ইযযুদ্দীনের ভীতি আরো বেড়ে যায়। বললেন- আমি এমন এক অবস্থানে এসে পৌঁছেছি, যেখান থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে পারবো না। দুদিন পর আমি বাইরে এক জায়গায় যাবো। ভাগ্য প্রসন্ন হলে সফল হবো। তিনি নিশ্চুপ হয়ে গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান। খানিক পর বললেন- রোজি! আমি তোমার সঙ্গে আমার একটা বাসনা সম্পৃক্ত করে রেখেছি।
আমি আপনার প্রতিটি আশা-আকাঙ্খা পূর্ণ করবো- রোজি খাতুন বললেন- আপনি যদি আমাকে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে কোন অভিযান পরিচালনা করতে বলেন, তা-ও করবো। আমি আপনার এক সন্তানের মা হয়েছি। আপনার বাসনা আমি পূরণ না করলে কে করবে বলুন। বলুন, আমি আপনার জন্য কী করতে পারি। আপনি আমাকে কঠিন পরীক্ষায় নিক্ষেপ করুন।
আমি বাইরে যাচ্ছি- ইযযুদ্দীন বললেন- এখনই জিজ্ঞেস করো না কোথায় যাচ্ছি। বিষয়টা এখনো গোপন রাখতে হবে। ফিরে এসেই আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবো। তবে পরিস্থিতি যদি আমার বিপক্ষে চলে যায়, তাহলে আমি তোমার কাছে আশা রাখবো, তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট গিয়ে তাঁর সঙ্গে আমাকে সমঝোতা করিয়ে দেবে। হতে পারে তখন আমি গেলে তিনি আমাকে গ্রাহ্য করবেন না।
রোজি খাতুন ইযযুদ্দীনকে এই পরামর্শ দিলেন না যে, তার চেয়ে বরং পরাজিত হওয়ার আগেই আপনি আইউবীর সঙ্গে আপস করে নিন। ইযুদ্দীন কোথায় যাচ্ছেন, তাও তিনি জিজ্ঞেস করলেন না। সব তো তার জানাই আছে। তাছাড়া ইযযুদ্দীন যখন বিষয়টা এখনো গোপনই রাখতে চাচ্ছেন, তাহলে অযথা ঘাটানোর প্রয়োজন কী। তিনি জানেন না, তিনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একজন বিজ্ঞ গোয়েন্দা নারীর সঙ্গে কথা বলছেন। যা হোক, রোজি খাতুন ইযযুদ্দীনকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন, যখনই প্রয়োজন হবে আমি সুলতান আইউবীর সঙ্গে আপনাকে সমঝোতা করিয়ে দেবো। ইযযুদ্দীনের ভীতিকর অবস্থা দেখে রোজি খাতুনের হৃদয় সাগরে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়।
ইযযুদ্দীন অবনত মস্তকে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। রোজি খাতুনের ব্যক্তিগত সেবিকা কক্ষে প্রবেশ করে। মহিলা রোজি খাতুনেরই সমান বয়সী। প্রবেশ করেই রোজি খাতুনকে জিজ্ঞেস করে, সম্রাটকে অনেক পেরশান দেখা গেলো। এই সেবিকাও রোজি খাতুনের গোপন মিশনের সহকর্মী।
ঈমান আর চরিত্র ত্যাগ করলে মানুষের এই দশাই ঘটে- রোজি খাতুন বললেন- এই যে শাসকরা জাতি ও ধর্ম থেকে আলাদা হয়ে আপন সাম্রাজ্যের রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, এরা বৃক্ষ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া ডালের মতো। ডালের পাতাগুলো ঝরে যাবে। তারপর বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। শেষে ডালগুলো শুকিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। যে