যা হোক, এহতেশামুদ্দীন থেকে তথ্য পাওয়ার পর সুলতান আইউবী গোয়েন্দা উপপ্রধান হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে আদেশ করেন, খুঁজে বের করো খৃস্টানরা কোন্ পাহাড়ে ঘাঁটি গেড়েছে। গেরিলা বাহিনীর প্রধান সারেম মিসরীকে বললেন, জায়গাটা চিহ্নিত হয়ে গেলে সব ধ্বংস করে ফেলার ব্যবস্থা করবে। সুলতান আইউবীর দূরদর্শী চোখ দেখতে পেয়েছে, খৃস্টানরা এখন পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে।
সুলতান এহতেশামুদ্দীনের মুখে খৃস্টানদের প্রত্যয়-পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর পরিকল্পনা ঠিক করেন, খৃস্টানদের কোথাও দাঁড়াতে, দেবেন না। তিনি এক আদেশ তো এই প্রদান করেন যে, খৃস্টানরা কোথায় ঘাঁটি গাড়ছে খোঁজ নাও। আরেকটি আদেশ জারি করেন, সানজার অভিমুখে অভিযান প্রেরণ করো এবং দুর্গটা অবরোধ করে ফেলল।
সানজার মসুল থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ। তার অধিপতি শরফুদ্দীন ইবনে কুতুবদীন। সানজার দুর্গ দখল করার অভিযান সুলতান আইউবীর সেই পরিকল্পনারই ধারাবাহিকতা, তিনি বলেছেন- এখন আর আমি কারো নিকট সাহায্য ভিক্ষা করবো না, বরং তরবারীর আগা দ্বারা সাহায্য আদায় করবো। তার জানা ছিলো, ছোট ছোট মুসলিম আমীরগণ স্বাধীন শাসক থাকতে চাচ্ছে। সেই লক্ষ্যে তারা তলে তলে খৃষ্টানদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে। সানজারের অধিপতি শরফদ্দীন সম্পর্কে সুলতানের নিকট নিশ্চিত তথ্য ছিলো, তিনিও ইযযুদ্দীনের সুহৃদ। আর সেই হৃদ্যতার সূত্রে তিনিও সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে কাজ করছেন।
মসুলে মুসলিম গোয়েন্দা উপস্থিত ছিলো। তবু হাসান ইবনে আবদুল্লাহ ভাবলেন, এ কাজের জন্য আরো বিচক্ষণ ও সাহসী গোয়েন্দা প্রেরণ করা আবশ্যক। খৃষ্টানদের গোপন ঘাঁটি ও অস্ত্রের ডিপো আবিষ্কার করা সহজ হবে না। এরূপ গোয়েন্দা কে আছে? হা, হাসান আল-ইদরীস। তার কৃতিত্ব চোখের সামনে বিদ্যমান। কিন্তু হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তাকে প্রেরণ করতে চাচ্ছেন না। কারণ, হাসান দীর্ঘ সময় বৈরুত অবস্থান করে এসেছে। শত্রুরা তাকে চিনে ফেলতে পারে। হাসান বেশ-ভূষা, কণ্ঠ ও বলার ভঙ্গিমা পরিবর্তন করার ওস্তাদ। সে হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে বললো, অসুবিধা নেই। আপনি আমাকে প্রেরণ করুন। আমি এমন এক রূপ ধারন করবো, চির পরিচিতরাও আমাকে চিনতে পারবে না। হাসানকে মসুলের কেউ চিনে না। অবশেষে তাকেই প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। সুলতান আইউবী স্বয়ং দিক-নির্দেশনা প্রদান করে হাসান আল-ইদরীসকে প্রেরণ করেন।
