সুলতান আইউবীর আদেশ ছিলো এরকম- লোহিত সাগরে দুশমনের নৌ-বহরের সঙ্গে তোমার মোকাবেলা হবে না। তুমি বরং স্থলে ওঁৎ পেতে সেই দস্যুদের পাকড়াও করে ফেলবে, যারা মুসলমানদের কাফেলাগুলো লুণ্ঠন করছে। আমি জানতে পেরেছি, এই দস্যুরা খৃস্টান সৈন্য, যারা সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে এবং উপরের আদেশে এই লুটতরাজ চালাচ্ছে। এরা নদীর কূলে কূলে থাকে। তুমি বাছাই করে একদল সৈন্য নিয়ে যাও এবং নদীতে টহল দিতে থাকো। যেখানেই ডাকাতরা আছে বলে সন্দেহ হবে, সেখানেই সৈন্যদেরকে নৌকায় করে নামিয়ে ডাঙ্গায় পাঠিয়ে দেবে এবং ডাকাতদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবে। আমার পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তুমি ওখানে থাকবে।
আদেশ পাওয়ামাত্র হুসামুদ্দীন চলে যান। সে যুগে রোম উপসাগর ও এর মাঝে সংযোগের জন্য সুইজ খাল ছিলো না। আপনি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে এবং তার উপর সুইজ উপসাগর দেখতে পাবেন। এই নদীটির পশ্চিম তীরে মিসর এবং পূর্ব তীরে সৌদি আরবের অবস্থান। উত্তরে সিনাই মরু এবং দক্ষিণে লোহিত সাগরের অবস্থান। মিসরের অনেক হজ্ব কাফেলা উট-ঘোড়াসহ নৌকায় করে এই সুইজ উপসাগর অতিক্রম করে থাকে। তবে অধিকাংশ কাফেলাই স্থল পথেই গমনাগমন করে থাকে এবং লোহিত সাগরের কূল ঘেঁসে সফর করে। কেননা, গরমের দিনে সমুদ্রতীর ঠাণ্ডা থাকে।
হুসামুদ্দীন সেখানে পৌঁছেই স্থলে হানা দিতে শুরু করেন এবং কয়েকজন ডাতাতকে ধরে হত্যা করে ফেলেন। কিন্তু তাদের একজনও খৃস্টান সৈন্য নয়।
***
একদিন হুসামুদ্দীন সংবাদ পান, মিসর থেকে বিশাল একটি কাফেলা রওনা হয়েছে। এতোক্ষণে কাফেলাটির আরব সাহারায় এসে পৌঁছানোর কথা। হুসামুদ্দীন যাযাবরের বেশে জনাচারেক সৈন্যকে সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তারা কোথাও কোন কাফেলার সন্ধান পেলো না।
এটি একটি হতভাগ্য কাফেলা। তারা নীর কূল থেকে অনেক দূর দিয়ে পথ চলছিলো। একদিন কাফেলা এক স্থানে যাত্রাবিরতি দেয়। কাফেলায় হজ্বযাত্রীও ছিলো, ব্যবসায়ীও ছিলো। অনেকে গোটা পরিবার নিয়ে যাচ্ছিলো। সদস্যদের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ, কিশোর এবং যুবতী মেয়েও ছিলো। উট-ঘোড়ার সংখ্যা ছিলো অনেক। লোকসংখ্যা কমপক্ষে ছয়শত। সবাই খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়ে।
কাফেলা রাতের শেষ প্রহরে জাগ্রত হয়। এখনো অন্ধকার। একজন আযান দেয়। সকলে তায়াম্মুম করে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করে এবং রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। হঠাৎ একদিক থেকে উচ্চকণ্ঠে হুঙ্কার ভেসে আসে- সামান বেঁধে না। সকলে একধার হয়ে দাঁড়িয়ে যাও। কেউ মোকাবেলা করার চেষ্টা করলে মেরে ফেলবো।
কাফেলার মধ্যে এক ভীতিকর গুঞ্জরণ শুরু হয়ে যায়- ডাকাত! ডাকাত!
