***
মাঠে প্রদীপের আলোতে গল্প-গুজবকারী খৃস্টান দস্যুদের সংখ্যা কমে গেছে। অনেকেই যার যার অবস্থানে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে আছে অল্প কজন। হুসামুদ্দীন বলে দেন যতো বেশিসংখ্যাক সম্ভব দস্যুকে ধরে নিয়ে আসবে। কমান্ডার তাতে আপত্তি উত্থাপন করে বললো আমি এদের থেকে প্রতিশোধ নিতে চাই। হত্যা করে করে আমি এদের মৃতদেহগুলো শৃগাল-শকুন ও মরু শিয়ালের আহারের জন্য এখানে ফেলে রাখতে চাই। আপনি তাদেরকে জীবিত গ্রেফতার করে তাদের সম্রাটদের সঙ্গে কোন সওদা করতে চাচ্ছেন কি?
না- হুসামুদ্দীন বললেন- আমারও প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছা আছে। আমাদের সেই মুসলমান কয়েদীদের রক্তের বদলা নিতে হবে, যাদেরকে খৃস্টানদের এক যুদ্ধবাজ সম্রাট অনাথ আক্রা নিয়ে হত্যা করেছিলো। যুদ্ধবন্দীদের হত্যা করা আইনত অবৈধ। কিন্তু অনাথ প্রথমে আমাদের সকল বন্দিকে উপোস রাখে, তাদের দ্বারা কঠিন কঠিন কাজ করায়। তারপর এক সারিতে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। ঘটনাটা সাত বছর আগের। আমি জীবনেও এই স্মৃতি ভুলতে পারবো না। আজ প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ পেয়ে গেছি। আমি এ কথা শুনতে প্রস্তুত নই যে, খৃস্টান দস্যুরা আমাদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে এসে মারা গেছে। তাদেরকে জীবিত ধরে নিয়ে আসো। তবে আমি তাদেরকে জীবিত রাখবো না। খৃস্টানরা আমাদের বন্দিদেরকে যেভাবে হত্যা করেছিলো, আমি তাদেরকে ঠিক সেভাবেই হত্যা করবো।
হুসামুদ্দীনের সৈন্যরা তিনটি পথে এগিয়ে গিয়ে মাঠে ঢুকে পড়ে। তারা মাঠের স্থানে স্থানে প্রজ্বলমান প্রদীপ থেকে নিজেদের বাতিগুলো জ্বালিয়ে নেয়। যে কজন জাগ্রত ছিলো, তারা নেশার ঘোরে গালাগাল করতে শুরু করে। তারা যুদ্ধ করার পজিশনে নেই। আক্রমণকারী সৈন্যরা তাদেরকে জীবিত বন্দি করার পরিবর্তে তরবারীর আঘাতে হত্যা করতে শুরু করে। হট্টগোল শুনে ঘুমন্তরা জেগে ওঠে। কী ঘটছে বুঝে ওঠার আগেই অধিকাংশ বর্শাবিদ্ধ হয়ে যায়। তারা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার সুযোগ পেলো না। গুহাসম কক্ষগুলো থেকে কয়েকজন বর্শা ও তরবারী নিয়ে বেরিয়ে আসে। তাদের কতিপয় মারা পড়ে এবং বাকিরা অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। তাদের নাইট এমনভাবে অচেতন পড়ে আছে যে, তার পরিধানে পোশাক নেই। সে গালাগাল করতে শুরু করে। মুসলিম সৈন্যদেরকে সে নিজের সৈন্য মনে করেছে। তার কক্ষ থেকে তিনটি মুসলিম মেয়ে বেরিয়ে আসে।
অন্যান্য কক্ষগুলো থেকেও আরো কয়েকটি মেয়ে বের হয়। তারা সকলে মুসলমান। অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তারা মুসলিম সৈন্যদেরকে সম্ভবত দস্যুদের অন্য কোন দল মনে করেছে। সে কারণে তারা ভয়ে জড়সড় হয়ে গেছে। কিন্তু পরে যখন বুঝতে পারলো, এরা মুসলিম সৈনিক, তখন তারা পাগলের ন্যায় আচরণ করতে শুরু করে। তারা কাঁদছে এবং দাঁত কড়মড় করে খৃস্টান দস্যুদের গালাগাল করছে। কেউ কেউ মুসলিম সৈন্যদেরকে কাপুরুষ বলে ভর্ৎসনা করছে যে, তোমরা যদি বীর মুসলমান হয়ে থাকে, তাহলে এদেরকে হত্যা করছো না কেন? তোমাদের কি বোন-কন্যা নেই? আমাদের সম্ভ্রম কি তোমাদের বোন কন্যাদের ন্যায় মূল্যবান নয়?
