হাসান আল-ইদরীস রাদীকে কাঁধে তুলে নিয়ে ছুটতে শুরু করে। নিষিদ্ধ অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসে। সামনের অঞ্চলটা তার পুরোপুরি চেনা। গুহায় লাগানো আগুনের তাপে মুখবদ্ধ তেলের মটকাগুলো এমন ভয়ানক শব্দে বিস্ফোরিত হতে শুরু করে যে, জমিন ভূমিকম্পের ন্যায় কেঁটে ওঠে। হাজার হাজার মটকা একসঙ্গে ফেটে যায়। তাতে খৃস্টানদের সংগৃহীত বিধ্বংসী সকল যুদ্ধ সরঞ্জাম ধ্বংস হয়ে যায়।
বিস্ফোরণ মসুল নগরীকে জাগিয়ে তোলে। মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। কী ঘটেছে কেউ বলতে পারছে না।
হাসান আল-ইদরীস নগরীতে ঢুকতে পারছে না। কারণ, নগরীর ফটক বন্ধ। সে মসুলের পরিবর্তে নাসীবা অভিমুখে রওনা হয়ে পড়ে।
হাসান এখন বিপদমুক্ত। রাদী তার কাঁধে। অনেক দূর যাওয়ার পর হাসান ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দাঁড়ায়। রাদীকে মাটিতে শুইয়ে দেয়। রাদী ফিসফিসিয়ে বলে- আগুন আমাকে পবিত্র করে দিয়েছে। মেয়েটা বিড় বিড় করতে শুরু করে- কাফেলা হেজাজ যাচ্ছে। ওখানে গিয়ে আমরা বিয়ে করবো।
রাদী! রাদী! হাসান আল-ইদরীস রাদীকে ডাকে।
আল্লাহ আমার পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন, না? রাদী জিজ্ঞেস করে। মেয়েটা উঠে বসে বাহু দুটো সম্মুখে এগিয়ে ধরে বললো- আমি যাচ্ছি। কাফেলা হেজাজ যাচ্ছে। আমিও যাচ্ছি।
রাদী একদিকে পড়ে যায়। হাসান আল-ইদরীস তাকে ডাকে। ধরে নাড়ায়। শেষে শিরায় হাত রাখে। রাণীর আত্মা হেজাজের কাফেলার সঙ্গে চলে গেছে।
হাসান আল-ইদরীস খঞ্জর দ্বারা কবর খনন করে। দুআড়াই ফুট গভীর আর রাদীর সমান লম্বা একটা কবর খুঁড়তে তার ভোর হয়ে যায়। রাদীকে সেই কবরে শুইয়ে রেখে উপরে মাটি চাপা দেয়।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যখন খৃস্টানদের অস্ত্র ও দাহ্য পদার্থের ডিপো ধ্বংস হওয়ার সংবাদ পান, তখন তিনি তালখালেদ অভিমুখে অগ্রযাত্রা করছিলেন। তালখালেদ বিশাল একটি সাম্রাজ্য, যার শানসকর্তা সুকমান আল-কিবতী শাহ আরমান। সে সময় তিনি মসুলের শাসনকর্তা ইযযুদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য হারযাম নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য শাহ আরমানের ইযযুদ্দীনকে সাহায্য দেয়ার কথা। সে বিষয়ে আলোচনার জন্যই তাদের এই সাক্ষাৎ। সুলতান আইউবী সময়ের আগেই এক বৈঠকের সংবাদ পেয়ে গেছেন। তিনি শাহ আরমানের রাজধানী তালখালেদ অবরোধ করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন।
[সপ্তম খণ্ড সমাপ্ত]
৮.১ দ্বিতীয় দরবেশ
দ্বিতীয় দরবেশ
ক্রুসেডাররা মসুলের সন্নিকটে পাহাড়ের অভ্যন্তরে যে বিপুল অস্ত্র ও তরল দাহ্য পদার্থ মজুদ করেছিলো, তদ্বারা সমগ্র ইসলামী সাম্রাজ্যকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা সম্ভব ছিলো। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দারা মুহূর্ত মধ্যে সব ধ্বংস করে দিলো। ক্রুসেডারদের জন্য সে ছিলো এক প্রচণ্ড আঘাত। তাদের সব আয়োজন, সব নাটক তছনছ হয়ে গেলো।
