পথ দেখানোর জন্য তোমাকে আমাদের সঙ্গে যাওয়া প্রয়োজন হুসামুদ্দীন বললেন- কিন্তু এই শরীরে যাবে কী করে? চেহারাটা তোমার লাশের ন্যায় সাদা হয়ে গেছে। তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন।
আমি এক্ষুনি আপনার সঙ্গে যেতে প্রস্তুত- লোকটি বললো- আমি বিশ্রাম করতে পারি না। এই সফরে যদি ক্লান্তিতে আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়, তো আমি প্রস্তুত আছি। ডাকাতদের কবলে আমাদের মেয়েদের না জানি কী পরিণতি ঘটেছে। এই নিষ্পাপ মেয়েগুলাকে হায়েনাদের কবল থেকে উদ্ধার করা আমার ঈমানী কর্তব্য। এই কর্তব্য পালনে আমি জীবন বিলিয়ে দিতে চাই।
দস্যুদের সংখ্যা কত? হুসামুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
পাঁচশরও বেশি হবে। লোকটি উত্তর দেয়।
পাঁচশত লোক যথেষ্ট হবে?- হুসামুদ্দীন স্থল বাহিনীর কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করেন- আমারও সঙ্গে থাকা প্রয়োজন।
হবে- কমান্ডার উত্তর দেয়- তন্মধ্যে অন্তত একশত অশ্বারোহী এবং অবশিষ্ট পদাতিক হবে। আমাদেরকে কমান্ডো অভিযান চালাতে হবে। সে জন্য গন্তব্যে পৌঁছা পর্যন্ত নীরবতা বজায় রাখতে হবে। ঘোড়া যতো বেশি হবে, শোরগোলের আশঙ্কা ততো বেশি হবে। আমি এর থেকে জায়গাটার অবস্থান ভালোভাবে বুঝে নিয়ে এখনই রওনা হয়ে যাবো। এমনিতেই এর এসে পৌঁছুতে বিলম্ব হয়ে গেছে। আমাদের যতো দ্রুত সম্ভব পৌঁছে যাওয়া দরকার। আমি দিকটা অনুমান করে নিয়েছি। আশা করি সন্ধ্যায় রওনা হলে মধ্যরাত নাগাদ পৌঁছে যেতে পারবো।
ছোট মিনজানিক সঙ্গে নেবে- হুসামুদ্দীন বললেন- তরল দাহ্য পদার্থের পাতিল এবং সলিতাওয়ালা তীরও রাখবে। আর একে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্রাম করতে দাও। সকলকে বলে দেবে, মোকাবেলা দস্যুর সঙ্গে নয়- অভিজ্ঞ খৃস্টান সৈন্যদের সঙ্গে হবে।
স্থল বাহিনীর কমান্ডার লোকটাকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায়।
***
দস্যুদের ঘাঁটিটা দুর্গের মতো শক্ত ও দুর্ভেদ্য। টিলাগুলো আঁকাবাঁকা এমন দুর্গম পথ তৈরি করে রেখেছে যে, চির চেনা না হলে ঢুকলে আর বের হওয়া সম্ভব নয়। মধ্যখানে বিস্তৃত একটা মাঠ। মাঠের চতুর্পাশ্বের টিলাগুলোর ভেতরে খৃস্টানরা অসংখ্য উঁচু ও লম্বা-চওড়া কক্ষ তৈরি করে রেখেছে। উট-ঘোড়ার থাকার জায়গা আলাদা। হুসামুদ্দীনের স্থল বাহিনীর নির্বাচিত ইউনিটটি পুরোপুরি নীরবতা বজায় রেখে মধ্যরাতের আগেই উক্ত অঞ্চলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। খৃস্টানরা ধরা পড়ার কিংবা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বোধ হয় কখনো অনুভব করেনি। অন্যথায় এদিক-ওদিক প্রহরার ব্যবস্থা করে রাখতে।
