রাদী গুন গুন করতে শুরু করে চলে কাফেলৈ হেজাজ কে।
তাঁবুর ভেতরের পরিবেশটা এখন আবেগময়। রাণীর প্রতিটি শব্দ হৃদয়ের গভীর থেকে বেরিয়ে আসছে। এই গানটায় তার ভালোবাসার স্বাক্ষর আছে। হৃদয়ের কান্না আছে। কামনার জ্বলন আছে। আছে তার সেই স্বপ্নমালার সৌন্দর্য, যা হেজাজের পথে শহীদ হয়ে গেছে।
রাদীর চোখে অশ্রু সাঁতার কাটতে শুরু করে। তার গানের লয়-তাল আরো জ্বালাময়ী হয়ে ওঠে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই গানেও খৃস্টান দলনেতার এমন ঝিমুনি আসতে শুরু করে, যা তার জীবনে কখনন আসেনি। প্রতি রাতেই মদপান করে অচেতন অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়া ছিলো তার স্বভাব।
রাদীর গানের তালে তালে গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়ে খৃস্টান দলনেতা।
পালঙ্কের সন্নিকটে তেপাইর উপর পড়ে থাকা লোকটার উপর চোখ পড়ে রাদীর। রাদী ধীরে ধীরে খঞ্জরটা খাপ থেকে বের করে। খঞ্জরের আগায় আঙ্গুল রাখে এবং অস্ত্রটা শক্ত করে ধরে ঘুমিয়ে থাকা খৃস্টানের নিকট চলে যায়। খঞ্জরের আগাটা লোকটার ধমনীর কাছে নিয়ে যায়। তারপর হৃদপিণ্ডটা কোথায় থাকতে পারে ঠিক করে হাতটা উপরে তোলে। অমনি একটা শব্দ ভেসে আসে কানে- শী। হঠাৎ চমকে ওঠে হাতটা সরিয়ে নিয়ে রাদী ওদিকে তাকায়। তাবুর পর্দা ফাঁক করে সেই সুদর্শন যুবকটা দাঁড়িয়ে, যে বলেছিলো আমি খৃস্টানদের গুপ্তচর মুসলমান হাসান আল-ইদরীস।
***
হাসান আল-ইদরীস হাতের ইশারায় রাদীকে ডাক দেয়। রাদী খঞ্জরটা খাপে ঢুকিয়ে উঠে এগিয়ে যায়। হাসান রাদীকে বাহুতে ধরে বাইরে নিয়ে যায়। বললো- আজ রাত লোকটা একা। অন্যরা অনেক দিনের জন্য চলে গেছে। এই লোকটা আমার দায়িত্ব ও নিরাপত্তায় রয়েছে। কিন্তু আমি একজন ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করবো না। আমার দায়িত্ববোধ আছে। কেউ তাকে খুন করতে এলে সে আমার হাতে মারা যাবে। তুমি তাকে বলেছিলে আমি আত্মহত্যা করবো না। কারণ, এটা কাপুরুষতা। আর আমি পালাবোও না, কারণ এটা প্রতারণা। কিন্তু তুমি একজন ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করতে চেয়েছিলে, এটা কি প্রতারণা নয়?
