একদিন সন্ধ্যায় আমি তাকে বললাম, তুমি মদ ছেড়ে দাও। সে শপথ করে বললো, ভবিষ্যতে আমি আর কখনো মদপান করবো না। আর খায়নি। একদিন সে আমাকে বললো, তুমি নাচ ছেড়ে দাও। আমি কসম খেয়ে বললাম, এই পেশার প্রতি আমি অভিসম্পাত করবো। কিন্তু মায়ের ঘরে বাস করে তো এই পেশা ত্যাগ করা সম্ভব নয়। সে বললো, আমি বিলাসী পিতার বিলাসী পুত্র। আমার পিতার হেরেমে তোমার চেয়েও অল্পবয়সী মেয়েরা আছে। সেই ঘরে বাস করে আমিও পুণ্যবান হতে পারবো না। আমি বললাম, আমি নর্তকী মায়ের নর্তকী মেয়ে আর তুমি বিলাসী পিতার বিলাসী পুত্র। তোমার পিতার চরিত্র তোমাকে নষ্ট করছে আর আমার মায়ের পেশা আমাকে নষ্ট করছে। চলো আমরা দূরে কোথাও পালিয়ে যাই এবং স্বামী-স্ত্রী হয়ে পবিত্র জীবন-যাপনকরি। সে আমার প্রস্তাবটা মেনে নেয়।
ছেলেটা মুসলমান ছিলো। আমার কোন ধর্ম নেই। আমার জনক মুসলমান ছিলো নাকি ইহুদী-খৃস্টান তাও আমি জানি না। আমি তাকে বললাম, আমাকে মুসলমানই মনে করো এবং বুঝাও ধর্ম কী। তুমি আমাকে ভালোবাসা দাও, পবিত্র জীবন দাও। সে অনেক চিন্তা করে বললো, পবিত্র যদি হতে চাও, তাহলে হেজাজ চলে যাও। আমি হেজাজের অনেক গান শুনেছি। যে গানে হেজাজ এবং হেজাজের কাফেলার কথা থাকে, সেই গান আমার খুব ভালো লাগে। একটা গান আমি একাকী গুন গুন করে থাকি- চলে কাফেলে হেজাজ কে। ছেলেটা হেজাজের নাম উচ্চারণ করে আমার কামনাকে উত্তেজিত করে তোলে। বললাম, আমি প্রস্তুত। তুমি সাহস করো, আমার আকাঙ্খা পূর্ণ করো। সে জিজ্ঞেস করে, জানো, হেজাজ কেন যাবো? আমি বললাম, শুনেছি জায়গাটা অত্যন্ত সুন্দর। সে বললো, শুধু সুন্দরই নয়- পবিত্রও। ওখানেই কাবা ঘর। ওখানেই যমযমের কূপ। ওখানে যে যায়, তার আত্মা পবিত্র হয়ে যায়। সেখানে গিয়ে আমরা হজ্ব করবো এবং পবিত্র হয়ে বিয়ে করবো। তারপর সেখানেই বসবাস করবো।
আমি সে সময়টার কথা ভুলতে পারবো না, যখন ছেলেটা আমার সঙ্গে শিশুর ন্যায় কথা বলছিলো আর আমি যেনো চোখের পথে তার আত্মায় ঢুকে গিয়েছিলাম। আমার ব্যক্তিসত্ত্বা তার সত্ত্বায় মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো। আমি তাকে বললাম, যাবোই যখন সময় নষ্ট না করে আজই চলো- এখনই। সে বললো, কোন কাফেলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে হবে। দেখি কাফেলা কবে পাই। একাকী যাওয়া যাবে না।