হুসামুদ্দীন ঘোড়াগুলোকে পেছনে রাখেন, যাতে তাদের তুষারব দুমশনের কানে না পৌঁছে। বাহিনীর কমান্ডার চারজন সৈনিক নিয়ে একটি গলির মধ্যে ঢুকে পড়ে। এদিক-ওদিক মোড় ঘুরিয়ে অনেক ভেতরে চলে যায়। এবার ঘোড়র ক্ষীণ শব্দ তার কানে আসতে শুরু করে। কমান্ডার একটা উঁচু টিলার উপর উঠে যায়। কমান্ডো আক্রমণ এবং লুকিয়ে লুকিয়ে টার্গেটে পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার ওস্তাদ কমান্ডার। টিলার উপরটা চওড়া। কমান্ডার সেখান থেকে নেমে আরেকটি টিলার উপর চড়ে। মানুষের হাঙ্গামার মতো শব্দ শুনতে পায়। সে সেখান থেকেও নেমে পড়ে। এবার অপর এক গলিতে ঢুকে হাঁটতে শুরু করে। হঠাৎ নিকট থেকে কারো কথা বলার শব্দ শুনতে পায়। কমান্ডার তার সৈনিকদের ইশারা করে। সকলে অস্ত্র তাক করে টিলার সঙ্গে গা ঘেঁষে এগুতে থাকে। সামনে মোড়।
দুজন লোক কথা বলতে বলতে মোড়ে এসে পৌঁছে। কণ্ঠে বুঝা যাচ্ছে, লোকগুলো মদ খেয়ে এসেছে। সৈনিকদের অতিক্রম করে পা চারেক অগ্রসর হওয়া মাত্র পেছন থেকে সৈনিকরা তরবারীগুলো তাদের পার্শ্বে ঠেকিয়ে ধরে। কমান্ডার বললো- শব্দ করবে তো মেরে ফেলবো।
সেখান থেকে তাদেরকে দূরে এক স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো। তারা জীবন বাঁচাতে তাদের ঘাটির কথা বলে দেয় এবং সেখানে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেয়। মুসলিম কমান্ডার তাদের একজনকে সঙ্গে করে উপরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে দস্যুদের আস্তানা দেখা যায়। উপর থেকে দেখে কমান্ডার অবাক হয়ে যায়। এই জাহান্নামসম অঞ্চলটাকে খৃস্টানরা জান্নাতের দৃশ্য বানিয়ে রেখেছে। যেখানে পথিকরা পিপাসায় জীবন হারায়, সেখানে এরা মদপান করছে। মদ খেয়ে অনেকে এদিক-ওদিক বেহুশ পড়ে আছে। লোকগুলো প্রশস্ত মাঠটায় দলে দলে বিভক্ত হয়ে নানা কাজে ব্যস্ত। কোন দল মদপান করছে। কোন দল গল্প-গুজবে মেতে আছে। কোন দল বসে বসে গান গাইছে। এক স্থানে একটি মেয়ে নাচছে। তার চার পাশে অসংখ্য দর্শকের ভিড়। স্থানে স্থানে প্রদীপ জ্বলছে।
যখন বড় কোন কাফেলা লুট করা হয়, এরূপ উৎসব তখনই পালন করা হয়। তিন-চার রাত চলে। খৃস্টান বন্দি বললো।
কতজন আছে?
প্রায় ছয়শত- বন্দি জবাব দেয়- কমান্ডার একজন নাইট। এ সময়ে তার মেয়েদের নিয়ে পড়ে থাকার কথা।
কমান্ডার টিলার চূড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাঠের পরিসংখ্যানটা নিয়ে নেয়। প্রদীপের আলোতে যা কিছু দেখা যাচ্ছিলো, দেখে নেয়। যা কিছু দেখা যাচ্ছে না, বন্দি তার তথ্য দেয়। লোকগুলোকে হঠাৎ ঘিরে ফেলে কীভাবে কাবু করে ফেলা যায়, কমান্ডার সেই পরিকল্পনাই ঠিক করছে। পরে কয়েদীটাকে সঙ্গে নিয়ে নীচে নেমে আসে। অপর কয়েদীও সঙ্গীদের নিয়ে হুসামুদ্দীনের নিকট চলে যায় এবং অভিযান কিরূপ হতে পারে ধারণা দেয়।
