আহমদ ইবনে আমর লাশটা নিজ গৃহের সম্মুখ থেকে তুলে ইযযুদ্দীনের সামনে নিয়ে রাখেন। ইয়ুযুদ্দীন পত্রখানা পাঠ করে আহমদ ইবনে আমরের হাতে ফেরত দিয়ে গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান। ইবনে আমর ক্ষোভ প্রকাশ করলেও ইষযুদীন ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে চেষ্টা করছেন।
আমি সংবাদ পেয়েছি, মসজিদে মসজিদেও নাকি এই নতুন দরবেশের আলোচনা চলছে- ইবুদ্দীন বললেন- এখন এই পত্র দ্বারা প্রমাণ হয়ে গেলো দরবেশ আসলে দূরবেশ নয়- সালাহুদ্দীন আইউবীর লোক।
ইহূদীন ইবনে আমরের হাত থেকে পত্ৰখানা নিয়ে পেঁচিয়ে লাশটার উপর জুড়ে মারেন।
আমি তাকে খুঁজে বের করবো- ইবনে আমর ক্ষোভের সাথে বললো ধরে এনে জনসম্মুখে তার মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবো।
আমাদের ঠান্ডা মাথায় সবড়ে হবে- ইবুদীন বললেন- এই একটা লোককে হত্যা করে তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আমাদেরকে অনাকিছু করতে হবে। অন্যকিছু ভাবতে হবে। আমি চালিম, ক্রুসেডাররা আইউবীর উপর আক্রমণ করুক। কিন্তু জানি না তারা কোনো সামনে আসছে না। তারা চাচ্ছে প্রকাশে আমি আইউবীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়। পরে তারা আমাকে এভাবে সাহায্য করবে যে, তাদের গেরিলা বাহিনী আইউবীর পার্শ্ব, পেছন এবং রসদের উপর কমান্ডো আক্রমণ চালাতে থাকবে। এ প্রক্রিয়ায়ও আমি যুদ্ধের ময়দানে সাফল্য অর্জন করতে পারি।
আর হবেও নিশ্চয়ই। ইবনে আমর মেঝেতে শ্ম দ্বারা আঘাত হেনে বললো।
এই পত্রে সঠিক লেখা হয়েছে যে, তোমরা চাটুকার- ইযুদ্দীন বললেন- আমি এক মহাসংকটে নিপতিত আর তোমরা আমাকে খুশি করার জন্য শিশুর ন্যায় কথা বলছে। তোমরা কি আমাকে ভালো কোন পরামর্শ দিতে পারো না?
ইযুবুদ্দীন হাত তালি দেন। এক যুবতী সেবিকা ছুটে এসে অবনত মস্তকে সালাম করে দাঁড়িয়ে যায়। ইযযুদ্দীন বললেন- দারোয়ানকে বলো, লাশটা তুলে নিয়ে কোথাও দাফন করে রাখুক। বলেই তিনি নিজের খাস কাকে চলে যান। আহমদ ইবনে আমরও সঙ্গে আছেন। ইযযুদ্দীন পুনরায় বেরিয়ে এসে সেবিকাকে বললেন- সোরাহি-পেয়ালা নিয়ে আসো। দারোয়ানকে বলেদাও, এদিকে যেনো কাউকে আসতে না দেয়।
সেবিকা লাশটা দেখে ভয় পেয়ে যায়। মোচড়ানো কাগজটার উপর তার চোখ পড়ে। মেয়েটা আরবী জানে। খুলে লেখাগুলো পড়েই কাগজটা কাপড়ের ভেতরে লুকিয়ে ফেলে। তারপর এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দারোয়ানকে বললো, লাটা তুলে দাফন করিয়ে ফেলে। বলেই একটা সোনার থালায় করে একটা সোরাহি আর দুটো পেয়ালা নিয়ে ইমৃত্যুণীদের কক্ষে ফিরে যায়।
আর্মেনীয় সম্রাট আমার বার্তার উত্তর দিয়েছেন- ইবুদ্দীন ইবনে আমাকে বলছেন- তিনি আমাকে তার রাজধানী তালখালেদের পরিবর্তে হারোম যেতে বলেছেন। নিজে তালখালেদ থেকে রওনা হয়ে গেছেন। আমি দুদিন পর যাচ্ছি।
