বন্ধুগণ! যদি হেসে উড়িয়ে না দাও, তাহলে বলবো- হাসান আল ইদরীস বললো- দরবেশ যেখানে গিয়ে ধ্যানে বসেছেন, খৃস্টানদের অস্ত্রের ডিপো সেখানে। আর দরবেশ নাটক মঞ্চস্থ করা এবং উক্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা প্রমাণ করছে এই ডিপো বিপুল এবং এর পেছনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বিদ্যমান। তোমরা জানো, এতো বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চার পার্শ্বে একটা পুরো বাহিনীর প্রহরা বসালেও কোন না কোন দিক থেকে মানুষ ভেতরে ঢুকে যেতে পারতো। সেই জন্য তারা দরবেশ নাটক মঞ্চস্থ করে প্রচার করেছে, পাহাড়ের চূড়ায় একজন দরবেশ বসে আছেন। তিনি চাচ্ছেন না কেউ উক্ত অঞ্চলে প্রবেশ করুক। ফলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ এখন আর সেদিকে পা বাড়াতে সাহস পাচ্ছে না।
ঘোষণা করা হয়েছে, কেউ যদি উক্ত অঞ্চলে প্রবেশ করার এবং দরবেশকে দেখার চেষ্টা করে, তাহলে সে নিজে অন্ধ হয়ে যাবে এবং তার সন্তানরাও অন্ধ হয়ে যাবে- হাসান আল-ইদরীসের এক সঙ্গী বললো- খৃস্টানরা ওখানে কিছু রেখে থাকতে পারে তথ্য দিয়ে তোমরা আমাদের অর্ধেক সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। রহস্য উদঘাটনে এখন আমাদেরকে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
দরবেশকেসহ অস্ত্রের ডিপোটা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে হবে। হাসান আল-ইদরীস বললো।
আর জনগণকে তাদের এই অলীক বিশ্বাস থেকে রক্ষা করতে হবে- কমান্ডার বললো- খৃস্টানদের বুদ্ধির প্রশংসা করতে হবে। বেটারা অস্ত্রের ডিপোটা মানুষের দৃষ্টি থেকে দূরে রাখার জন্য এক ব্যক্তিকে দরবেশ বানিয়ে পাহাড়ে নিয়ে বসিয়ে রেখেছে। সেই সঙ্গে মসুলের ফৌজ ও জনগণকে খোদার ইশারার টোপ দিয়ে সামরিক প্রস্তুতি থেকে বিরত রাখার কৌশল অবলম্বন করেছে। অবস্থাটা দেখো, তাদের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে ফৌজ এবং সাধারণ মানুষ সকলে সব বাদ দিয়ে খোদার ইশারার অপেক্ষায় বসে আছে।
দরবেশ সম্পর্কে মসুলের গবর্নরের দৃষ্টিভঙ্গী কী? হাসান জিজ্ঞেস করে।
দরবেশ তার মহলে তারই ঘোড়াগাড়িতে করে গিয়েছিলেন–কমান্ডার উত্তর দেয়। আবার সেই গাড়িতে করেই পার্বত্য এলাকায় চলে গেছেন। এতেই প্রমাণিত হচ্ছে, মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীনও এই চক্রান্তে জড়িত কিংবা তিনিও এই ষড়যন্ত্রের শিকার। বাদ বাকি তথ্যও আমরা জেনে যাবো। রোজি খাতুন মহলে আছেন। তার থেকেই জানা যাবে, মহলে দরবেশের অবস্থান কী?