সংগ্রহটা ছিলো পাহাড়ের বিীর্ণ গুহার অভ্যন্তরে। আগুন লাগার পর বিস্ফোরণে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত মাটি কেঁপে ওঠে, যেনো ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু কেউ জানে না, ঘটনাটা কীভাবে ঘটলো।
এ ঘটনায় ক্রুসেডারদের বড় মিত্র ইযযুদ্দীনের কোমর ভেঙে গেছে। ক্রুসেডাররা নিশ্চিত, এটা দুর্ঘটনা নয়। বরং সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচরদের কাজ।
ক্রুসেডাররা মসুলের শাসনকর্তা ইষষুদ্দীনকে মিত্র বানিয়ে মসুলের পার্বত্য অঞ্চলে অস্ত্র, গোলা-বারুদ ও রসদপাতি সংগ্রহ করে সুলতান আইউবীর উপর চূড়ান্ত আঘাত হানতে চেয়েছিলো। কিন্তু রাদী নামক একটি মাত্র মেয়ে সঙ্গী হাসান আল-ইদরীসের পরিকল্পনা ও সহযোগিতায় সব ধ্বংস করে দিয়েছে।
জনগণকে এলাকা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য ক্রুসেডাররা এক দরবেশের নাটক মঞ্চস্থ করে প্রচার করেছে, এই দরবেশ উক্ত পাহাড়ে ধ্যানে বসবেন এবং খোদা তাকে মসুলের বিজয়ের ইঙ্গিত প্রদান করবেন। তারপর মসুল তথা ইযযুদ্দীনের সাম্রাজ্য দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু পরিণামে দরবেশও অস্ত্র গুদানের সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে।
একদিন কেটে গেছে। মসুলের জনগণ ভীত-সন্ত্রস্ত। রাতে যে বিস্ফোরণটা ঘটলো এবং এই যে মাঠ কেঁপে কেঁপে ওঠেছিলো, ঘটনাটা কী ঘটেছিলো তারা জানে না। বিষয়টা তাদের বলবার মতোও কেউ নেই। দাহ্য পদার্থগুলো কয়েকদিন পর্যন্ত জ্বলতে থাকে। সেই সঙ্গে সুপরিসর গুহায় যেসব রসদ রাখা হয়েছিলো, সেগুলোও পুড়ে যায়। ভয়ে কেউ ওদিকে পা বাড়াচ্ছে না। সকলের ধারণা, এটা হয় দরবেশের কেরামত, নয়তো আল্লাহর গজব। এমনি ভীতিকর এক পরিস্থিতিতে তাদের কানে একটি শব্দ ভেসে আসে। তিনি জাহান্নামে চলে গেছেন। জাহান্নামের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন।
ইনি সবুজ আবা পরিহিত আরেক দরবেশ। মাথায় লম্বা সাদা চুল। মুখে আবক্ষ-লম্বিত সাদা দাড়ি। মুখে বার্ধক্যের বলিরেখা। এক হাতে কাঁধ পর্যন্ত লম্বা একটা লাঠি, অপর হাতে পাক কুরআন। প্রথম দরবেশের ন্যায় ইনিও হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করেন এবং বাজারে ঢুকে পড়েন। উৎসুক জনতা ভক্তি গদ গদ চিত্তে তার চারপার্শ্বে এসে ভিড় জমায়। মাঝ বাজারে দাঁড়িয়ে ভাবগম্ভীর কণ্ঠে বললেন- তিনি জাহান্নামের আগুনে পুড়ে গেছেন, যিনি বলতেন খোদা তাকে ইশারা দেবেন। যদি তার পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করো, তাহলে তোমরাও সেই জাহান্নামের আগুনে ভস্ম হয়ে যাবে। খোদা রাতের বজ্রনিনাদে তোমাদেরকে ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। আকাশ ছেয়ে যাওয়া সেই কালো ধোঁয়ার কথা মনে করো। আল্লাহর রোষকে ভয় করো। আমার হাতে যে পত্রখানা দেখতে পাচ্ছো, এটি মান্য করো। এটি আল্লাহর কালাম। এটি পাক কুরআন।
