তুমি আসলে কে আক্রমণকারী জিজ্ঞেস করে।
যাকে তুমি হত্যা করতে এসেছে- যুবক উত্তর দেয় আমাকে খুন করতে তোমাকে কে পাঠিয়েছে লুকাবার চেষ্টা করলে তোমাকে বড় কষ্টদায়ক মৃত্যু ভোগ করতে হবে।
আমার কাছে লুকাবার মতো কিছুই নেই– লোকটি উত্তর দেয় মহলের এক কর্মকর্তা আহমদ ইবনে আমর আমাকে বললেন, শহরে এক দরবেশ ঘুরে ফিরছে। তিনি আমাকে আপনার গঠন-আকৃতি ও বক্তব্য সম্পর্কে অবহিত করে বললেন, লোকটাকে অন্ধকারে হত্যা করতে হবে। কেউ যেনো টের না পায়। কাজটা করে গেলে আমাকে দুশ দিনার পুরস্কার দেবেন বলে ওয়াদা দিয়েছেন।
আহমদ ইবনে আমর কি আমাকে বৃদ্ধ এবং দরবেশই মনে করেছিলেন?
তা বলেননি- লোকটি উত্তর দেয়- আমাকে শুধু বললেন, দরবেশটাকে খুন করতে হবে।
ছদ্মবেশী এই দরবেশ ও তার সঙ্গী দুজন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর আন্ডারগ্রাউন্ড দলের সদস্য। মসুলে কর্মরত। গত পর্বের কাহিনীর দরবেশের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া দূর করার লক্ষ্যে আইউবী পক্ষের লোকেরা এই লোকটিকে দরবেশ সাজিয়ে নগরীতে ঘুরিয়েছে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন অশিক্ষিত মানুষগুলো দরবেশদেরকে খোদার কণ্ঠ বলে বিশ্বাস করতো। প্রথম দরবেশকে ক্রুসেডাররা তাদের এক প্রতারণার সাফল্যের জন্য ব্যবহার করেছিলো। সুলতান আইউবীর লোকেরা তাদের এক যুবক সহকর্মীকে দরবেশের রূপে উপস্থাপন করে বিভ্রান্ত জনতাকে কুসংস্কার ও কল্পনাপূজা থেকে সরিয়ে কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট করার সকল প্রচেষ্টা চালিয়েছে।
আহমদ ইবনে আমর মসুলে ইবনে আমর নামে পরিচিত। মসুলের শাসনকর্তা ইযযুদ্দীনের প্রশাসনের মন্ত্রী পদমর্যাদার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি সংবাদ পান, এক দরবেশ শহরে প্রথম দরবেশের বিরুদ্ধে ঘোষণা দিয়ে ফিরছেন। তিনি বুঝে ফেললেন, এই দরবেশ সুলতান আইউবীর পক্ষের লোক তাতে সন্দেহ নেই। কাজেই তাকে খুন করা আবশ্যক। অন্যথায় মানুষের কাছে প্রথম,দরবেশের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে কী সব জ্বলছে জেনে ফেলবে।
সুলতান আইউবীর এই লোকটাকে হত্যা করার জন্য মহলের নিরাপত্তা বিভাগের এক সৈনিককে নির্বাচন করা হয়। তাকে দুশ দিনার পুরস্কারের প্রলোভন দিয়ে দরবেশকে হত্যা করার জন্য প্রেরণ করা হয়। এই ভাড়াটে খুনী যাকে বৃদ্ধ মনে করছিলো, সে এক তাগড়া যুবক বলে আত্মপ্রকাশ করলো। তার জানা ছিলো না, বৃদ্ধরূপী এই যুবক এক অভিজ্ঞ লড়াকু গোয়েন্দা ও গেরিলা সৈনিক।
ইবনে আমর প্রেরিত এই ঘাতককে তাঁবুতে দীপের আলোতে বসিয়ে বহু কিছু জিজ্ঞেস করা হলো। কিন্তু কোনো তথ্য পাওয়া গেলো না। সে ক্রুসেডারদের নিয়মতান্ত্রিক গুপ্তচর কিংবা নাশকতাকারী গ্রুপের লোক নয়। সে ভাড়ায় খুন করতে এসেছিলো। দরবেশরূপী লোকটি তার উভয় সঙ্গীর প্রতি তাকায়। তিনজন চোখে চোখে কথা বলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। একজন উঠে তাঁবু থেকে এক গজ লম্বা এক টুকরো রশি নিয়ে আসে। লোকটার পেছন থেকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ধরে রাখে। লোকটা ছটফট করতে শুরু করে। অল্পক্ষণের মধ্যেই নিথর হয়ে যায়।