তুমি কি তাকে বলে দেবে, আমি তার ধমনি ও হৃদপিণ্ডের উপর খঞ্জর রেখেছিলাম- রাদী জিজ্ঞেস করে এবং দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো- যদি বলে দাও, তাহলে লোকটা আমাকে মেরে ফেলবে। তাতে আমার ভালো হবে। তোমারও উপকার হবে। তিনি তোমাকে পুরস্কার দেবেন।
এই লোকটার প্রতি আমার ততোখানি ঘৃণা, যতোখানি তোমার অন্তরে রয়েছে- হাসান আল-ইদরীস বললো- আমি তাকে কিছুই বলবো না।
বিনিময়ে আমার থেকে তার পুরস্কার দাবি করবে?- রাদী জিজ্ঞেস করে- বরং পুরস্কার হিসেবে আমাকেই চেয়ে বসবে, না।
না- হাসান আল-ইদরীস বললো- আমার কোন পুরস্কারের প্রয়োজন নেই।
হাসান মেয়েটাকে খানিক আড়ালে নিয়ে গিয়ে মমতার সুরে বললো আমি তোমার ন্যায় হেজাজেরই যাত্রী। যে রাতে আমরা তোমাকে অপহরণ করে এনেছিলাম, সে রাতে তুমি আমাদেরকে তোমার বৃত্তান্ত শুনিয়েছিলে। তুমি তোমার হৃদয়ের আবেগ এবং একটি বাসনার কথা ব্যক্ত করেছিলে। তখন থেকেই আমি ভাবছি, তোমাকে কোন্ পুণ্যের কথা বলবো, যার মাধ্যমে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে।
হাসান আল-ইদরীসের মুখের যাদু রাণীকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। হাসান বলতে থাকে আর রাণী শুনতে থাকে। সুলতান আইউবীর এই গোয়েন্দা এই রূপসী মেয়েটার হৃদয়টা জয় করে ফেলেছে। এখন আর রাণী সেখান থেকে উঠতে চাচ্ছে না। হাসান আল-ইদরীস তাকে চলে যেতে বাধ্য করে।
এভাবে তিন-চার রাত দুজনের সাক্ষাৎ ঘটে। হাসান আল-ইদরীস মেয়েটাকে তার আবেগময় বক্তব্য ও সৎ উদ্দেশ্যের যাদুতে আটকে ফেলে। রাদী তার কাছে হেজাজের কথা জিজ্ঞেস করতে থাকে আর সে অত্যন্ত আবেগময় ভঙ্গিতে তাকে হেজাজের চিত্তাকর্ষক কথা-বার্তা শোনাতে থাকে। দিনের বেলা হাসান জানার চেষ্টা করছে, যে স্থানটায় তাকে যেতে দেয়া হচ্ছে না, সেখানে কী আছে। কিন্তু সে কিছুই জানতে পারছে না।
এক রাতে হাসান মেয়েটাকে বললো- আচ্ছা, লোকগুলো ঐ পাহাড়টায় কী লুকিয়ে রেখেছে বলতে পারো? রাদী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়- যুদ্ধের সরঞ্জাম। ঐ লোকটা (দলনেতা) আমাকে বলতো, তার মধ্যে দাহ্য, প্রদার্থ এতো পরিমাণে আছে যে, মুসলমানদের সমগ্র নগরীকে পুড়িয়েও শেষ হবে না। আমি লোকটার দাসী কিংবা গনিকা ঠিক, কিন্তু সে আমার সম্মুখে দাসের ন্যায়ই আচরণ করে থাকে।
তুমি কি আনন্দিত যে, তুমি উচ্চপদস্থ একজন খৃস্টানের গনিকা আর তিনি তোমার গোলাম?
না- রাদী উত্তর দেয়- আমি দেহের কথা বলছি। আমার আত্মা কখনো আনন্দিত হবে না। যারা আমাকে হেজাজের পথ থেকে অপহরণ করে এনেছিলো, তারা বলতো, খোদা তোমার উপর অসন্তুষ্ট। এমন একটি পুণ্য করো, যার উসিলায় খোদা তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আর যে লোকটি আমাকে হেজাজ নিয়ে যাচ্ছিলো, আমি যাকে কামনা করছিলাম, সে বলতো, আমরা হজ্ব করে পবিত্র হয়ে যাবো। তারপর সেখানেই বিয়ে করবো। আমি পাপের সাগরে ডুবে যাচ্ছি। খোদা আমাকে শাস্তি দিয়ে চলেছেন।
শুধু যমযমের পানিই নয়- আগুনও তোমাকে পবিত্র করতে পারে হাসান আল-ইদরীস হেসে বললো- তুমি হেজাজ যেতে পারোনি। এখন হেজাজের প্রহরীকে সন্তুষ্ট করো, খোদা তোমার আত্মাকে গুনাহ থেকে পবিত্র করে দেবেন। তুমি মুক্তি পেয়ে যাবে।
