হাসান আল-ইদরীস দরবেশের রহস্যময় জগতে ঢুকে পড়েছে। এই পার্বত্য অঞ্চলে কর্তব্যরত খৃস্টানদের বিশ্বস্ত ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে গেছে হাসান। কিন্তু একটা সীমানার পরে আর অগ্রসর হওয়ার এখনো অনুমতি পাচ্ছে না সে। রহস্য এই সীমানারও পরে। পাহাড়গুলো বেশ উঁচু। স্থানে স্থানে উঁচু উঁচু অনেক টিলা। হাসান আল-ইদরীস দরবেশের দর্শন লাভে উদগ্রীব। কিন্তু তার দেখা মিলছে না। সন্দেহ জাগতে পারে ভয়ে কাউকে জিজ্ঞেসও করছে না। লোকটা খৃস্টানদের এতই আস্থাভাজন হয়ে গেছে যে, তারা তাকে রাদীর অপহরণে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলো।
রাদী তাঁবুতে অবস্থানকারী দুতিনজন খৃস্টানের বিনোদনের উপকরণে পরিণত হয়েছে। মেয়েটার প্রতি দলনেতার লোভ ও আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। তাই মেয়েটাকে সে যে কারো খেলনা হয়ে থাকতে দিতে চাচ্ছে না। এক রাতে দলনেতা রাদীকে জিজ্ঞেস করে- তুমি কি আমাদের সন্তুষ্টির জন্য নাচছো? আমার সঙ্গে রাত যাপন করে কি তুমি আনন্দ অনুভব করছো?
না আপনাদের সন্তুষ্ট হওয়া উচিত, না আমি আপনাদের প্রতি সন্তুষ্ট- রাদী গম্ভীর কণ্ঠে বললো- নিরুপায় হয়েই আমি আপনাদের খেলনা হয়ে আছি। মনের কথা বলতে আমি ভয় করবো না। আপনাদেরকে আমি মনে-প্রাণে ঘৃণা করি। আপনাদের আদেশ আমি অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে পালন করি।
তুমি কি জানো, এই অপমানজনক বক্তব্যের জন্য আমি তোমার মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারি- দলনেতা বললো- ইচ্ছে করলে আমি তোমার এই সুন্দর চেহারাটা শৃগাল-শকুনের সম্মুখে নিক্ষেপ করতে পারি?
যদি করেন, তাহলে এটা হবে আমার জন্য বিরাট এক পুরস্কার রাণী বললো- আমার মাথাটা দেহে থাকা আমার জন্য কঠিন এক শাস্তি। আপনার ন্যায় শেয়ালটা তো আমার আত্মাটাকে খাবলে খাবলে খাচ্ছেনই। আপনি নিজেকে যুদ্ধবাজ ও বীর মনে করে থাকেন। একটা অসহায় মেয়েকে বন্দি করে গর্ব করছেন। পৌরুষ আর তরবারীর জোরে আপনি আমাকে দাসীতে পরিণত করতে চাচ্ছেন। পারেন যদি আমার হৃদয়ের উপর এমনভাবে শাসন করেন, যেনো জিজ্ঞেস করতে না হয়, আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য আপনার আদেশ মান্য করছি কিনা। বরং আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করবো, আমার নাচ ও অস্তিত্বে আপনি আনন্দ লাভ করছেন কিনা?
আচ্ছা, আমি যদি তোমার সম্মুখে সোনার স্তূপ রেখে দেই, তাহলে কি তুমি আমাকে হৃদয় থেকে মনিব বলে মেনে নেবে?
না- রাদী উত্তর দেয়- আমার যে পুরস্কারের প্রয়োজন, তা তোমাদের কাছে নেই। যার কাছে ছিলো, সে মারা গেছে। লোকটা মানুষ ছিলো, দেহের প্রতি তার কোন আকর্ষণ ছিলো না। আর তোমরা! তোমরা শিয়াল-শকুন-নেকড়ে।
লোকটা তোমাকে ভালোবাসা দিয়েছিলো- দলনেতা বললো আমি যদি তোমাকে সেই ভালোবাসা দেই, তাহলে?