সুলতান আইউবীর চার গোয়েন্দা উক্ত পার্বত্য অঞ্চল ও মহলে দরবেশের অবস্থান জানতে তৎপরতা শুরু করে দেয়।
***
সানজার দুর্গের প্রধান ফটকের প্রহরীরা ঘুম ঘুম চোখে শুয়ে আছে। যুগটা যুদ্ধ-বিগ্রহের হলেও সানজারের অধিপতি শরফুদ্দীন ইবনে কুতুবুদ্দীন কোন শঙ্কা অনুভব করছেন না। খৃস্টানদের আনুগত্য বরণ করে নিরাপত্তা বোধ করছেন তিনি। মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীন এবং হালবের গবর্নর ইমাদুদ্দীন তাকে বলে রেখেছেন, চিন্তা করবেন না, প্রয়োজন হলে আমরা আপনার সাহায্যে এগিয়ে আসবো। তিনি এই আত্মপ্রবঞ্চনায়ও লিপ্ত, সুলতান আইউবী তার অবস্থান সম্পর্কে অবহিত নন। তিনি মদ-নারীতে মাতাল হয়ে গভীর ন্দ্রিায় ঘুমিয়ে আছেন। খৃস্টানরা তাকে দুটি অতিশয় সুন্দরী মেয়ে উপহার দিয়েছিলো। এই মেয়ে দুটো তাকে সবসময় স্বপ্নে বিভোর করে রাখছে।
দুর্গের প্রাচীরের উপর দিয়ে লিঙ্গের ন্যায় একটা বস্তু উড়ে যায়। পরক্ষণেই আরো একটা। তারপর আবো। প্রহরীরা সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। এই ফুলিঙ্গগুলো দুর্গের ভেতরে গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয় এবং ভয়ানক শিখায় পরিণত হয়ে যায়। নিকটেই মালপত্র পড়া আছে। কাছাকাছি একটি গৃহ। দুটোতেই আগুন ধরে যায়। বস্তুগুলো তরল দাহ্য পদার্থের পাতিল। সুলতান আইউবীর সৈন্যরা মিনজানিকের সাহায্যে সেগুলো নিক্ষেপ করেছে। সঙ্গে বাঁধা ছিলো প্রজ্জ্বল্যমান সলিতা। পাতিলগুলো ছিলো মাটির তৈরি। পড়েই ভেঙ্গে গেলো। আর অমনি ভেতরের তরল দাহ্য পদার্থগুলো ছড়িয়ে পড়লো এবং সঙ্গে থাকা সলিতা থেকে আগুন ধরে গেলো।
দুর্গে প্রলয় ঘটে গেছে। যে যেখানে ছিলো জেগে ওঠেছে। দুর্গপতি শরফুদ্দীনকে জানানো হলো। তিনি কক্ষের জানালার ফাঁক দিয়ে আগুনের শিখা দেখে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসেন। শরফুদ্দীন এক সময় ময়দানের পুরুষ ছিলেন। কিন্তু খৃস্টানরা মদ-নারী দিয়ে তাকে এখানে এনে পৌঁছিয়েছে। আজ রাতে তার পা চলছে না। রাতের পর রাত মরুভূমি ও দুর্গম পাহাড়ে ছুটে বেড়ানো যুদ্ধবাজ লোকটা এখন দুর্গের সমতল পথেও হাঁটতে পারছেন না।
খানিক পর উপর থেকে কমান্ডার দৌড়ে এসে শরফুদ্দীনকে জানালো, দুর্গ অবরোধ হয়েছে।
কোন্ হতভাগা অবরোধ করলো শরফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
সালাহুদ্দীন আইউবী- কমান্ডার উত্তর দেয়- তিনি বাইরে থেকে হুঙ্কার দিচ্ছেন, ফটক খুলে দাও। অন্যথায় দুর্গ জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দেবো।
শরফুদ্দীনের নেশা কেটে গেছে। তিনি ভাবনায় পড়ে যান। অনেকক্ষণ পরে বললেন- ফটক খুলে দাও। আমি নিজে বাইরে যাবো।
দুর্গের ফটক খুলে গেছে। শরফুদ্দীন বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। ওদিক থেকে সুলতান আইউবী এক সালারকে বললেন, এগিয়ে গিয়ে শরফুদ্দীনকে আমার কাছে নিয়ে আসো। সুলতান নিজে এক পা-ও অগ্রসর হলেন না। শরফুদ্দীন সুলতান আইউবীর সম্মুখে এসে ঘোড়া থেকে নেমে দুবাহু প্রসারিত করে সুলতানের দিকে ছুটে আসেন। সুলতান এমন একটা ভাব ধারণ করেন, যেনো তিনি শরফুদ্দীনের সঙ্গে হাত মেলাতেও রাজি নন।