পরদিন। আহমদ ইবনে আমর মসুলের শাসনকর্তা ইযযুদ্দীনের দেউড়িতে তার সম্মুখে দণ্ডায়মান। ক্ষোভে বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। ইযযুদ্দীনেরও চেহারায় অস্থিরতার ছাপ। ইবনে আমরের হাতে এক চিলতে কাগজ। সম্মুখে মেঝেতে পড়ে আছে একটি মৃতদেহ, যার গলায় রশি পেঁচানো। সেই রশির সঙ্গেই এই চিরকুটটা বাধা ছিলো।
লাশটা নিরাপত্তা বাহিনীর সেই সৈনিকের, যাকে নতুন দরবেশকে হত্যা করতে প্রেরণ করা হয়েছিলো। ইবনে আমর সারাটা রাত তার অপেক্ষায় নির্মুম অতিবাহিত করেছেন। ভোরে তার নিকট সংবাদ আসে, তার বাসভবনের সামনে একটি লাশ পড়ে আছে। তিনি দ্রুত ছুটে আসেন। ভবনের সম্মুখে মাটিতে তার সেই সৈনিকেরই লাশ পড়ে আছে। চোখ দুটো খোলা। জিহ্বাটা বেরিয়ে আছে। গলায় রশি পেঁচানো। রশির সঙ্গে এক টুকরো কাগজ বাঁধা।
কাগজে লেখা আছে–
মসুলের তথাকথিত শাসনকর্তা ইযযুদ্দীন। তোমার এক কর্মকর্তা আহমদ ইবনে আমর এই ব্যক্তিকে আমাকে হত্যা করার জন্য প্রেরণ করেছিলো। আমি তার মৃতদেহটা অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে আহমদ ইবনে আমরের আঙ্গিনায় রেখে গেলাম। হতভাগা আমাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়নি। তুমিও তেমনি এক হতভাগা যে, আজো সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এতোটুকু ক্ষতি করতে পারোনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। কাফেরদের বন্ধুত্ব থেকে তুমি লাঞ্ছনা ব্যতীত আর কিছুই অর্জন করতে পারবে না। আমরা তোমাকে স্বস্তিতে থাকতে দেবো না। একদিন তোমার লাশটাও তোমার প্রাসাদের আঙ্গিনায় পড়ে থাকবে। আহমদ ইবনে আমরের ন্যায় কর্মকর্তা-উপদেষ্টাদের থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলল। এরা চাটুকারের দল। কখনোই তোমার অনুগত নয়। এরা তোমাকে পতনের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শক্তিটা দেখো। তোমার সামরিক উপদেষ্টা এহতেশামুদ্দীন বৈরুতে ক্রুসেডারদের সঙ্গে চুক্তি করতে গিয়েছিলো। কিন্তু আমরা তাকে গুম করে ফেলেছি। এখন সে সুলতান আইউবীর কাছে অবস্থান করছে। তোমার খৃস্টান বন্ধুরা পর্বতমালা খনন করে তার অভ্যন্তরে সামরিক সরঞ্জাম মজুদ করেছিলো। আমরা সেসব ভস্ম করে তোমার সিংহাসনে কম্পন ধরিয়ে দিয়েছি। তুমি তোমার এক সৈনিককে আমাকে খুন করতে প্রেরণ করেছিলে। আমরা নৈতিকতার সঙ্গে তার লাশটা তোমাদের হাতে পৌঁছিয়ে দিয়েছি। আমরা জিন-ভূতের ন্যায় তোমাদের উপর সওয়ার হয়ে থাকবে। কিন্তু তোমরা আমাদেরকে দেখতে পাবে না। তোমার পতন শুরু হয়ে গেছে। মুক্তি যদি পেতে চাও, তো সালাহুদ্দীন আইউবীর আনুগত্যের বিকল্প নেই। যাও সুলতান আইউবীর পায়ে লুটিয়ে পড়ো এবং বাহিনীটাকে তার হাতে তুলে দাও। আমাদেরকে প্রথম কেবলা মুক্ত করতে হবে। এই জাগতিক ভোগ-বিলাস, রং-তামাশা ত্যাগ করো। রাজ-সিংহাসন কোনোদিন কারো সঙ্গে কবরে যায়নি।
