আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদেরকে বলুন- এক বৃদ্ধ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে- এসব কী ছিলো? তিনি কে ছিলেন? আপনি কে? বলুন, রাতে মাটি কেনো কেঁপে ওঠেছিলো? কালো ধোঁয়াগুলো কী ছিলো?
তিনি আত্মহারা ছিলেন- নতুন দরবেশ বললেন- পাগল ছিলেন। তিনি আল্লাহর রহস্যের জগতে হস্তক্ষেপ করেছেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ বিজয় কিংবা অন্য কোন আগাম সংবাদ দিতে পারেন না। জয় পরাজয়, আনন্দ-বেদনা সবই আল্লাহর হাতে। নিজেকে আল্লাহর দূত দাবি করে তিনি গুনাহগার হয়েছেন। তিনি তার শাস্তি পেয়ে গেছেন। তোমরা গিয়ে দেখে আসো, পাহাড় এখনো জ্বলছে। সেই মিথ্যাবাদী দরবেশকে এখনো যদি তোমরা সত্য বলে মান্য করো, তাহলে তোমরাও পুড়ে মরবে।
বলুন সঠিক কে?- জনতা জিজ্ঞেস করে- আপনি কি সত্য?
না- দরবেশ উত্তর দেন এবং কুরআনখানা উর্ধ্বে তুলে ধরে বললেন আল্লাহর এই কালাম সত্য। সেই দরবেশকে ভুলে যাও। এই কিতাবের কথা মান্য করো। আল্লাহ এর মধ্যে যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা কোনো মানুষ দিতে পারে না।
দরবেশ সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করেন।
***
দরবেশ দিনভর মসুলের অলি-গলিতে ঘুরে ঘুরে ঘোষণা দিতে থাকেন তিনি জাহান্নামে ভস্ম হয়ে গেছেন, তিনি নিজের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন।
জনতা যেখানেই তাকে ঘিরে ধরছে, দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন- কোনো মানুষ গায়েব জানে না। কুরআনে যা কিছু আছে, তা-ই খোদার ইঙ্গিত।
দরবেশ এক মসজিদে জোহর নামায আদায় করেন। আসর পড়েন অন্য মসজিদে। মাগরিব আরেক মসজিদে। মসজিদে ঢুকলেই মুসল্লীরা তাকে ঘিরে ধরছে। তিনি ওয়াজ করছেন- লোক সকল! একমাত্র কুরআনই সত্য। তোমরা কুরআনের ইঙ্গিত অনুযায়ী আমল করো।
মাগরিবের নামায আদায় করে দরবেশ এক মসজিদ থেকে বের হন। এক বিরান অঞ্চল অভিমুখে হাঁটতে শুরু করেন। জনতাও তার পেছনে পেছনে হাঁটছে। তিনি সকলকে দাঁড় করিয়ে বললেন- এখন আর তোমরা আমার পেছনে এসো না। আমি সারা রাত ঐ বিজন এলাকায় ইবাদত করবো। আমি তোমাদের পাপের ক্ষমা প্রার্থনা করবো।
নতুন দরবেশ মানুষের উপর এমন প্রভাব সৃষ্টি করে ফেলেন যে, তাদের মন থেকে প্রথম দরবেশের ভীতি দূর হয়ে গেছে। জনতাকে নিয়ে তিনি হাত তুলে দুআ করে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যান। মানুষ ওখানেই দাঁড়িয়ে কানাঘুষা শুরু করে। নিষেধ করার পর একজন মানুষও দরবেশের পেছনে যেতে সাহস করলো না।
কিন্তু এক ব্যক্তি দরবেশের পিছু নেয়। অন্ধকারে কেউ তাকে দেখেনি। দরবেশ জনতার চোখের আড়ালে গিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করেন। তাকে অনুসরণকারী লোকটিও হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। হঠাৎ দরবেশ কার যেনো পায়ের শব্দ শুনতে পান। দাঁড়িয়ে পেছন পানে তাকান। অন্ধকারে ছায়ার মতো কী যেনো দেখতে পান। তৎক্ষণাৎ ছায়াটা থেমে যায় এবং বসে পড়ে। দরবেশ ইতিউতি তাকান আর কিছু না দেখে হাঁটতে শুরু করেন। কিন্তু তার মনে সন্দেহ ঢুকে গেছে। এখন বারবার তিনি পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন।
