চার সৈনিক উচ্চকণ্ঠে একটা অট্টহাসি দেয়। একজন বললো তোমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের কর্তব্য। আমরা এমনই আদেশ পেয়েছি। অন্যথায় এ ধরনের উক্তি তোমার মুখ থেকে দ্বিতীয়বার বের হতে পারতো না।
রাদী লোকগুলোর প্রতি তাকিয়ে থাকে। তার হৃদয়ে এই অমানুষগুলোর প্রতি ঘৃণা বাড়তে থাকে।
***
মসুলে একজন দরবেশ এসেছেন। এক মুখ দুমুখ করে সংবাদটা রাষ্ট্র হয়ে গেছে মুহূর্ত মধ্যে। অশীতীপর এক বৃদ্ধ। মানুষ বলাবলি করছে, তিনি যে কোন ভাগ্যবান লোকেরই সঙ্গে কথা বলেন। আর যার সঙ্গে কথা বলেন, তার সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়ে যায়। নগরীর প্রাচীরের বাইরে একটি ঝুপড়িতে থাকেন। তার কারামতের কাহিনী নগরীর মানুষের মুখে মুখে।
জনতা দরবেশের আস্তানার চারদিকে ভিড় জমাতে শুরু করেছে। তিনি সামান্য সময়ের জন্য বাইর এসে হাতের ইশারায় অপেক্ষমান জনতাকে নীরব থাকতে বলছেন। জনতা নিশ্চুপ হয়ে গেলে তিনি মুখে কিছু না বলে ইঙ্গিতে তাদের সান্ত্বনা প্রদান করে ঝুপড়িতে ঢুকে পড়ছেন। তার সঙ্গে সাদা-গোলাপী বর্ণেল চার-পাঁচজন সুশ্রী লোকও রয়েছে। দরবেশের মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবুজ চাদরে আবৃত।
এবার আরেক খবর। দরবেশ মসুলবাসীর জন্য কী একটা সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন। নগরীতে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গেছে। তারা জনতাকে দরবেশের কল্প-কাহিনী শুনিয়ে বেড়াচ্ছে। শুনে মানুষ আপ্লুত হয়ে পড়ছে। সকলে এই দরবেশের দ্বারা নিজে সকল সমস্যা দূর করাতে এবং সকল কামনা পূরণ করাতে উদগ্রীব হয়ে উঠছে। অল্প কদিন পর খবর ছড়িয়ে পড়ে দরবেশ আসলে ইমাম মাহদী। কেউ কেউ বলছে ঈসা। ঐ যে আসমান থেকে দুনিয়াতে নেমে আসার কথা ছিলো, এসে পড়েছেন।
একদিন জনতা দেখলো, দরবেশ মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীনের ঘোড়াগাড়িতে করে তার প্রাসাদ অভিমুখে যাচ্ছেন। ইযযুদ্দীনের রক্ষী সেনারা তাকে স্বাগত জানায় এবং তিনি মহলে ঢুকে পড়েন। ঘণ্টা কয়েক পর বেরিয়ে রাষ্ট্ৰীয় গাড়িতে করে চলে যান। জনতা তার আস্তানায় গিয়ে দেখে, আস্তানা উধাও। সেই গাড়িটিই দরবেশকে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে। সন্ধ্যায় গাড়ি ফিরে আসে। ভেতরে গাড়োয়ান আর দুজন রক্ষী। জনতা গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, দরবেশ কোথায়?