প্রিয় বন্ধু আমার!- সুলতান আইউবী হাসান আল-ইদরীসের মাথায় হাত রেখে বললেন- ইতিহাসে নাম সালাহুদ্দীন আইউবীর আসবে। পরাজয়বরণ করবে তো ইতিহাস আমাকে লজ্জা দেবে। জয়লাভ করে মৃত্যুবরণ করবে তো মানুষ আমার কবরের উপর ফুল ছিটাবে। আর অনাগত প্রজন্ম আমার ভূয়সী প্রশংসা করবে। এটা খুবই অবিচার হবে। আমি বিজয়ের কৃতিত্ব তোমাকে এবং তোমার সেই সঙ্গীদের দিতে চাই, যারা দুশমনের অভ্যন্তরে ঢুকে গিয়ে তথ্য সগ্রহ করে আনছে এবং আমার বিজয়ের পথ সুগম করছে। আল্লাহ সাক্ষী, এটাই বাস্তব। আল্লাহ নিজ হাতে তোমাদের বিজয় মালা পরাবেন। তবে যদি পরাজিত হই, তাহলে তার দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণ আমার। তখন ধরে নেবব, আমি তোমাদের এনে দেয়া তথ্য অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছি। তোমরা আমার চোখ। তোমরা আমার কান। আমার আত্মা তোমাদের কবরের উপর ফুল ছিটাতে থাকবে। অতি মহান তুমি ও তোমার সঙ্গীরা। আমার কোন মর্যাদা নেই। আমি সমগ্র বাহিনী নিয়ে সানজার যাচ্ছি। আর তুমি যাচ্ছো একা। গোটা বাহিনীকে ব্যবহার করে আমি যে বিজয় অর্জন করবো, তুমি একাই তা করে ফেলবে। যাও বন্ধু, যাও। আল্লাহ হাফেজ।
হাসান আল-ইদরীস একজন গরীব মুসাফিরের বেশে একটি উটের পিঠে সওয়ার হয়ে নাসীবার তাবু থেকে বের হয়। সূর্য ডুবে গেছে। বেশ পথ অতিক্রম করার পর সে অনেকগুলো ঘোড়র পায়ের শব্দ শুনতে পায়। হাসান দাঁড়িয়ে যায়। তার জানা আছে এসব ঘোড়া কার। সুলতান আইউবী সানজার অভিযানে রওনা হয়েছেন। এটি তারই বাহিনী। তিনি নাসীবা থেকে ক্যাম্প প্রত্যাহার করেননি। হেডকোয়ার্টার ও কতিপয় আমলাকে সেখানে রেখে এসেছেন। রিজার্ভ বাহিনীটিকেও প্রস্তুত অবস্থায় রেখে এসেছেন।
***
তুমি জানতে এসেছো, খৃস্টানরা পার্বত্য অঞ্চলের কোন্ জায়গাটায় অস্ত্রের সমাবেশ ঘটাচ্ছে- মসুলে কর্মরত মুসলিম গোয়েন্দাদের কমান্ডার বললো- আর আমরা এখানে জানবার চেষ্টা করছি, এই দরবেশটা কে, যিনি সেই পাহাড়গুলোরই কোন একটির চূড়ায় গিয়ে বসেছেন। কেউ তাকে ইমাম মাহদী বলছে। কেউ বলছে ঈসা।
কমান্ডার হাসান আল-ইদরীসকে দরবেশের পূর্ণ কাহিনী শুনিয়ে বললো- ঐ পাহাড়গুলোর ধারে-কাছে ঘেষবারও অনুমতি নেই। ফৌজের কিছু সান্ত্রী এবং কতিপয় অপরিচিত লোক পাহারা দিচ্ছে। তারা কাউকে ওদিকে যেতে দিচ্ছে না। দরবেশ কোন একটি পাহাড়ের চূড়ায় বসে আছেন। খোদা আকাশ থেকে তাকে কোন একটা ইঙ্গিত দেবেন। রাতে মানুষ ঘরের ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মানুষ আল্লাহ-রাসূলকে ভুলে যাচ্ছে।
এরা চারজন। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গোয়েন্দা। তারা জানে,কুরআন হাদীসে ভিত্তি নেই এমন বিশ্বাস-ধারণা সম্পূর্ণ হারাম। দরবেশকে কেন্দ্র করে এখন মানুষ যে বিশ্বাস পোষণ করছে, সবই কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন কল্পনা মাত্র। ইসলামে এগুলো হারাম। চার গোয়েন্দা বসে বসে ভাবছে, কিভাবে দরবেশের রহস্য উদঘাটন করা যায়।
