শরফুদ্দীন!- সুলতান আইউবী বললেন- ফৌজ আর সামরিক সরঞ্জাম ব্যতীত যা কিছু নিতে চাও, রাত পোহাবার আগেই নিয়ে বেরিয়ে যাও। তারপর আর এদিকে মুখ ফেরাবে না। সুলতান তার এক সালারকে বললেন- কয়েকজন সৈন্য নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ো এবং দেখো এরা নিষিদ্ধ কোন বস্তু নেয় কিনা। কতজন সৈন্য আছে গণনা করো এবং তাদেরকে আমাদের ফৌজে অন্তর্ভুক্ত করে নাও।
আমি আপনার গোলাম মহামান্য সুলতান- শরফুদ্দীন বললেন দুর্গ ও ফেজ আপনারই থাকবে। আমাকে দুর্গে থাকতে দিন।
দুর্গের প্রয়োজন থাকলে মোকাবেলা করতে- সুলতান আইউবী বললেন- তোমার ন্যায় এমন কাপুরুষ ও ঈমান নিলামকারীর এতো বড় দুর্গের অধিপতি হওয়ার অধিকার নেই।
আমি কীভাবে আপনার মোকাবেলা করবো!- শরফুদ্দীন বললেন শুনলাম আপনি এসেছেন আর অমনি বেরিয়ে এলাম। মুসলমান মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়ে কি করে!
যেমনটা আগে লড়েছে- সুলতান আইউবী বললেন- শরফুদ্দীন! তুমি খৃস্টানদের বন্ধু এবং নামের মুসলমান। নিজের চরিত্রটা একটু দেখে নাও। তুমি সৈনিক থেকে কী হয়েছে। ঈমান বিক্রি করে বিলাসিতা ক্রয়কারীদের এ দশাই হয়। মদ আর নারী তোমার সব শক্তি-সাহস নিঃশেষ করে দিয়েছে। তুমি মিথ্যাও বলছো। তোমার মধ্যে যদি এতোটুকু আত্মমর্যাদাবোধও থাকতো, তাহলে নিজের দুর্গটা এভাবে বিনা যুদ্ধে আমার হাতে তুলে দিতে না।
মহামান্য সুলতান!- শরফুদ্দীন অনুনয়-বিনয় করেন- আমাকে দুর্গে থাকতে দিন।
সুলতান আইউবী এক সালারকে বললেন- একে দুর্গে নিয়ে যাও এবং বন্দি করে ফেলে। এর বাসনা পূর্ণ করো।
তিন-চারজন লোক সম্মুখে এগিয়ে আসলে শরফুদ্দীন সুলতান আইউবীর আরো নিকটে এসে মিনতির স্বরে বললেন- আমি মসুল যেতে চাই।
হ্যাঁ, ইযযুদ্দীন তোমার বন্ধু- সুলতান আইউবী বললেন- তার কাছে চলে যাও।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সানজার দুর্গের দখল বুঝে নিয়ে তকিউদ্দীনকে অধিপতি নিযুক্ত করেন।
সম্মুখে আরেকটি দুর্গ আছে। তার নাম আমিদ। সুলতান অবশিষ্ট রাত সানজার দুর্গে অতিবাহিত করে সকালে আমিদ অভিমুখে রওনা হন। দুৰ্গটার বর্তমান নাম উমিদা। দজলার তীরে বিখ্যাত এক পল্লী ছিলো। তার আমীরও ছিলেন মুসলমান। এই পল্লীটাই একটা দুর্গ। সুলতান আইউবী সেটি অবরোধ করে ফেলেন। সেখানকার সেনা ও জনসাধারণ মোকাবেলা করার চেষ্টা করে। কিন্তু অবরোধের অষ্টম দিন আমীর অস্ত্র সমর্পণ করেন। সুলতান আইউবী নূরুদ্দীন নামক এক ব্যক্তিকে এই দুর্গের অধিপতি নিযুক্ত করেন।
***
চার খৃস্টান সৈনিকের সঙ্গে রাদী এখনো সফরে আছে। তার শরীরিক অবস্থা ঠিক হয়ে গেছে। খৃস্টান সৈনিকরা পথে তার বিশ্রাম ও সুযোগ সুবিধার প্রতি বেশ লক্ষ্য রেখে চলছে। কিন্তু যে রাতে সে তাদেরকে নিজের জীবন-কাহিনী শুনিয়েছিলো, তারপর আর তাদের সঙ্গে কথা বলেনি। খৃস্টান সৈনিকের খোদা তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন, তুমি পুণ্য করো, খোদা তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন উক্তিটি তার হৃদয়ে তোলপাড় করে চলেছে। মেয়েটার শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলেও মানসিক অবস্থা ভালো নয়। যে লোকটির সঙ্গে হজ্বে যাচ্ছিলো, তার স্মরণে সে ছটফট করছে। মনটা বেশি অস্থির হয়ে গেলে ভাবে- আল্লাহ আমাকে আমার পাপের শাস্তি দিচ্ছেন। তার জানা ছিলো না, আল্লাহর সমীপে কীভাবে পাপের ক্ষমা চাইতে হয়।..
