হেজাজের প্রহরী কে?- রাদী বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে- আর সে কোন্ আগুন, যে আমাকে পবিত্র করতে পারবে?
হেজাজের প্রহরী সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী- হাসান আল ইদরীস বললো- আর আগুন হচ্ছে, এই পাহাড়ী অঞ্চলে মটকা ও পাতিলে ভর্তি যে বিপুল তেল আছে, সেগুলো, যে তেলের মাধ্যমে হেজাজ পর্যন্ত পুড়িয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া সম্ভব। পাহাড়ী অঞ্চলের যে জায়গাটায় আগুন ও যুদ্ধ সরঞ্জাম আছে, তুমি আমাকে সেই পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।
রাদী কিছুই বুঝতে পারলো না। হাসান আল-ইদরীস তাকে দীর্ঘ কাহিনী শোনায়। সুলতান আইউবীর প্রত্যয়-পরিকল্পনা ও চরিত্র সম্পর্কে অবহিত করে। খৃস্টানদের পরিকল্পনার কথাও জানায় এবং এমন এমন কথা শোনায়, যার ফলে তার হৃদয়ে খৃস্টানদের প্রতি ঘৃণা জন্মে যায় এবং হক-বাতিলের দ্বন্দ্ব তার বুঝে এসে যায়।
***
পরদিন আল-ইদরীস দেখে রাদী ঘোড়ায় চড়ে তার মনিব খৃস্টান দলনেতার সঙ্গে পাহাড়ের সেই অংশটায় ঢুকে পড়েছে, যেখানে হাসান ও খৃস্টান প্রহরীদের যাওয়ার অনুমতি নেই। রাতে দলনেতা রাণীকে নিয়ে মনোরঞ্জন করে গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়ে। হাসান আল-ইদরীস তাকে কিছু পাউডার দিয়েছিলো। রাদী সেগুলো মদের সঙ্গে মিশিয়ে লোকটাকে খাইয়ে অচেতনের ন্যায় ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। গোয়েন্দারা চেতনানাশক পাউডার সঙ্গে রাখে। প্রয়োজন হলে ব্যবহার করে। রাদী ফিরে এসে নির্ধারিত স্থানে হাসান আল-ইদরীসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
ওখানে বিশাল এক গুহা- রাদী বললো- এরা খনন করে করে গুহাটাকে আরো প্রশস্ত করে নিয়েছে। এতো চওড়া ও দীর্ঘ যে, একদিক দাঁড়ালে অপরদিক দেখা যায় না। বিশাল এক গুদাম। ভেতরে দাহ্য পদার্থ ভর্তি হাজার হাজার মটকা। বর্শা, তীর-ধনুক, খাদ্যদ্রব্য, তবু ও অন্যান্য সরঞ্জামের কোন হিসেব নেই। আমি খৃস্টান লোকটাকে শিশুর ন্যায় বললাম, আমি ঐ পাহাড়ী এলাকাটায় একটু বেড়াতে যেতে চাই। তিনি বললেন, কাল দিনে নিয়ে যাবো। তুমি আমার রাণী। তবে কাউকে বলবে না ওদিকে গিয়েছিলে। তিনি আমাকে নিয়ে যান।
রাদী জানালো- গুহার সম্মুখে দুজন লোক প্রহরায় দাঁড়িয়ে থাকে। মুখটা ভোলা থাকে। শ দেড়েক গজ দূরে প্রহরীদের তাঁবু। গুহা থেকে সামান্য দূরে অপর একটি তাঁবু, যার বাইরে দুর্বল এক বৃদ্ধ বসে ঝিমুচ্ছিলো। দলনেতা তাকে পা দ্বারা খোঁচা দিয়ে জাগিয়ে বললো- ঐ দরবেশ! কোন কষ্ট হচ্ছে না তো? ভাত-পানি পাচ্ছো ঠিক মতো? বৃদ্ধ দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- জনাব! আমাকে কবে মুক্তি দেবেন? এবার আমাকে যেতে দিন। নেতা তাচ্ছিল্যের সুরে বললো- অপেক্ষা করো, অনেক পুরস্কার পাবে। এই লোকটাই বোধ হয় সেই দরবেশ, তুমি যার কথা বলেছিলে।
