মুসলমানদের হজ্বযাত্রী কাফেলাকে তারা হত্যশ করে ফেলেছে হুসামুদ্দীন কমান্ডারকে বললেন- কাফেলা হেজাজ পর্যন্ত পৌঁছতে পারলো না। সেই হতভাগাদের পরিবর্তে আমি তাদের ঘাতকদেরকে হেজাজ প্রেরণ করবো এবং সেখানেই তাদেরকে হত্যা করাবো।
দস্যুরা কাফেলাটা যেখানে লুণ্ঠন ও গণহত্যা করেছিলো, হুসামুদ্দীন বন্দিদেরকে সেখানে নিয়ে যান। ঘটনাস্থলে শিয়াল, নেকড়ে ও শকুনের খাওয়া লাশগুলো ছড়িয়ে আছে। হুসামুদ্দীন বন্দিদের দ্বারা কবর খনন করান। জানাযা পড়িয়ে সবকটি লাশ দাফন করে ফেলেন। তিনি কায়রোর নির্দেশ ছাড়াই বন্দিদেরকে একটি জাহাজে করে জেদ্দার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন। জেদ্দায় নামিয়ে তাদের এই বার্তাসহ হেজাজের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেয়া হয়, এদেরকে যেনো মিনার মাঠে হত্যা করা হয়। বার্তায় তিনি এদের, অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেন।
ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ এই খৃস্টান দস্যু সৈনিক এবং তাদের কমান্ডারের হত্যাকাণ্ডে বেশ মাতামাতি করেছেন এবং ইতিহাসের পাতায় অনেক বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পরিবেশন করেছেন। তাদেরকে তারা যুদ্ধবন্দি আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু কোন্ যুদ্ধে বন্দী হয়েছে, সে কথা উল্লেখ করেননি। তারা কোন দুর্গ কিংবা রণাঙ্গন থেকে বন্দি হয়নি। বন্দী হয়েছিলো কাফেলা, লুণ্ঠণকারী ডাকাতদের ঘাঁটি থেকে। মুসলিম ঐতিহাসিকগণ প্রকৃত ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। তাদের লেখনী থেকে প্রমাণিত হয়, এই সিদ্ধান্তটা ছিলো নৌ-বাহিনী প্রধান হুসামুদ্দীন লুলুর একান্তই নিজস্ব, যার সম্পর্কে সুলতান আইউবী সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলেন।
***
খৃস্টান দস্যু কমান্ডার যে নর্তকী সম্পর্কে বলেছিলো, তাকে সেদিন সন্ধ্যায়ই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, সে হলো রাণী। কমান্ডারের জবানবন্দী মোতাবেক মেয়েটাকে এতো দ্রুত পাঠিয়ে দেয়ার একটি কারণ হলো, মেয়েটি ঘোড়ার নীচে পড়ে আহত হয়েছিলো। যেহেতু তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তাই তার চিকিৎসারও প্রয়োজন ছিলো। তাছাড়া কমান্ডার তাকে কাছে রেখে কোন প্রকার দুর্নাম মাথায় নিতে চাচ্ছিলো না।
