটির কাছে চলে যায়। মেয়েটি দাঁড়াচ্ছে না। মনে হচ্ছে, আনমনে হাঁটছে। আশপাশের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ফাঁদেরও বাহ্যত সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। মেয়েটি ফাহদকে তথ্য দিচ্ছে।
মেয়েটির ফাহদকে যা বলবার বলা হয়ে গেছে। শেষে বললো, কাজ শেষ করে জায়গামতো আসো- গল্প করবো। তবে কর্তব্য সকলের আগে। আচ্ছা, সুলতান আইউবীর ফৌজ এখন কোথায় জানো তো, না?
জানি- ফাহদ উত্তর দেয়- আমি এখনই রওনা হয়ে যাচ্ছি।
আল্লাহ হাফেজ।
ফী আমানিল্লাহ।
মেয়েটি একদিকে মোড় নেয়। সেদিকে একটি গলিপথ। দেখে, এক ব্যক্তি তার পেছনে পেছনে আসছে। তার মনে পড়ে যায়, ফাঁদের সন্ধানে আসবার সময় লোকটাকে তিন-চারবার দেখেছিলো। এই লোকটাকে সে মহলেও দেখেছে। লোকটা কে হতে পারে, খানিক চিন্তা করার পর স্মরণ আসে, লোকটা মহলের কর্মচারি। মেয়েটির মনে সন্দেহ জাগে। লোকটার মতিগতি বুঝবার জন্য মেয়েটি কয়েকবার তার প্রতি তাকায়। লোকটা তার পিছু ছাড়ছে না। মেয়েটি লোকালয় থেকে বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে যায় তাকে অনুসরণকারী লোকটিও। খানিক দূরে এক স্থানে ঝোঁপ-জঙ্গল দেখা যাচ্ছে। মেয়েটি সেখানে গিয়ে বসে পড়ে। লোকটি তাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। তাতে বোধ হয় তার সন্দেহ জাগে, মেয়েটা কারো অপেক্ষায় বসে পড়েছে। লোকটি বেশ সম্মুখে চলে যায়।
মেয়েটি অত্যন্ত চতুর ও সতর্ক। সে দ্রুত ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে যায়। সেখান থেকে বসে বসে ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে একটি গলিপথে অদৃশ্য হয়ে যায়। লোকটি বেশ দূরে চলে গিয়ে আবার ফিরে আসে। অন্য এক পথে মেয়েটি যে ঝোঁপের আড়ালে বসে পড়েছিলো, সেখানে চলে আসে। তার ধারণা, ওখানে অন্য কেউও আছে। কিন্তু কাছে এসে দেখে, কেউ নেই। মেয়েটিও নেই। সে এদিক-ওদিক তাকায়। মেয়েটির নাম-চিহ্নও নেই।
লোকটাকে ফাঁকি দিয়ে বুদ্ধিমতী মেয়ে নিজ গৃহে চলে যায়।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আর্মেনিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। জীবনের সবচে বড় ঝুঁকিটা মাথায় তুলে নিয়েছেন তিনি। খৃস্টান বাহিনী যে কোন সময় ঐক্যবদ্ধভাবে তাঁর উপর আক্রমণ করে বসতে পারে। অথচ তিনি একা। মুসলমান আমীরগণ তাঁর প্রতিপক্ষ। নিজ নিজ রাজ্য ও শাসন ক্ষমতা আলাদা আলাদাভাবে মুঠোয় রাখার জন্য তারা নিজেদের ঈমান খৃস্টানদের হাতে বিক্রি করে ফেলেছেন। গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, যা ছিলো মূলত খৃষ্টানদেরই ষড়যন্ত্রের ফল। এখন সুলতান আইউবী সে সকল মুসলিম শাসককে তরবারীর জোরে নিজের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তিনি ঘোষণা করে দিয়েছেন, যে শাসক আমার দলে ফিরে আসবে না, সে স্বাধীনও থাকতে পারবে না। ইতিমধ্যে কয়েকটি দুর্গ তিনি দখল করে নিয়েছেন এবং সেগুলোর অধিপতিরা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছেন। এবার তিনি সেই শাসকদের প্রতি অগ্রসর হচ্ছেন, যারা অপেক্ষাকৃত বেশি শক্তিশালী। তিনি অত্যন্ত বীরত্ব ও দক্ষতার সঙ্গে তাদের মাঝে বাহিনী নিয়ে ঘুরে ফিরছেন, যা মূলত বিরাট এক ঝুঁকি।
তোমাদের লক্ষ্য যদি মহৎ হয়ে থাকে, তাহলে তোমাদেরকে ভয় করা চলবে না- সুলতান আইউবী তালখালেদের পথে এক ছাউনিতে বসে নিজ সালারদের বলছেন- আমি জানি, তোমরা কী ভাবছো। আমি খৃস্টানদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-খবর অবস্থায় ভুল পথে বাড়িয়েছি, আমার এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যদি তোমাদের কেউ একমত না হয়ে থাকো, তাহলে আমি তাকে সঙ্গতই মনে করবো। আমি তাকে বলবো না, আমার সিদ্ধান্ত মান্য করে তুমি আমার ভুল সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করো। আমি বরং তাকে বলবো, তুমি আমার লক্ষ্য হৃদয়ঙ্গম করো, অন্তর থেকে সমস্ত ভীতি ও কুমন্ত্রণা ঝেড়ে ফেলে দাও। আমাদের গন্তব্য বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমানের প্রথম কেবলা। আল্লাহ আমাদেরকে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছেন যে, আমাদেরই কতিপয় ভাই ঈমান বিক্রি করে ফেলেছেন। প্রথম কেবলা নয়- তাদের ক্ষমতার প্রয়োজন। স্মরণ রেখো আমার বন্ধুরা! যখন ইতিহাস লিপিবদ্ধ হবে, তখন লেখা হবে, আমাদের কালের সৈন্যরা কাপুরুষ ও অযোগ্য ছিলো। পরাজয়ের অভিশাপ সর্বদা সৈন্যদের ভাগেই ফেলা হয়। শাসক গোষ্ঠী যদিও তলে তলে কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতে, তবু অনাগত বংশধর সৈন্যদেরই উপর অভিশাপ বর্ষণ করবে।
আমাদের একদিন আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে। তিনি আমাদের উপর যে কর্তব্য আরোপ করেছেন, তা পালন করতে হবে। সেই কর্তব্য পালনে প্রয়োজনে আমাদেরকে জীবন বিলিয়ে দিতে হবে। ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে যারা কেন্দ্র থেকে আলাদা হয়ে গেছে, আমার হৃদয়ে তাদের প্রতি কোনো মমতা নেই। আজ যদি আমরা এই বিভক্তির ধারা রুখে না দেই, তাহলে একদিন এই প্রবণতা ইসলামের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। রাজ্যগুলো নামে ইসলামী হবে; কিন্তু তার শাসকরা নিজেদের রাজত্ব ও ভোগ-বিলাসিতা অটুট রাখার জন্য আপন শত্রুর সঙ্গে সমঝোতা করবে এবং ঈমান নিলাম করে বেড়াবে। আপন শত্রুকে তুষ্ট করার জন্য তারা তলে তলে একে অপরের শিকড় কাটতে থাকবে। দুর্বল শত্রুটাও তাদের কাছে শক্তিশালী মনে হবে। একজন শাসক তার সকল প্রজাকে লাঞ্ছনার মুখে ঠেলে দেবে। কাজেই জাতির এই বিক্ষিপ্ত শক্তিটাকে এখনই নিয়ন্ত্রিত করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে।