বস্তুটা আমার স্বামীকে মদ-নারীর আসক্তে পরিণত করেছে, সে হলো ক্ষমতার লোভ। লোকটি ক্রুসেডারদের মধুর বিষ শিরায় ঢুকিয়ে নিয়েছে। আমার স্বামী ইযযুদ্দীন রণাঙ্গনের রাজা ছিলেন। তার তরবারী ক্রুশের হৃদপিণ্ড কর্তন করতো। কিন্তু আজ তিনি নিজ ঘরে ভয়ে কাঁপছেন। তার বীরত্ব হারিয়ে গেছে। আমার কাছে একজন নারীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছেন। রাজত্বের নেশা আর মদ-নারী মানুষের এ দশাই ঘটায়। তার ভাগ্যে পরাজয় লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে। একজন সেনাপতি যখন সিংহাসনের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার গোটা বাহিনী দীন ও ঈমান থেকে হাত গুটিয়ে নেয়। তারপর দেশ ও জাতির মর্যাদা মাটিতে মিশে যায়। দুশমন মাথার উপর চড়ে বসে।
***
ফাহ্দকে তথ্য সরবরাহ করতে রওনা হয়ে গেছে ইযযুদ্দীনের সেবিকা। ফাহদ যেখানে থাকার কথা, সে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে সে। কিন্তু ফাঁদের ঘরে তালা। সাধারণত উষ্ট্ৰচালকের বেশে থাকে ফাহদ। দুটি উট সঙ্গে রাখে আর ব্যবসায়ীদের মালপত্র ভাড়া টানে। ভাড়ার অপেক্ষায় যেখানে উট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মেয়েটি সেখানে যায়। ফাহদ সেখানেও নেই। উষ্ট্ৰচালক হিসেবে ফাহদের নাম অন্য। সেই নাম নিয়ে এক উষ্ট্ৰচালককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে ফাহদ ভাড়া নিয়ে এক জায়গায় গেছে। সেবিকা জায়গাটার নাম জেনে নিয়ে সেদিকে হাঁটা দেয়। কিন্তু মেয়েটি জানে না এক ব্যক্তি তাকে অনুরণ করছে।
লোকটা মসুলের মুসলমান। কিন্তু খৃস্টানদের চর। ইযযুদ্দীনের মহলের কর্মচারি। সেবিকাকে সে ডাক্তারের নিকট দেখেছিলো। মেয়েটিকে চিনতো সে। ডাক্তারের ব্যবস্থা নিয়ে যখন সে মহল থেকে বের হচ্ছিলো, তখনো তাকে সে দেখেছিলো। তবে জানতো না, মেয়েটা রোজি খাতুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেছে। সে দেখলো, মেয়েটি এতো দ্রুত হাঁটছে, যেনো তার কোনো অসুখ নেই। লোকটা খৃস্টানদের তৈরিকরা গুপ্তচর। মেয়েটিকে তার সন্দেহ হয়। ইযুদ্দীনের গোয়েন্দা ব্যবস্থা অতোটা উন্নত নয়। খৃস্টানরা তার মহলে চর ঢুকিয়ে রেখেছে তা তিনি জানেন না। তাদের কাজ দুটো এক, ইযযুদ্দীনের প্রতি চোখ রাখা, পাছে তলে তলে তিনি সুলতান আইউবীর বন্ধু হয়ে যান কিন। দুই. ইযযুদ্দীনের মহলে এবং মসুলে আইউবীর যেসব লোক গোয়েন্দাগিরি করছে, তাদের চিহ্নিত করা।
খৃস্টানদের এই চরটা মেয়েটার অনুসরণ শুরু করে। যখন দেখলো, মেয়েটা আরো দ্রুত হাঁটছে এবং কাউকে খুঁজে ফিরছে, তখন তার সন্দেহ আরো পোক্ত হয়ে গেলো। এবার দেখতে হবে, মেয়েটা কাকে তালাশ করছে। মেয়েটা সত্যিই যদি গোয়েন্দা হয়ে থাকে, তাহলে তার মাধ্যমে অন্য গোয়েন্দাদেরও ধরা যাবে। ফাহদ ভাড়া নিয়ে যেখানে গেছে, মেয়েটি সেদিকে হাঁটা দেয়। খৃস্টানদের চরটাও তার পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করে।