যে সময়ে কমান্ডার হুসামুদ্দীনকে এসব জবানবন্দী দিচ্ছিলো, ততোক্ষণে রাদী চারজন খৃস্টান সৈন্যের সঙ্গে সেখান থেকে বহুদূর পৌঁছে গিয়েছিলো। সে ঘোড়ায় চড়া। এতোক্ষণে তার শারীরিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। পথে সে সৈন্যদের কয়েকবারই বলেছিলো, তোমরা আমাকে কায়রো দিয়ে আসো, আমি তোমাদেরকে বিপুল পুরস্কার দেবো। কিন্তু সৈন্যরা তাতে সম্মত হয়নি। অবশেষে এক সৈনিক বললো- তুমি দেখতে পাচ্ছো আমরা তোমাকে রাজকন্যার ন্যায় নিয়ে যাচ্ছি। তুমি এতো রূপসী এবং তোমার শরীরে এমন যাদু আছে যে, যাকেই ইঙ্গিত করবে, সে-ই তোমার পায়ে এসে জীবন দেবে। তথাপি আমরা তোমর দেহ থেকে চার পা দূরে থাকছি। কারণ, তুমি আমাদের কাছে আমানত। আর এই আমানত আমাদের সম্রাটদের, যারা কিনা ক্রুশের রাজা। আমরা যদি তোমার প্রস্তাব মেনে নেই কিংবা তোমাকে আমাদের সম্পদ মনে করি, তাহলে আমাদেরকে না সম্রাটগণ ক্ষমা করবেন, না ক্রুশ।
আমাদের গন্তব্য কোথায়? রাদী জিজ্ঞেস করে।
অনেক দূর- একজন উত্তর দেয়- সফর অনেক কঠিন ও দীর্ঘ। আমাদেরকে এমন সব অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করতে হবে, যেগুলো মুসলমানদের দখলে।
চার খৃস্টান সৈনিক রাদীকে আসলেই রাজকন্যার ন্যায় নিয়ে যাচ্ছিলো। এক সৈনিক জিজ্ঞেস করে- তোমাকে কোন শাসনকর্তা কিংবা বড় কোন ব্যবসায়ীর মেয়ে মনে হচ্ছে। পরিবারের সঙ্গে হজ্বে যাচ্ছিলে, না?
কেউ কি তোমাদেরকে বলেনি, আমি নর্তকী?- রাদী উত্তর দেয় আমার পিতা নেই। কোন ভাই নেই। আমার মা ইসমাঈলার বিখ্যাত নর্তকী ও গায়িকা। আমি তার কোন্ খদ্দেরের কন্যা আমার জানা নেই। মা শৈশবেই আমাকে নাচের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। নাচ-গান আমার ভালো লাগতো। ষোল-সতের বছর বয়সে মা আমাকে বড় এক ধনী লোকের ঘরে পাঠিয়ে দেন। লোকটা বৃদ্ধ ছিলো। মদে মাতাল ছিলো। আমাকে বললো, আমি তোমার প্রেমে পাগল হয়ে যাচ্ছি। বৃদ্ধের প্রতি আমার ঘৃণা জন্মে যায়। আমার হৃদয়ে অনুভূতি জাগে, আমার পিতা নেই। বৃদ্ধকে দেখে আমার মনে পিতার কল্পনা এসে যায়। কিন্তু বৃদ্ধ আমার সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করতে শুরু করে। তাতে আমি বুঝে ফেললাম, এই লোক আমার পিতা নয়- খদ্দের। আমি বৃদ্ধের কবল থেকে পালিয়ে গেলাম। মাকে বললাম। মা বুঝালেন, এটা তোমার পেশা। আমি মানলাম না। মা আমাকে মারধর করলেন। আমি বললাম, আমি নাচবো, গাইবো, কিন্তু কারো ঘরে যাবো না। মা আমার শর্ত মেনে নেন।
এবার বিত্তশালীরা আমাদের ঘরে আসতে শুরু করে। কারো ঘরে যাচ্ছি না বলে আমার দাম বেড়ে যায়। তিন বছর কেটে গেছে। এ সময় আমার মনে বাসনা জাগে, যদি এমন একজন সচ্চরিত্রবান পুরুষ পেয়ে যেতাম, যে আমার রূপ উপভোগ এবং নাচানোর পরিবর্তে আমাকে ভালোবাসবে, যার মধ্যে কোন বিলাসিতা ও বদমায়েশী থাকবে না। অবশেষে আমি একজন পুরুষ পেয়ে গেলাম। লোকটা দুবার আমার ঘরে এসেছিলো। আমার তাকে ভালো লাগতো। বয়সে আমার চেয়ে সাত-আট বছরের বড়। আমরা ঘরের বাইরে মিলিত হতে শুরু করলাম। দুজনের মাঝে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠলো। লোকটা রাজপুত্র ছিলো। মদপান করতো।