সেবিকা পেয়ায় দ্রুত মদ ঢালার পরিবর্তে ধীরে ধীরে কাপড় দ্বারা পেয়ালাগুলো মুছতে থাকে। মেয়েটা ইন্দীনের বক্তব্য মনোখোশ সহকারে শুনছে।
আমার মনে হচ্ছে আর্মেনীয় সম্রাটের ডালখালেদ ছেড়ে যাওয়ার সিন্ধান্ত ভুল। ইবনে আমর বললো।
কারণ সালাহুদ্দীন আইউবী ভালখালেদ অভিমুখে অগ্রযাত্রা করছে, তাই না- ইহুদ্দীন বললেন- তুমি ভয় করছে, আর্মেনীয় ম্রাটের অবর্তমানে সালাহুদ্দীন আইউবী তালখালেদ অবয়োধ করে ফেলবেন। না, এমনটা হবে না। হয়ও যদি আমরা আইউবীর উপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ চালাবো। এই যুদ্ধকে আমরা দীর্ঘ করে তুলবো এবং ক্রুসেডারদের অবহিত করবো। তারাও আইউবীর উপর আক্রমণ চালাবে। আমি নিশ্চিত, এমনটা হলে সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনী পিষে যাবে।
আপনি কবে যাচ্ছেন ইবনে আমর জিজ্ঞেস করে।
দুদিন পর। ইষুদ্দীন উত্তর দেন।
মদ পরিবেশনে আর বিলম্ব করা যাচ্ছে না। সেবিকা পেয়ালা দুটোয় মদ ঢেলে দুজনের সামনে পেশ করে। ইফষুদ্দীন বললেন, এবার তুমি চলে যাও। সেবিকা দেউড়িতে গিয়ে দেখে লাশটা তুলে নেয়া হয়েছে। মেয়েটি এখনই বাইরে বেরুতে পারছে না। ডিউটি আছে। সে বসে বসে ভাবতে শুরু করে। হঠাৎ তার মুখ থেকে সশব্দে আহ! বেরিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে দুহাতে পেটটা চেপে ধরে। মাথাটা নত করে ফেলে। পরোয়ান ও অন্যান্য চাকররা ছুটে আসে। সেবিকা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো- হঠাৎ পেট ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। তৎক্ষণাৎ অন্য এক সেবিকাকে ডেকে তার জায়গায় বসিয়ে দেয়া হলো এবং তাকে ডাক্তারের নিকট নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তারকে বলা হলো, পেটে হঠাৎ ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে প্রচণ্ড ব্যথা। ডাক্তার ওষুধ দিয়ে বললেন, তোমাকে দুদিন বিশ্রামে থাকতে হবে।
অল্প পরই সেবিকার সব ঠিক হয়ে যায়। ডাক্তার তাকে দুদিনের ছুটি দিয়ে বললেন, নিজের কক্ষে গিয়ে আরাম করো। সেবিকা নিজ কক্ষে না গিয়ে অলি-গলি ঘুরে ইযযুদ্দীনের স্ত্রী রোজি খাতুনের কক্ষে চলে যায়।
রোজি খাতুন কক্ষে উপবিষ্ট। ইযযুদ্দীনের সেবিকা কক্ষে প্রবেশ করে।
পেট ব্যথার বাহানা করে এসেছি– সেবিকা বললো- ডাক্তার আজ এবং কালকের ছুটি দিয়েছেন।
মেয়েটি লাশের উপর থেকে যে কাগজখানা কুড়িয়ে নিয়েছিলো, সেটি কামিজের ভেতর থেকে বের করে রোজি খাতুনের হাতে দিয়ে বললো এই কাগজটা এক সৈনিকের লাশের সঙ্গে ছিলো।
রোজি খাতুন কাগজটা খুলে পাঠ করে বললেন- শাশ। আমাদের মুজাহিদরা কাজ করছে। তো এর অর্থ হচ্ছে, হতভাগ্যরা আমাদের এই লোকটাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলো। আমি সংবাদ পেয়েছি, আমাদের এই দরবেশ মানুষের অন্তর থেকে ক্রুসেডারদের দরবেশের ভীতি ও প্রভাব বের করে দিয়েছে।
