দুজনই সৈনিক। তারা তরবারী দ্বারা মোকাবেলা করে। কিন্তু সাত আটটা বর্শা তাদের দেহ দুটোকে, ঝাঁঝরা করে দেয়। রাদী আক্রমণকারীদের কজায় চলে আসে। মেয়েটি আলাদা এক স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার চেহারায় ভয়ের সামান্যতম ছাপও নেই। প্রদীপের কম্পমান আলোয় তার রূপটা এমন রহস্যময় মনে হচ্ছে, যেনো সে এ জগতের প্রাণী নয়।
রাদীকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নেয়া হলো। কালো পাগড়িওয়ালাও ঘোড়ায় চড়ে বসে। দুজন পাশাপাশি চলতে শুরু করে। লোকটা রাদীকে জিজ্ঞেস করে নিজের সম্পর্কে কিছু বলবে কি? রানী সব কিছু বলে দেয়।
***
রাদীকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হলো, সেটি কোন প্রাসাদ কিংবা ঘর নয়- একটি তাঁবু। তাঁবুর অর্ধেকটা মাটির উপরে, অবশিষ্টটুকু নীচে। পার্টিশন ও শামিয়ানা ফুলদার রেশমি কাপড়ের। ভেতরে সুপরিসর একটি পালঙ্কের উপর জাজিম বিছানো। ঝাড়বাতির উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করছে ভেতরটা। মনেই হচ্ছে না এটি তাঁবু। থরে থরে সাজানো মদের পিপা-পেয়ালা। ভেতরে তিনজন লোক উপবিষ্ট। রাদী তৎক্ষণাৎই বুঝে ফেলে, লোকগুলো খৃস্টান। তারা রাদীকে দেখে অপলক চোখে তার প্রতি তাকিয়ে থাকে। কালো নেকাব পরিহিত লোকটা তার সঙ্গে। ভেতরে প্রবেশ করে মুখোশটা খুলে ফেলে দিয়েই বলে ওঠে- এমন উপহার আগে কখনো দেখেছো? তাছাড়া মেয়েটা নর্তকীও।
রাণী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ঝাড়বাতির আলোতে তার রূপ অধিক যাদুময় মনে হচ্ছে। মেয়েটার মুখে ভয়-ভীতির কোন ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
রাদীকে পালঙ্কের উপর বসিয়ে দেয়া হলো। জিজ্ঞেস করা হলো–তুমি কে এবং কোথায় যাচ্ছিলে?
রাদী তার জীবনের সকল বৃত্তান্ত শোনায়। তবে তাতে কারো মনে কোন প্রতিক্রিয়া জাগলো না। একজন নির্যাতিতা নারীর করুণ কাহিনীতে প্রভাবিত হওয়ার জন্য যে চেতনার প্রয়োজন, তা তাদের কাছে নেই। কোথায় যাচ্ছিলে? প্রশ্নের উত্তরে রাণী বললো- আমাকে এক খৃস্টান সম্রাটের নিকট নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো।
তার মানে তুমি চারজন খৃস্টানকে হত্যা করেছো? যে লোকটি রাণীকে নিয়ে এসেছে, একজন ক্ষুব্ধকণ্ঠে তাকে জিজ্ঞেস করে।
তাদেরকে খৃস্টান মনে হচ্ছিলো না- লোকটি উত্তর দেয়- তোমরা আমাকে বলেছিলে, দুতিনটি মেয়ে নিয়ে আসো, যাদের নিয়ে আমরা এই বিজন ভূমিতে ফুর্তি করবো। আমি বেরিয়ে পড়লাম। ঘটনাক্রমে একে পেয়ে গেলাম। লোকগুলোকে সন্দেহভাজন মুসলমান মনে হলো। আমি তাদের পিছু নিলাম। লোকগুলোকে হত্যা করে মেয়েটাকে নিয়ে এলাম।
তোমার সঙ্গে কে কে ছিলো?