চার রক্ষীর সঙ্গে রাদী গন্তব্যের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। এখন তারা মসুলের সীমানার ভেতরে। একদিন তারা এক উষ্ট্রারোহীকে দেখতে পায়। আরোহী তাদের দেখে উট থামিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। লোকটার মাথা ও মুখমণ্ডল কালো পাগড়িতে পেঁচানো। শুধু চোখ দুটো খোলা। রাদীর উপর তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে পড়ে। খৃস্টান সৈনিকরা সামরিক পোশাক পরিহিত ছিলো না। তাই তারা যে খৃস্টান সৈনিক বুঝবার উপায় নেই।
উষ্ট্রারোহীর চোখ দুটো দেখেছো? এক খৃস্টান তার সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করে।
অনেক গভীরভাবে দেখেছি- একজন জবাব দেয়- এসব দৃষ্টির অর্থ আমি বুঝি। এখন আমাদেরকে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। মেয়েটা এতোই রূপসী যে, কোন দস্যুর চোখে পড়ে গেলে বিপদ হয়ে যাবে। সামনের অঞ্চলটা পাহাড়ী।
তারা দিনভর চলতে থাকে। সন্ধ্যার পর দুটি টিলার মধ্যখানে উপযুক্ত একটা জায়গা দেখে অবতরণ করে এবং খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করতে শুরু করে। খাওয়ার পর সকলে ঘুমিয়ে পড়ে। শুধু প্রতিদিনকার ন্যায় একজন জেগে পাহারা দিতে থাকে। খানিক পর সে কিছু একটার শব্দ শুনতে পায়। শিয়াল কিংবা অন্য কোন প্রাণীর হাঁটার সময় ধাক্কা খেয়ে একটা পাথর খণ্ড ঢালু বেয়ে নীচে গড়িয়ে পড়েছে হয়তো। তথাপি সৈনিক সর্তক হয়ে যায়। কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে। শব্দটা আবারো শোনা গেলো। সৈনিক তার এক সঙ্গীকে জাগিয়ে তোলে এবং কানে কানে তাকে বিষয়টা অবহিত করে। সেও উঠে দাঁড়ায়। উভয়ে ধনুকে তীর সংযোজন করে একজন একদিকে অপরজন আরেক দিকে দাঁড়িয়ে যায়।
রাতটা অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এখন কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না। কিন্তু পরক্ষণেই পরপর দুবার দুটো শব্দ ভেসে এলো। শব্দটা কোন দিক থেকে এলো বুঝে ওঠার আগেই একটি করে তীর ধেয়ে এসে দুজনের পাজরে গেঁথে যায়। তাদের অন্য সঙ্গীরা সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে গভীর ঘুম ঘুমাচ্ছিলো। জাগ্রত দুজন তীর খেয়ে তাদের হাঁক দিলে তারা ধড়মড় করে উঠে বসে। তারা পলায়নপর পায়ের শব্দ শুনতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রদীপ জ্বলে ওঠে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে। পরক্ষণেই তারা সাত-আটজন লোকের অবরোধে চলে আসে। তাদের একজনের মাথা ও মুখমণ্ডলে কালো পাগড়ী পেঁচানো। দিনের বেলা যে উজ্জ্বারোহীকে দেখা গিয়েছিলো এবং রাদীর প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো, এই লোকটা সে-ই বলে মনে হলো।