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কাফেলার লোকেরা দেখলো, মরু পোশাক পরিহিত শত শত মানুষ তাদের ঘিরে চারদিকে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে ঘোড়ায় সওয়ার। কারো হাতে বর্শা। কারো হাতে তলোয়ার। কাফেলার লোকদের সংখ্যা অনেক। ফলে অবস্থানের জায়গাটাও বেশ বিস্তৃত। ডাকাতরা ঘেরাও সংকীর্ণ করতে শুরু করে। কাফেলার সদস্যরা মুসলমান। মোকাবেলা ছাড়া অস্ত্র ফেলে দেয়া তাদের রীতি নয়। তারা জানে, এ ধরনের কাফেলার উপর আক্রমণ হয়ে থাকে। সে কারণে তারা সকলে সশস্ত্র এবং যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত।
নারী ও শিশুদেরকে মধ্যখানে এক স্থানে একত্রিত করে ফেলো এক ব্যক্তি অনুচ্চস্বরে বললো। এক কান দুকান করে এই নির্দেশনা সব কানে পৌঁছে গেলো।
মহিলা ও শিশুরা অবস্থান স্থলের মধ্যখানে যেতে শুরু করে। কাফেলার ভেতর থেকে তরবারী বেরিয়ে আসে। কিছু বর্শাও দেখা যাচ্ছে। ডাকাতরা চতুর্দিক থেকে একযোগে কাফেলার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরক্ষণেই ঘোড়ার ছুটাছুটি, হাঁক-ডাক ও তরবারীর সংঘাতের শব্দ শোনা যেতে শুরু করে। নারী ও শিশুদের আর্ত-চীঙ্কার ভেসে ওঠে হট্টগুলোর মধ্যে মিশে যাচ্ছে। দস্যুরা অধিকাংশ অশ্বারোহী। সকলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ সৈনিক। কাফেলা মোকাবেলায় তাদের সঙ্গে পেরে ওঠছে না। তৰু তারা দৃঢ়পদে লড়ে যাচ্ছে এবং মুহুর্মুহু তাকবীর ধ্বনি দিয়ে চলছে। একটি শব্দ বারংবার শোনা যাচ্ছে মেয়েদেরকে মধ্যখানে রাখো। মেয়েদেরকে আলাদা হতে দিও না।
একটি মেয়ে উচ্চস্বরে হাঁক দেয়- তোমরা আমাদের চিন্তা করো না, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি।
কাফেলার লোকেরা যদি ঘোড়ায় আরোহণ করার সুযোগ পেতো, তাহলে তারা ভালোভাবে লড়াই করতে পারতো। কিন্তু তাদের ঘোড়াগুলোয় তখনো যিন বাঁধা হয়নি। ফলে তারা দস্যুদের ঘোড়ার নীচে পিষে যেতে থাকে। সংঘর্ষে কাফেলার লোকদেরই বেশি ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া নারী-শিশুদেরকে আগলে রাখতে হচ্ছে বলে তারা প্রয়োজন অনুসারে ঘুরে-ফিরে মোকাবেলা করতে পারছে না।
কাফেলায় সাত-আটটি যুবতী মেয়ে ছিলো। তন্মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী এক নর্তকীও ছিলো। তার নাম রাদী। পেশার প্রতি বিরক্ত ও বিতৃষ্ণ হয়ে আত্মার শান্তি লাভের জন্য মেয়েটি হজ্বে যাচ্ছিলো। সঙ্গে তার প্রেমিক। এই লোকটিকেই আশ্রয় করে মেয়েটি তার মনিবদের থেকে পালিয়ে এসেছে। এখনো তারা বিয়ে করেনি। কথা ছিলো পবিত্র মক্কায় গিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করে হজ্ব পালন করবে।