আমরা বলতে পারবো না তিনি কোথায় গেছেন- এক রক্ষী বললো একটা পাহাড়ের নিকট গিয়ে গাড়ি থামাতে বললেন। গাড়ি থেমে গেলে আমাদেরকে বললেন, তোমরা চলে যাও। আমরা তার এক সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলাম, হুজুর কোথায় যাচ্ছেন? তারা বললো, তিনি পাহাড়ের চূড়ায় ধ্যানে বসবেন। দিগন্তে একটি নিদর্শন দেখতে পাবেন। তারপর পর্বতচূড়া থেকে নেমে এসে মসুলের গবর্নকে বলবেন তার করণীয় কী। তারপর মসুলের বাহিনী যেদিকেই যাবে, পাহাড় তাদেরকে পথ করে দেবে। মরুভূমি শ্যামলিমায় ভরে ওঠবে। দুশমনের ফৌজ অন্ধ হয়ে যাবে এবং মসুলের গবর্নর যে পর্যন্ত পৌঁছৰেন, সে পর্যন্ত তার রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। সালাহুদ্দীন আইউবী ইযযুদ্দীনের সম্মুখে অস্ত্র সমর্পণ করবে। খৃস্টানরা তার গোলাম হয়ে যাবে এবং মসুলের অধিবাসীরা অর্ধ পৃথিবীর রাজা হয়ে যাবে। তারা সোনা-রূপার মধ্যে খেলা করবে। তবে আমরা বলতে পারবো না, তিনি কোন্ পাহাড়ে ধ্যানে বসবেন।
মসুল থেকে খানিক দূরে একটি পার্বত্য অঞ্চল। সেখানে কোন বসতি নেই। একস্থানে একটা মাঠ আছে। মাঠটা পাহাড়বেষ্টিত। সেখানে দুচারটি কুঁড়েঘর চোখে পড়ে। অঞ্চলটা সবুজ-শ্যামল। রাখালরা পশু চড়াতে নিয়ে যায়।
একদিন রাখালদেরকে সেদিকে পশু নিয়ে যেতে বারণ করা হলো। মসুলের সেনারা টহল দিয়ে ফিরছে। তাদের সঙ্গে বহিরাগত অচেনা, লোকও আছে। পার্বত্য অঞ্চলটার বিস্তীর্ণ এলাকায় মানুষের যাতায়াত নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে অঞ্চলটার প্রতি মানুষের কৌতূহল জন্মে গেছে। সকলের মনে প্রশ্ন ব্যাপারটা কী? মানুষ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু করে দেয়। নানা রকম বিস্ময়কর ও অভিনব কাহিনী ছড়াতে শুরু করে। একদিনের মধ্যেই সকলের কানে কানে পৌঁছে যায়, দরবেশ আকাশ থেকে একটি নিদর্শন লাভ করবেন। তারপর আধা পৃথিবীর উপর মসুলবাসীদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।
***
ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। তাতে বসে ভিন্ন ধরনের কথা বলছে চার ব্যক্তি। তাদের একজন হাসান আল-ইদরীস। হাসান আল-ইদরীস সুলতান আইউবীর গুপ্তচর, যে কিনা বৈরুত থেকে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য নিয়ে এসেছিলো এবং সঙ্গে এনেছিলো মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীনের দূত এহতেশামুদ্দীন ও তার নর্তকী কন্যা সায়েরাকে। সে নজিরবিহীন সাফল্য ছিলো হাসানের। এহতেশামুদ্দীন সুলতান আইউবীকে তথ্য দিয়েছিলো, খৃস্টানরা মসুলের সন্নিকটে কোন এক পার্বত্য অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, দাহ্য পদার্থ এবং রসদ জমা করবে। তার থেকে প্রমাণিত হয়, তারা এ পার্বত্য অঞ্চলটাকে তাদের সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করবে। মসুলকে তো গেরিলাদের ঘাঁটি আগেই বানিয়ে নিয়েছে। সুলতান আইউবী ও তাঁর সালারগণ জানেন, যে বাহিনীর ঘাঁটি ও রসদ নিকটে থাকে, তারা অর্ধেক মুদ্ধ আগেই জিতে নেয়। খৃস্টান বাহিনীর একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যখনই তারা কোন অগ্রযাত্রা কিংবা আক্রমণ করেছে, আইউবীর কমান্ডো সৈন্যরা পেছনে গিয়ে তাদের রসদ ধ্বংস করে দিয়েছে কিংবা রসদ ও বাহিনীর মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ফেলেছে। তাছাড়া যুদ্ধের পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ময়দানে অবতীর হয়ে সুলতান আইউবী আগে-ভাগে ঘাস-পানির জায়গাটা দখল করে নিতেন এবং পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় তীরন্দাজদের বসিয়ে রাখতেন।