হ্যাঁ- হাসান আল-ইদরীস বললো- এ খৃস্টানদের সেই নাটক, যেটি মসুলের জনসাধারণ ও তাদের গবর্নর ইযযুদ্দীনকে পর্যন্ত মাতাল বানিয়ে রেখেছে। আসো রাদী। দুজনে মিলে আল্লাহর নিকট তোমার জীবনের সব পাপের ক্ষমা আদায় করে নিই।
দুজন রওনা হয়ে যায়। তবে চুপিসারে। রাতের আঁধার তাদের সহায়তা করছে। দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী সরুপথে কান খাড়া রেখে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে এগিয়ে চলে। যে স্থানটায় দুজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে, সে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। প্রহরীদের নিকট একটি প্রদীপ জ্বলছে, যার লাঠিটা মাটিতে গাড়া। হাসান আল-ইদরীস ও রাণী তাদের থেকে পনের-বিশ পা দূরে লুকিয়ে থাকে। দুজনই জীবন বাজি রাখতে এসেছে। আল্লাহ দেখছেন। হাসান আল-ইদরীস রাদীকে এক ধারে সরিয়ে দিয়ে নিজে বসে পড়ে। এক সান্ত্রী কে? হাঁক দিয়ে এদিকে এগিয়ে আসে। অন্ধকারে লোকটা কিছুই দেখলো না। হাসান আল ইদরীস পেছন থেকে তার ঘাড়টা এক বাহুতে জড়িয়ে ধরে অপর হাতে তার হৃদপিণ্ডের উপর খঞ্জর দ্বারা তিন-চারটা আঘাত হানে। সান্ত্রী লুটিয়ে পড়ে যায়।
হাসান আল-ইদরীস অপেক্ষা করতে থাকে। অপর সান্ত্রী তার সঙ্গীকে ডাক দেয়। কোন সাড়া না পেয়ে সে ধীর পায়ে এদিকে এগিয়ে আসে। মৃত সঙ্গীর লাশের নিকট এসেই অন্ধকারে মাটিতে কিছু একটা পড়ে আছে অনুভব করে। নত হয়ে দেখে। অমনি সেও হাসান আল ইদরীসের পাঞ্জায় এসে পড়ে।
রাদী অপেক্ষা না করে গুহার দিকে ছুটে যায়। মাটি থেকে প্রদীপটা তুলে হাতে নিয়ে গুহার ভেতরে ঢুকে পড়ে। হাসান আল-ইদরীস অপর সান্ত্রীকেও শেষ করে দেয়।
অন্যান্য প্রহরীরা তাঁবুতে ঘুমিয়ে আছে। হাসান আল-ইদরীস রাদীকে ডাক দেয়। কিন্তু রাণী ওখানে নেই। হাসান গুহার দিকে ছুটে যায়। সেখানেও প্রদীপ জ্বলছে না।
ইতিমধ্যে গুহায় একটা শিখা জ্বলে ওঠে। রানী দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। তার পরিধানের কাপড়ে আগুন ধরে গেছে। গুহায় ঢুকে মেয়েটা তরল দাহ্য পদার্থের একটা মটকা উপড় করে ফেলে দিয়ে প্রদীপ থেকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তার জানা ছিলো না, এই পদার্থ কিভাবে খপ করে জ্বলে ওঠে। শিখা ছড়িয়ে গিয়ে তাকেও জড়িয়ে ফেলে। হাসান আল-ইদরীস যখন তার কাছে গিয়ে পৌঁছে, ততোক্ষণে তার রূপময় মুখমণ্ডলটা ঝলছে গেছে। রেশমের ন্যায় চুলও পুড়ে গেছে রাদীর। তার কাপড়ের আগুন নেভাতে গিয়ে হাসান আল-ইদরীস নিজের হাতও পুড়ে ফেলে। রাদীর কাপড়ের আগুন নিভে গেছে ঠিক; কিন্তু তার চৈতন্য হারাবার উপক্রম হয়ে পড়েছে।
