বৈঠক শেষ হলো। সুলতান আইউবী গোয়েন্দা উপ-প্রধান হাসান ইবনে আবদুল্লাহ এবং গেরিলা বাহিনীর অধিনায়ক সারেম মিসরী ছাড়া অন্যদের বিদায় করে দেন।
আমার অনুমান সঠিক প্রমাণিত হয়েছে- সুলতান আইউবী তাদেরকে বললেন- আমার জানা ছিলো, খৃস্টানরা মসুল ও হালবে গোপনে তাদের ঘাঁটি স্থাপনের চেষ্টা করবে এবং আমাদের ভাইয়েরা তাদের পূর্ণ সহযোগিতা দেবে। তোমরা এহতেশামুদ্দীনের জবানবন্দি শুনেছো যে, বল্ডউইন ও অন্যান্য খৃস্টানরা অদূরে কোথাও যুদ্ধ সরঞ্জাম ও দাহ্য পদার্থ ইত্যাদির সমাবেশ ঘটাচ্ছে। তোমরা জানো, আমাদের যেমন রসদ প্রয়োজন, তেমনি তাদেরও আবশ্যক। দুপক্ষের যাদের রসদ নিঃশেষ কিংবা ধ্বংস হয়ে যাবে, তারা অর্ধেক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যাবে। আমাদের কতিপয় সৈন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে মসুল ও হালবের মাঝে বসে আছে। আমি তাদেরকে ইযযুদ্দীন ও ইমাদুদ্দীনের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার জন্য বসিয়েছি। এখন বৈরুতের সঙ্গেও এই দুই অঞ্চলের পথ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। এই অভিযান খানিকটা কঠিন ও বিপজ্জনক হবে। কেননা, গেরিলাদেরকে তাদের অবস্থান থেকে বেশ দূরে চলে যেতে হবে।
আমি চিন্তা করে দেখবো, অভিযানটা কঠিন না সহজ- সারেম মিসরী বললেন- তাছাড়া কঠিনকে সহজ করা আমার কর্তব্যও তো বটে। আপনি আদেশ করুন।
কোন কাফেলা চোখে পড়লে গতিরোধ করবে- সুলতান আইউবী বললেন- তল্লাশি নেবে। সংঘাত হলে রীতিমতো যুদ্ধ করবে। বেশি বেশি কয়েদী বানাবার চেষ্টা করবে।
আর হাসান!- সুলতান হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে উদ্দেশ করে বললেন- তুমি আমাকে একটা কাজ করে দেখাও। তথ্য নাও, খৃস্টানরা দাহ্য পদার্থ এবং অস্ত্রের ডিপো কোথায় সমবেত করছে। হতে পারে কাজটা তারা করেও ফেলেছে। তুমি স্থানটা চিহ্নিত করো, সেগুলো ধ্বংস করার ব্যবস্থা আমি করবো।
সেই ব্যবস্থাও আমিই করবো ইনশাআল্লাহ। সারেম মিসরী বললেন। একটা বিষয় মাথায় রাখবে, কিছুদিন পর্যন্ত আমাদের যুদ্ধ কানামাছি খেলার ন্যায় হবে- সুলতান আইউবী বললেন- খৃস্টানরা মুখোমুখি যুদ্ধ করার পরিবর্তে গেরিলা ও নাশকতামূলক যুদ্ধ লড়বে। তারা সম্ভবত তাদের উপর আক্রমণ করার জন্য আমাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমি সেই বোকামী করবো না। তারা আমার জন্য কয়েকটি স্থানে ওঁৎ পাতবে। আমি সর্বাগ্রে সেই আমীরদেরকে সঙ্গে জুড়ে নেবো, যারা খৃস্টানদের বন্ধুতে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাদের কাছে আমি সাহায্য ভিক্ষা চাইবো না। এখন আমি তরবারীর আগা দ্বারা তাদের থেকে সাহায্য নেবো। তাদের যে কারো রক্ত ঝরাতে আমি কুণ্ঠিত হবো না। এরা নামের মুসলমান। যে মুসলমান কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে, সেও কাফের হয়ে যায়। এখন আর আমি এই পরোয়া করি না, ইতিহাস আমাকে কী বলবে। আজ যদি কেউ বলে, অনাগত বংশধর আপনাকে ভাইয়ের ঘাতক বলবে কিংবা গৃহযুদ্ধের অপরাধে অপরাধী বলবে, তবু আমি আমার প্রত্যয় থেকে ফিরে আসবো না। আমি ইতিহাস ও অনাগত