হুসামুদ্দীন ও স্থল বাহিনীর কমান্ডার কক্ষে কক্ষে তল্লাশি নিতে শুরু করেন। এখন বাইরে কোন যুদ্ধ নেই। দস্যুদেরকে আলাদা এক জায়গায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। সশস্ত্র সৈন্যরা তাদের ঘিরে রেখেছে।
***
সকালে যখন খৃস্টানদের নেশার ঘোর কাটে, তখন তারা সমুদ্রের কূলে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উপবিষ্ট। হুসামুদ্দীন মেয়েগুলোকে জাহাজে তুলে রাখেন। বন্দিদের সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচশত। অন্যরা মারা গেছে। তারা টিলার অভ্যন্তরে যেসব মালামাল ও নগদ অর্থ জমা করে রেখেছিলো, সেগুলো খৃস্টান বন্দীদের দ্বারা বহন করিয়ে সমুদ্রকূলে নিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কমান্ডার থেকে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে, তাতে জানা গেলো, এটি বিখ্যাত খৃস্টান সম্রাট রেনাল্ড ডি শাইতুনের বাহিনী। মুসলিম কাফেলাগুলো লুণ্ঠন করার জন্য এদেরকে এখানে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। কিছুদিন পর সেনা বদল হয়। নতুন একদল আসে তো আগের দল চলে যায়। লুণ্ঠিত অর্থ-সম্পদের একটা অংশ সৈন্যদেরকে দেয়া হয়। অবশিষ্টগুলো সম্রাটের নিকট পাঠিয়ে দেয়া হয়। উট-ঘোড়াগুলো সব রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে যায়।
মেয়েদের ব্যাপারে নির্দেশ ছিলো, অল্পবয়স্ক অসাধারণ রূপসী মেয়েদেরকে খৃস্টানদের হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে দিতে হবে। সেখানে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যৌবনপ্রাপ্ত হওয়ার পর গুপ্তচরবৃত্তি এবং নাশকতার জন্য মুসলমানদের অঞ্চলে প্রেরণ করা হতো। কোন যুবতী মেয়ে যদি অতিশয় সুন্দরী হতো, তাহলে তাকেও হেডকোয়ার্টারের হাতে তুলে দেয়া হতো। অন্যান্য মেয়েদেরকে এই খৃস্টান সৈন্যরা নিজেদের কাছে রেখে দিতো।
এই কাফেলায়ও কিশোরী মেয়ে ছিলো নিশ্চয়ই। কটা ছিলো? হুসামুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
বারো-চৌদ্দটা- খৃস্টান কমান্ডার বললো- মাত্র একটাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
আর অন্যরা?
সব কটা খুন হয়েছে।
কাফেলার যে কজন পুরুষকে নিয়ে এসেছিলো তাদেরকে মালপত্র বহন করার জন্য আনা হয়েছিলো। পরে তাদেরকেও হত্যা করা হয়েছে।
খৃস্টান কমান্ডার যুবতী মেয়েদের সম্পর্কে জানায় তাদের মধ্যে একজন নর্তকী ছিলো। অতিশয় রূপসী মেয়ে। তার দেহ-রূপ ও নাচ ঠিক সেই মানের ছিলো, যার জন্য আমরা মেয়ে সংগ্রহ করে থাকি। মেয়েটাকে সেদিন সন্ধ্যায়ই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দেয়ার কারণ হচ্ছে, এমন মূল্যবান ও আকর্ষণীয় একটি মেয়ের সৈনিকদের মাঝে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোন সৈনিক তাকে মুক্ত করার টোপ দিয়ে ভাগিয়ে নিতে পারতো।