একদিন সন্ধ্যায় সে আমাকে বললো, আজ রাতেই এখানে চলে আসবে। একটা কাফেলা রওনা হয়েছে। আমরা তার সঙ্গে মিশে যাবো। আমি বললাম, এখন ঘরে গেলে রাতে আর বেরুতে পারবো না। এখনই রওনা হও। সে বললো, ঠিক আছে, আসো। সন্ধ্যা গম্ভীর হয়ে গেলে সে আমাকে এক স্থানে লুকিয়ে রেখে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর দুটি ঘোড়া নিয়ে ফিরে আসে। একটির উপর নিজে চড়ে বসেছে, অপরটি শূন্য। উভয়টির সঙ্গেই পানি ও খাবার বাঁধা আছে। আমরা পরদিন সন্ধ্যায় কাফেলার সঙ্গে গিয়ে মিলিত হই এবং রাতে সেখানে গিয়ে পৌঁছাই, যেখানে তোমরা আমার স্বপ্নটাকে আমার ভালোবাসার লহুতে ডুবিয়ে দিয়েছে। লোকটা মারা গেছে। আমি ধরা পড়ে গেলাম। হেজাজের কাফেলাটা লুষ্ঠিত হলো আর মনের মানুষটি স্বপ্নের পুরুষটি কাবা গৃহে না পৌঁছেই আল্লাহর নিকট চলে গেলো। আল্লাহ আমার পাপ ক্ষমা করেননি। আমার কপালের ভাগ্যে কাবা ঘরে সেজদা লিপিবদ্ধ হয়নি। আমার অস্তিত্ব নাপাক ছিলো। সে কারণেই আল্লাহ আমাকে কবুল করেননি।
তোমার যদি কোন ধর্মের ছায়ায় আশ্রয় নিতেই হয়, তাহলে আমাদের ধর্মকে কাছে থেকে দেখে নিও। এক সৈনিক বললো।
তোমরা আমার একটা পবিত্র স্বপ্নকে চুরমার করে দিয়েছে- রাদী বললো- এটা কি তোমাদের ধর্মের আদেশ, যা তোমরা তামিল করেছো? এ ধরনের বিপদের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা আমার রওনা হওয়ার সময়ও ছিলো। কিন্তু শঙ্কাটা এতো ভয়ানক ছিলো না।
এটা আমাদের ধর্ম নয়- সৈনিক বললো- এটা সেই মানুষদের নির্দেশ, আমরা যাদের চাকরি করি।
তোমাদের চেয়ে আমি অনেক ভালো- রাদী বললো- রাজা রাজপুতরা হিরা-জহরত নিয়ে আমার পায়ে লুটিয়ে পড়ে থাকে। আর তোমরা তাদের দাসত্ব করছে। যে আদেশটা আত্মা থেকে আসে, সেটা মান্য করো। আমি সেই ব্যক্তির ধর্মের ভক্ত, যে আমাকে পবিত্র ভালোবাসা দান করেছে এবং পবিত্র চিন্তার অধিকারী করেছে। এর থেকেই ধরে নিয়েছি, তার ধর্মই মহান হবে। লোকটা আমাকে আমার স্বপ্নের ভূমি হেজাজ নিয়ে যাচ্ছিলো। তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?
আমরা মানুষের আদেশের কাছে দায়বদ্ধ। সৈনিক বললো।
আমি আল্লাহর হুকুমের পাবন্দ। রাদী বললো।
তোমার আল্লাহ তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন- অপর এক সৈনিক বললো- এখন তুমি আমাদের কাছে দায়বদ্ধ। গন্তব্যে পৌঁছে ভেবো খোদাকে কীভাবে খুশি করবে। প্রয়োজন হলে কোন নেক কাজ করবে। হয়তো খোদা তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আমি জানি, তোমরা আমাকে কোথায় এবং কেন নিয়ে যাচ্ছো রাদী বললো আমার অস্তিত্বটা আপাদমস্তক পাপ হয়ে যাবে এবং আমি কোন নেক কর্ম করতে পারবো না।
কোন পুণ্যের কল্পনাও তুমি করতে পারবে না- এক সৈনিক বললো- তুমি পাপের সৃষ্টি। পাপের মাঝে লালিত-পালিত। একজন পাপিষ্টের সঙ্গে ঘর পালিয়েছে। কী পুণ্য করবে তুমি?
সেই নিরপরাধ মানুষগুলোর রক্তের প্রতিশোধ নেবো, তোমরা যাদেরকে হত্যা করেছে। রাদী দাঁত কড়মড় করে বললো।