আমি নই। আমার আত্মা ভালোবাসার পিয়াসী। রাদী উত্তর দেয়। দলনেতা মদের পেয়ালাটা হাতে নিয়ে মুখের সঙ্গে লাগাতে উদ্যত হয়। রাদী খপ করে পেয়ালাটা ধরে ফেলে তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দূরে ফেলে দিয়ে বললো-কথা বলতে যখন বাধ্য করেছে, শুনে নাও। মদপান করবে তত তোমার বিবেক ও চেতনার উপর পর্দা পড়ে যাবে। তুমি জিজ্ঞেস করেছো, তুমি যদি আমাকে সেই ভালোবাসা প্রদান করো, তাহলে আমি বরণ করবো কিনা? আগে আমাকে ভালোবাসা দেখাও। যদি পারো, তাহলে যদি তুমি আমাকে উত্তপ্ত মরুভূমিতেও নিয়ে যাও, আমি খুশিমনে তোমার সঙ্গে যাবো এবং জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাবো।
দলনেতা মেয়েটির প্রতি তাকায়। লোকটা মেয়েটির সর্বাঙ্গ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকে। দেখে আসছে তো কয়েকদিন ধরেই। মেয়েটার বিক্ষিপ্ত রেশম কোমল চুলের পরশও উপভোগ করেছিলো। উন্মুক্ত বক্ষ তার উন্মুক্ত পিঠের উপর ছড়িয়ে থাকা অবস্থায়ও এই চুলের যাদু প্রত্যক্ষ করেছে লোকটা। মেয়েটার দেহ সম্পর্কে এতোটাই অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেছে যে, অতোটা অভিজ্ঞতা তার নিজ দেহ সম্পর্কেও ছিলো না। কিন্তু রাদী যখন লোকটার প্রতি নির্লিপ্তভাবে ঘৃণা ও তাচ্ছিল্য প্রকাশ করলো এবং হাত থেকে মদের পেয়ালাটা কেড়ে নিয়ে ফেলে দিলো, তখন তার পৌরুষ যেনো হারিয়ে গেলো। লোকটা নিজের মধ্যে এমন অসহায়ত্ব অনুভব করলো, যেনো মেয়েটা তাকে যাদু করে ফেলেছে। একজন পুরুষ দশজন পুরুষের মোকাবেলা করতে পারে। লড়তে পারে হিংস্র প্রাণীর সঙ্গেও। কিন্তু ভালোবাসার নারীটা যখন বলে বসে, আমি তোমাকে ঘৃণা করি, তখন সে বালির স্তূপে পরিণত হয়ে যায়। এই খৃস্টান লোকটির অবস্থাও হয়েছে তা-ই।
আমি তোমাকে আমার কোন সঙ্গীর খেলনায় পরিণত হতে দেবো না।
আমি হুকুমের গোলাম- রাদী বললো- আমি আত্মহত্যা করবো না। আত্মহত্যা করা কাপুরুষতা। পালাবারও চেষ্টা করবো না। এটা প্রতারণা। আমি আত্মহত্যা করে ফেলেছি। নিজের আত্মাটাকে আমি মেরে ফেলেছি।
লোকটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে এমনভাবে পা ফেলে রাদীর দিকে এগিয়ে যায়, যেনো রাণী তাকে যাদু করেছে। কাছে এসে ধীরে ধীরে ডান হাতটা উপরে তুলে রাদীর চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললো তুমি আমার কল্পনার চেয়েও বেশি রূপসী। বলেই হাতটা পেছনে সরিয়ে নিয়ে বললো- আজ আমি প্রথমবার অনুভব করেছি, তোমার কণ্ঠে জ্বলন আছে। তুমি নর্তকী- গায়িকা নও তো?
আমি গানও গাই- রাদী বললো- কিন্তু গান সেটি শোনাবো, যেটি আমার ভালো লাগে, যার মধ্যে আমার ব্যথা আছে।
