রাদী অনেকক্ষণ পর্যন্ত প্রেমিক সহযাত্রীর সঙ্গে অবস্থান করে। লোকটার সঙ্গে তরবারী নেই। আছে একটা খঞ্জর। রাদীকে সঙ্গে রেখে তার মাথা ও মুখমণ্ডলটা এমনভাবে ঢেকে রাখে, যেনো কেউ বুঝতে না পারে এটি মেয়ে। সে পদাতিক দস্যুকে পেছন থেকে খঞ্জর দ্বারা আঘাত হানে। আঘাত এতো তীব্র হয় যে, সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রটা বের করে আনা সম্ভব হলো না। দস্যু মোড় ঘুরিয়ে লোকটির পাজরে বর্শার ন্যায় তরবারীর আঘাত হানে। তারপর দুজনই লুটিয়ে পড়ে যায়। দস্যু ও রাদীর সহযাত্রী প্রেমিক মারা যায়।
দস্যুর পিঠে তীরভর্তি তূনীর বাধা ছিলো এবং কাঁধে ধনুক ঝুলছিলো। রাদী হুনীর ও ধনুকটা খুলে নেয়। এরা তিনজন অবস্থান স্থলের একধারে ছিলো। নিকটেই কিছু সরঞ্জাম পড়ে ছিলো। তন্মধ্যে তবুও ছিলো। রাদী মালামাল ও তাঁবুর স্তূপের আড়ালে লুকিয়ে যায়। তার সমুখ দিয়ে খৃস্টান দস্যুদের ঘোড়াগুলো ছুটে অতিক্রম করছে। রাদীর ধনুক থেকে এক একটি তীর বেরিয়ে যাচ্ছে আর অশ্বারোহী দস্যুরা উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছে। এভাবে মেয়েটি কয়েকজন অশ্বারোহী দস্যকে ফেলে দেয় এবং তার তীর খেয়ে অনেকগুলো ঘোড়া নিয়ন্ত্রণহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে থাকে।
রাদীকে এতোক্ষণ কেউ দেখতে পায়নি। এবার সে এক আরোহীর গায়ে তীর ছুঁড়লে তীরটা ঘোড়ার ঘাড়ে গিয়ে বিদ্ধ হয়। ঘোড়াটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোড় ঘুরিয়ে চক্কর খেয়ে খেয়ে রাদী যে মালপত্র ও তাঁবুর আড়ালে লুকিয়ে ছিলো, সেগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। পিঠের আরোহী ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে। স্কুপের ভেতর থেকে একটা চীৎকার ভেসে আসে। ঘোড়াটা রাদীর ঠিক উপরে পড়েছে। তবে পশুটা এখনো মরেনি। তার ঘাড়ে তীর বিদ্ধ হয়ে আছে। পরপরই উঠে দাঁড়িয়ে ঘোড়াটা এলোপাতাড়ি ছুটতে শুরু করে। আরোহী উঠে দাঁড়াবার পর আঁৰু ও মালপত্রের স্কুপের মধ্যে একটা মাথা দেখতে পায় নারীর মাথা। আরোহী তাঁবু সরিয়ে দেখে অতিশয় এক রূপসী লুকিয়ে আছে। মেয়েটা উঠে দাঁড়াতে পারছে না। তবে সংজ্ঞাহীনও নয়। খৃস্টান দস্যু তাকে তুলে দাঁড় করালে সে কোঁকাতে শুরু করে।
***
দুদিন পর। হুসামুদ্দীন এক নৌ-জাহাজে কেবিনে বসে আছেন। দরজায় করাঘাত পড়ে। স্থল বাহিনীর এক ইউনিট কমান্ডার দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। তার সঙ্গে অপর এক ব্যক্তি, যার চেহারা ফ্যাকাশে এবং লাশের ন্যায় সাদা।
খৃস্টান দস্যুরা বিশাল এক কাফেলা লুট করে ফেলেছে- কমান্ডার হুসামুদ্দীনকে বললো- এই লোকটি তাদের বন্দিদশা থেকে পালিয়ে এসেছে। বিস্তারিত এর নিকট শুনুন।
কাফেলার উপর কিভাবে আক্রমণ হলো, ক্ষয়ক্ষতি কী হলো, এখন কী অবস্থা লোকটি হুসামুদ্দীনকে বিস্তারিত শুনিয়ে বললো- আমরা অনেক মোকাবেলা করেছি। কিন্তু আমাদের ঘোড়াগুলো তখনো যিনছাড়া বাঁধা ছিলো। অন্যথায় আমরা তাদেরকে সফল হতে দিতাম না। কাফেলার অল্প কজন মানুষ জীবিত আছে। তারা সকলে দস্যুদের হাতে বন্দী। আমার মনে হচ্ছে, এতোক্ষণে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। আমিও তাদের হাতে বন্দি ছিলাম। আমরা না হয় পুরুষ। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের পাঁচটি যুবতী মেয়ে এবং দশ বারোটি কিশোরী তাদের আয়ত্তে রয়েছে। কাফেলায় বহু মূল্যবান মালামাল ছিলো। সকলের কাছে নগদ অর্থ ছিলো। নব্বইটি ঘোড়া এবং প্রায় দেড়শত উট ছিলো।
এখন তারা কোথায়? হুসামুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
