এই পত্র তারই- সেবিকা বললো- আমি তার হাতের লেখা চিনি।
রোজি খাতুন হেসে বললেন- আমি জানি। তুমি তার হাতের লেখা-ই নয়- হৃদয়টাও চেনো। তবে খেয়াল রাখবে, হৃদয়ের জালেই আটকে থেকো না। কর্তব্য সকলের আগে।
সেবিকা লজ্জা পেয়ে যায়। লাজুক কণ্ঠে বললো- এ পর্যন্ত নিজের আবেগ-উচ্ছ্বাসকে কর্তব্যের পথে আসতে দেইনি। ফাহদকেও এ কথাই বলি, আমি তোমাকে ভালোবাসি ঠিক; কিন্তু কর্তব্য যেনো সবার উপরে থাকে।
ফাহদ সেই যুবক, যে দরবেশের রূপ ধারণ করেছিলো। বাড়ি বাগদাদ। গোয়েন্দা হওয়ার জন্য যতোগুলো গুণের প্রয়োজন, সবই তার মধ্যে বিদ্যমান। রূপবান যুবক। দুবছর যাবত মসুলে অবস্থান করছে এবং সফলতার সাথে গুপ্তচরবৃত্তি করছে। এই সূত্রেই ইযযুদ্দীনের এই সেবিকার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ। দুজন দুজনের হৃদয়ে ঢুকে গেছে।
সেবিকা শহরে থাকে। তবে তার বেশিরভাগ সময় কাটে রাজপ্রাসাদে ডিউটিতে। গুপ্তচরবৃত্তির গোপন তৎপরতা ছাড়াও অন্য প্রয়োজনে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ চলতে থাকে।
আমি যে সংবাদ নিয়ে এসেছি, এখনো তা বলা হয়নি- সেবিকা রোজি খাতুনকে বললো- ইযযুদ্দীন দুদিন পর আর্মেনিয়ার সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হারোম যাচ্ছেন। মদ পরিবেশনের সময় আমি তাকে একথা বলতে শুনেছি। তিনি আহমদ ইবনে আমরকে বলছিলেন, আর্মেনিয়ার সম্রাট বার্তা পঠিয়েছেন, তিনি তালখালেদ থেকে হারাম অভিমুখে রওনা করেছেন এবং আমার সঙ্গে ওখানে সাক্ষাৎ করবেন। আমি বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। তাই পেট ব্যথার অজুহাত তৈরি করে আপনার কাছে এসেছি।
রোজি খাতুন নিজ উরুতে চাপড় মেরে বললেন- সালাহুদ্দীন আইউবী তালখালেদ অভিমুখে এগিয়ে আসছেন। আমার জানা নেই, তালখালেদে আমাদের গুপ্তচর আছে কিনা। সংবাদটা আইউবীকে জানানো আবশ্যক। হতে পারে তিনি দুজনকে হারমেই পাকড়াও করে ফেলবেন। কাজটা তুমিও করতে পারো। ফাহ্দ কিংবা তার কোনো একজন সঙ্গীর নিকট যাও। সংবাদটা অবহিত করে আমার পক্ষ থেকে বলবে, সালাহুদ্দীন আইউবী এই মুহূর্তে তালখালেদের পথে থাকবেন। সংবাদটা যেনো তাঁকে পৌঁছিয়ে দেয়। তুমি এক্ষুনি যাও।
সেবিকা চলে যায়
পরক্ষণেই ইযযুদ্দীন রোজি খাতুনের কক্ষে প্রবেশ করেন। চেহারায় প্রচণ্ড ভীতির ছাপ। রোজি খাতুন তার এই পেরেশানীর কারণ জানেন। তথাপি জিজ্ঞেস করেন- আপনাকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে। কারণ কী?
আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর শত্রুতা আর ক্রুসেডারদের বন্ধুত্বের শিল পাটায় পিষে যাচ্ছি। ইযযুদ্দীন পরাজিত কণ্ঠে বললেন।
আমার পূর্ণ আন্তরিকতা, হৃদ্যতা আপনার সঙ্গে- রোজি খাতুন বললেন- কিন্তু যখন আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর পক্ষে কথা বলি, তখন আপনার সন্দেহ জাগে, আমি তার সমর্থক এবং আপনার বিরোধী। আপনার প্রকৃত সমস্যা এই নয় যে, আপনার ও সালাহুদ্দীন আইউবীর মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি হয়ে গেছে। প্রকৃত কারণ হচ্ছে, আপনি সেই জাতিকে বন্ধু ভেবে বসেছেন, যারা আপনার বন্ধু হতে পারে; কিন্তু আপনার ধর্মের আপন হতে পারে না। ক্রুসেডাররা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আপনাকে ধোকা দেবে এবং অবশ্যই দেবে।
তবে কি আমি আইউবীর নিকট গিয়ে আত্মসমর্পণ করবো?- ইযযুদ্দীন তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন- তা-ই যদি করি, তাহলে নিজ বাহিনীকে কীভাবে মুখ দেখাবো!
সালাহুদ্দীন আইউবী আপনাকে প্রজা নয়- মিত্র বানাতে চান। রোজি খাতুন বললেন।
তুমি লোকটার মতলব বুঝতে পারোনি- ইযযুদ্দীন বললেন- তিনি ইসলামী সাম্রাজ্যের কথা বলেন। আসলে তিনি ক্ষমতালোভী।
তার অর্থ হচ্ছে, আপনি তার সঙ্গে লড়াই করবেন- রোজি খাতুন বললেন- এ-ই যদি আপনার সংকল্প হয়ে থাকে, তাহলে অস্থির না হয়ে আপনি যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করুন।
আমার পেরেশানীর কারণ হচ্ছে, সালাহুদ্দীন গোয়েন্দা এবং নাশকতাকারীদের জাল বিছিয়ে রেখেছেন- ইযুদ্দীন বললেন- তুমি বোধ হয় জানেনা, আমার এমন যোগ সামরিক উপদেষ্টা এহতেশামুদ্দীন বৈরুতে বল্ডউইনের সঙ্গে চুক্তি করতে গিয়ে সেখান থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছে। আমি সংবাদ পেয়েছি, সে সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট আছে। আমার সকল গোপন তথ্য তার কাছে। আমি খৃস্টানদের দ্বারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, তরল দাহ্য পদার্থ ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহ করিয়েছিলাম। কিন্তু সব ধ্বংস হয়ে গেছে। আজ আমার এক নিরাপত্তা কর্মীর লাশ আমার নিকট এসেছে!
তাই নাকি? কেউ তাকে খুন করেছে নাকি? রোজি খাতুন কিছুই জানেন না ভান ধরে জিজ্ঞেস করেন।
হ্যাঁ- ইযযুদ্দীন আসল কথা গোপন রেখে বললেন- তাকে কেউ হত্যা করেছে। তাকে বিশেষ এক কাজে পাঠানো হয়েছিলো। ঘাতক সালাহুদ্দীন আইউবীরই লোক মনে হচ্ছে।
লাশের সঙ্গে থাকা ফাহৃদের পত্রখানা রোজি খাতুনের কাছে। কিন্তু তিনি ভান ধরেছেন, কিছুই জানেন না। ভাবেন, ইযযুদ্দীন এমনিতেই ভীত। আরো ভয় ধরিয়ে দেয়া প্রয়োজন।
আপনার ভালোভাবে জানা আছে, সালাহুদ্দীন শুধু রণাঙ্গনেই লড়েন না- রোজি খাতুন বললেন- তিনি যখন নিজ গৃহে ঘুমিয়ে থাকেন, তখনো তার শত্রুরা মনে করে, তিনি তাদের মাথার উপর বসে আছেন। এই মুহূর্তে তিনি তালখালেদ অভিমুখে অগ্রযাত্রা করছেন। কিন্তু মনে হচ্ছে, যেনো তিনি মসুলে বসে বসে নিজ তত্ত্বাবধানে ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করছেন। ক্রুসেডারদের বাহিনীর অবস্থাটা দেখুন। আইউবীর বাহিনীর তুলনায় তারা দশ গুণ। তবু তারা মুখোমুখি এসে যুদ্ধ করার সাহস পাচ্ছে না। খৃস্টানদের তুলনায় আপনার যে সৈন্য আছে, তাতে আপনি জানেন। তাছাড়া আপনার বাহিনীতে এমন সব কমান্ডারও আছে, যারা আপনার অনুগত নয়। তারা আপনাকে ধোঁকা দিতে পারে।