বংশধরদের নিকট নয়- আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করবো। আল্লাহ ছাড়া নিয়তের খবর আর কেউ জানে না। আমার পুত্রও যদি আমার ও ফিলিস্তীনের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়, তবে আমি তাকেও খুন করে ফেলবো। আজ যদি আমরা প্রথম কেবলাকে খৃস্টানদের হাত থেকে মুক্ত না করি, অহলে কাল তারা কাবা গৃহকেও দখল করে নেবে। আমাদের আমীর ও শাসকদের গতিবিধি প্রমাণ করছে, তারা রাজা হবে এবং তাদের সন্তানরাও রাজা হবে। এই লোকগুলো ফিলিস্তীনকে ইহুদীদের দখলে নিয়ে দেবে। এখন তরবারী ছাড়া আমার কাছে আর কোন প্রতিকার নেই।
আমরা আপনার আদেশের অপেক্ষায় অপেক্ষমান- সারেম মিসরী বললেন- আপনি যদি আমাকে মতামত প্রদানের অনুমতি দেন, তাহলে আমি বলবো, যারা কেন্দ্র থেকে স্বায়ত্তশাসন কিংবা আধা-স্বায়ত্তশাসনের আবেদন করছে, তাদেরকে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি দেয়া উচিত।
আমি তাদেরকে শাস্তি দেবো। সুলতান বললেন।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সারেম মিসরী ও হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে যুদ্ধ বিষয়ে দিক-নির্দেশনা প্রদান করে বিদায় করে দেন।
হাসান ইবনে আবদুল্লাহ ও সারেম মিসরী বিদায় গ্রহণ করেন। সুলতান আইউবী অপর একটি বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তিনি যখন বৈরুত থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে নাসীবায় ছাউনি স্থাপন করেছিলেন, তার কিছুদিন আগে লোহিত সাগরের পূর্বাঞ্চল সম্পর্কে রিপোর্ট পেয়েছিলেন, খৃস্টান সৈন্যরা উক্ত অঞ্চলে কাফেলা লুণ্ঠন করে ফিরছে। তারা শুধু মুসলমান কাফেলাগুলো লুট করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, ধন-সম্পদ ছাড়া উট-ঘোড়াও নিয়ে যাচ্ছে এবং স্বল্পবয়সী ও যুবতী মেয়েদেরকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। মিসরের হজ্ব কাফেলাগুলো যাওয়ার সময় এই লুটতরাজের প্রবণতা বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই দস্যুদের প্রতিহত করতে হলে রীতিমতো সামরিক অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু অতো সৈন্য তো সুলতান আইউবীর নেই। তাছাড়া তার এসব নিয়ে ভাববারই বা সময় কোথায়। তার মাথায় তো চেপে বসে আছে ফিলিস্তীন আর সেইসব মুসলিম আমীর, যারা তলে তলে খৃস্টানদের সঙ্গে আপোস ও সাহায্যের চুক্তি করে বসে আছে।
আপনারা পড়ে এসেছেন, বৈরুত অবরোধে সুলতান আইউবী নৌ বহরও ব্যবহার করেছিলেন, যার সেনাপতি ছিলেন হুসামুদ্দীন লুলু। অবরোধ শুরুতেই ব্যর্থ হয়ে গেলে সুলতান হুসামুদ্দীনকে বার্তা প্রেরণ করেন যেনো বহরটা ইস্কান্দারিয়া নিয়ে যান। তার পরপরই কায়রো থেকে সংবাদ আসে, খৃস্টানরা কাফেলা লুণ্ঠন করাকে রীতিমতো পেশা বানিয়ে নিয়েছে এবং এখন একটি কাফেলাও গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে না। সুলতান আইউবী কায়রোকে কোন জবাব দেয়ার পরিবর্তে নৌ-বাহিনী প্রধান হুসামুদ্দীনকে আদেশ প্রেরণ করেন, যেন তিনি তার বহরের যে অংশটি লোহিত সাগরে অবস্থান করছে, তার নেতৃত্ব হাতে তুলে নেন।