দরবেশ আরো কিছু পথ এগিয়ে যান। এবার পেছনের লোকটা দরবেশের কাছাকাছি চলে এসেছে। দরকেশ কুরআন তিলাওয়াত করতে শুরু করেন। তিনি হাঁটার গতি মন্থর করে দেন। পেছনের লোকটা কটিবন্ধ থেকে খঞ্জর বের করে বেড়ালের ন্যায় পা টিপে টিপে দরবেশের একেবারে কাছে চলে যায়। খঞ্জরধারী হাতটা উপরে তুলে ধরে। পেচ্ছন থেকে আঘাত হেনে দরবেশকে শেষ করে ফেলা তার পরিকল্পনা। খঞ্জরটা এখনো তার উপরে ঝুলছে। এমন সময় দরবেশ বিদ্যুতের ন্যায় মোড় ঘুরে দাঁড়ান। হাতের মোটা লাঠিটা উল্পে তুলে চারদিক ঘোরান। লাঠি আক্রমণোদ্যত লোকটির খঞ্জরধারী বাহুতে গিয়ে আঘাত করে। সেই সঙ্গে লোকটার পেটে এমন এক লাথি মারেন যে, লোকটা চিৎ হয়ে পেছন দিকে পড়ে যায়। দরবেশের এক হাতে কুরআন। লড়তে হবে অপর এক হাতেই। তিনি লোকটার মাথায় লাঠি দ্বারা আঘাত হানেন। তার খঞ্জর হাত থেকে ছুটে পড়ে যায়।
দরবেশ খঞ্জরটা তুলে নেন। আক্রমণকারী লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। দরবেশ তাকে বললেন- খঞ্জর আমার হাতে। উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে।
লোকটি উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে। দরবেশ মুখে পশুর ডাকের ন্যায় শব্দ করেন। দূর এক স্থান থেকেও অনুরূপ শব্দ ভেসে আসে। দরবেশ পুনরায় শব্দ করেন। অন্ধকারে ধাবমান পায়ের শব্দ শোনা যায়। দুজন লোক দরবেশের কাছে এসে দাঁড়িয়ে যায়। দরবেশ হেসে বললেন- আমরা যে বিপদের আশঙ্কা করেছিলাম, এই হতভাগা তা-ই ঘটাতে যাচ্ছিলো। আমার তো ধারণা ছিলো, দিনেই মসুলের কোনো এক স্থান থেকে তীর এসে আমার হৃদপিণ্ডে গেঁথে যাবে। কিন্তু তারা আমাকে রাতে এর দ্বারা খুন করার চেষ্টা করেছে। এই নাও তার খঞ্জর।
দরবেশ মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা লোকটাকে লাঠি দ্বারা হাল্কা খোঁচা দিয়ে বললেন- ওই শয়তান। তুই কি মুসলমান?
হ্যাঁ হযরত!- লোকটি আদবের সঙ্গে উত্তর দেয়- আমি মুসলমান।
দরবেশ ও তার সঙ্গী দুজন খিল খিল করে হেসে ফেলেন। দরবেশ বললেন- আমাকে হযরত বলো না বন্ধু! আমি তোমার চেয়েও বেশি যুবক।
তোমার ছদ্মবেশ সার্থক হয়েছে। দরবেশের এক সঙ্গী বললো।
তিনজন আক্রমণকারী লোকটাকে সঙ্গে করে দূরে এক তাঁবুতে নিয়ে যায়। তাবুর সন্নিকটে চার-পাঁচটি উট বাঁধা আছে। আশপাশ টিলায় ঘেরা। লোকটাকে আঁবুতে বসিয়ে রাখা হলো। তাঁবুতে বাতি জ্বলছে। দরবেশকে আশি বছরের বৃদ্ধ বলে মনে হয়েছিলো। এখন কথা বলছেন ঠিক একজন নওজোয়ালের ন্যায়। দরবেশ মুখের সাদা দাড়ি এবং মাথার কৃত্রিম চুল খুলে আসল রূপে আবির্ভূত হন। ভেজা কাপড়ে মুখমণ্ডলটা ভালোভাবে চলে ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলেন। এখন তিনি বৃদ্ধ নন- পঁচিশ বছর বয়সের তাগড়া যুবক।