সেখানে ভয়ানক খাড়া খাড়া টিলা আছে- লোকটি উত্তর দেয় টিলাগুলোর মধ্যে দস্যুরা কক্ষের ন্যায় গুহা তৈরি করে রেখেছে। তাদের কাছে পানির সম্ভার আছে। মনে হচ্ছে, সেটা তাদের স্থায়ী ঘাঁটি। বিজন-বিরান হওয়া সত্ত্বেও জায়গাটা বিরান মনে হচ্ছে না।
আগন্তুক যে জায়গাটার কথা বললো, সেটির অবস্থান সমুদ্র থেকে বিশ মাইল দূরে। সে বললো- কয়েকজন দস্যুও আমাদের তরবারী বর্শার আঘাতে মারা গেছে। কিন্তু বেশি ক্ষয়ক্ষতি আমাদের হয়েছে। আমরা যে কজন জীবিত ছিলাম, তাদেরকে তারা ওখানে নিয়ে গেছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের সমস্ত উট-ঘোড়া ও সমুদয় মালপত্র তুলে তাদের ঘাটিতে নিয়ে যায়। তারা রাতে মদপান করে এবং আমাদের সমস্ত মালপত্র খুলে খুলে দেখতে শুরু করে। তাদের একজন নেতাও আছে। মেয়েগুলোকে তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। আমি মেয়েগুলোকে পরে আর দেখিনি। তারা আমাদের দ্বারা মালামাল বহন করিয়ে প্রশস্ত একটি গুহায় রাখা ছিলো। অনেকগুলো প্রদীপ জ্বলছিলো। আমার অধিকাংশ সঙ্গী আহত ছিলো। আমি তাদের বলে রেখেছিলাম, আমি পালাবার চেষ্টা করছি। তাদেরই একজন আমাকে বললো, নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারলে সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করবে। সেখানে আমাদের বাহিনীর টহল নৌকা পেয়ে যাবে। তাতে আমাদের সৈন্য থাকবে। আমাদের ঘটনাটা তাদেরকে অবহিত করে ব্যবস্থা নিতে বলবে। আমার মনে পড়ে যায়, আমরা যখন মিসরের সীমান্ত অতিক্রম করছিলাম, তখন সেখানে আমাদের বাহিনীর সঙ্গে দেখা হয়েছিলো। তারা আমাদেরকে বলেছিলো, পথে কোন সমস্যায় পড়লে নদীর তীরে চলে যাবে। সেখানে আমাদের বাহিনী আছে। তারা তোমাদের সাহায্য করবে। যা হোক, দস্যুরা মদ মাতাল হয়ে উঠতে শুরু করলো। আমরা মালপত্র সরিয়ে গুহায় রাখছিলাম। আমি অন্ধকারে পালাবার সুযোগ পেয়ে গেলাম। কিন্তু টিলা এলাকাটায় পথ পাচ্ছিলাম না। দুবার ঘুরে ফিরে যেখান থেকে পলায়ন করলাম, সেখানেই পৌঁছে গেলাম। আমি আল্লাহকে স্মরণ করলাম। কুরআন তেলাওয়াত করতে শুরু করলাম এবং মধ্য রাতের অনেক পর টিলাময় অঞ্চল থেকে বেরিয়ে এলাম। নদীটী কোন দিকে আন্দাজ করতে পারলাম না। আমি এলোপাতাড়ি হাঁটতে শুরু করলাম। ভোর নাগাদ এতোটুকু দূরে চলে এলাম যে, এখন আর দস্যুরা আমাকে খুঁজে পাবে না। সারাটা দিন আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকি। সঙ্গে পানির ছোট্ট একটি মশক ছিলো। অল্প কটা খেজুরও ছিলো। আল্লাহর ইচ্ছায় এই পানি আর খেজুর আমাকে বাঁচিয়ে রাখলো। দুপুর পর্যন্ত পা টেনে টেনে হাঁটলাম। ক্লান্তিতে শরীরটা অবশ হয়ে আসে। এখন আর পা চলছে না। আমি একটি বালির ঢিপির পাদদেশে পড়ে গেলাম। আমার ঘুম এসে গেলো। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আমার চোখ খুলে। আকাশে তারকা উজ্জ্বল হলে দিক নির্ণয় করতে সক্ষম হলাম। আমি হাঁটতে শুরু করলাম। দীর্ঘক্ষণ পর আমি সমুদ্রের ঘ্রাণ অনুভব করতে শুরু করলাম। আমি বাতাসের বিপরীত পথে এগুতে শুরু করলাম এবং সম্ভবত রাতের শেষ প্রহরে নদীর তীরে এসে পৌঁছি। এবার গন্তব্যে এসে পৌঁছেছি ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বিশ্রামের জন্য অবসন্ন দেহটা মাটিতে এলিয়ে দেই। আমার দুচোখের পাতা বুজে আসে। যে লোকটি আমাকে জাগিয়ে তুললো, তাকে সৈনিক বলে মনে হলো। আমি কূলে একটি নৌকা বাঁধা দেখলাম। তার মধ্যে সৈন্য দেখলাম। তারা সকলে আমার নিকট চলে আসে। আমি তাদের ঘটনাটা শোনালাম। তারা আমাকে নৌকায় তুলে নিয়ে আহার করায় এবং এখানে নিয়ে এসে এই কমান্ডারের হাতে তুলে দেয়। কমান্ডার আমাকে আপনার কাছে নিয়ে আসে।