আমাদের মাত্র দুজন ছিলো- লোকটি উত্তর দেয়- অবশিষ্ট পাঁচজন মসুলের মুসলমান, যারা এখানে প্রহরার দায়িত্ব পালন করে থাকে।
চারজন খৃস্টানকে হত্যা করে তোমাদেরই এক সম্রাটের একটি উপহার ছিনিয়ে এনেছো, এই তথ্য যদি ফাঁস হয়ে যায় তাহলে জানেনা তার পরিণতি কী হবে?
লোকটি কথা বলছে না। হঠাৎ এক ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশ করে বললো- এই তথ্য ফাস হবে না। আপনি ভয় করছেন, আমরা যে মুসলমানরা সঙ্গে আছি এ তথ্য ফাঁস করে দেবো। না এমনটা হবে না।
এ লোকটি কে?
আমার ঘনিষ্ঠ সহচর- আগের লোকটি বললো এবং মসুলের বড় এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বললো- তিনি দিয়েছেন। বিশ্বস্ত এবং বুদ্ধিমান।
আমি আপনাদেরই লোক- নবাগত লোকটি বললো- মসুলের যেসব তথ্য আপনারা লাভ করছেন, সব আমার ও আমার সঙ্গীদেরই সংগ্রহ করা তথ্য।
লোকটাকে আরো অনেক প্রশ্ন করা হয়। উত্তরে সে এমন ধারায় কথা বলে যে, সবাই তাকে বিশ্বস্ত বলে নিশ্চিত হয়ে যায়। কারো মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ জাগলো না, লোকটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ভয়ঙ্কর একজন গুপ্তচর, যার নাম হাসান আল-ইদরীস। আল্লাহ লোকটার মুখাবয়ব ও দৈনিক গঠনে এমন এক আকর্ষণ দান করেছেন, যে কেউ এক নজর দেখার পর তার ভক্ত হয়ে যায়। লোকটার মুখের ভাষা ও বর্ণনা ভঙ্গিতে এমন এক যাদু যে, তার বক্তব্যে শ্রোতারা মুগ্ধ হতে বাধ্য। তাছাড়া যেকোন সময় যেকোন রূপ ও যেকোন ভাব ধারণ করায় বড় পারঙ্গম। মসুলে সুলতান আইউবীর যে কজন গোয়েন্দা ছিলো, প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত তাদের যাতায়াত ও যোগাযোগ ছিলো। তারা তথ্য সগ্রহ করেছে, মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীনও উক্ত দরবেশ দ্বারা প্রভাবিত। মসুলের জনসাধারণের ন্যায় তিনিও বিশ্বাস করে নিয়েছেন, দরবেশ আসমান থেকে ইশারা লাভ করবেন এবং পরে যখনই তার বাহিনী অভিযানে অবতীর্ণ হবে, তখন জয়ের পর জয়লাভ করতে থাকবে।
গোয়েন্দাদের এ তথ্য সরবরাহ করেছেন নূরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী রোজি খাতুন। তিনি আইউবীর গোয়েন্দাদের তথ্য সরবরাহ করেছেন, ইযুদ্দীন অত্যন্ত কঠোরভাবে খৃস্টানদের জালে আটকে গেছেন। খৃস্টানরা যেনো তাকে যাদু করে ফেলেছে। দরবেশটা যদি খৃষ্টানদের সাজানো নাটক না হয়ে দরবেশই হয়ে থাকে, তাহলে লোকটা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্ত। আল্লাহ তাকে জয়ের ইঙ্গিত দান করবেন, তার এই আগাম ঘোষণা সম্পূর্ণরূপে ইসলাম পরিপন্থী।
এসব তথ্য সরবরাহ করে রোজি খাতুন গোয়েন্দাদের পরামর্শ প্রদান করেন, তোমরা দরবেশটার মুখোশ উন্মোচন করো এবং সম্ভব হলে তাকে হত্যা করে ফেলো। রোজি খাতুন এই সন্দেহও ব্যক্ত করেন যে, খৃস্টানরা উক্ত পাহাড়ের অভ্যন্তরে কিছু একটা করছে। তোমরা তথ্য নাও কী করছে এবং সুলতান আইউবীকে অবহিত করো।
