আমি উপস্থিত সকলকে, বিশেষভাবে এহতেশামুদ্দীনকে বলতে চাই, সালার তার শাসনকর্তার এতোটুকু গোলাম হয়ে যায় যে, তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তার ভুল নির্দেশও মান্য করে, সেই সালার আপন জাতির মর্যাদার ঘাতকে পরিণত হয়। জাতির মর্যাদার মোহাফেজ আমরা। সালতানাতের মালিক রাজা কিংবা সুলতান নয়- দেশের জনগণ। বর্তমানে আমরা যে কাল অতিক্রম করছি, এটা সৈনিকের যুগ। এটা জিহাদের যুগ। খলীফা এবং সুলতান যদি নৈতিকতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা না করেন, তাহলে আল্লাহর সৈনিকগণ তাদেরকে এমন শত্রু মনে করবে, যেনো তারা ইহুদী-খৃস্টান। আর যখন এহতেশামুদ্দীনের ন্যায় আল্লাহর সৈনিকদের উপরও সুলতান হওয়ার নেশা চেপে বসবে, তখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুর লাশের উপর গীর্জার ঘণ্টা বাজতে শুরু করবে।
ইসলামের প্রতিটি যুগই সৈনিকের যুগ- সুলতান আইউবী বললেন- যতোদিন পর্যন্ত ইসলাম জীবিত আছে, কাফেররা ইসলামের শই থাকবে। আজ আমাদের সালারদের অন্তরে সম্মান-সুখ্যাতির যে বাসনা জন্মলাভ করেছে, তা কোন একদিন ইসলামকে নিয়ে ডুবে মরবে। আমি দেখতে পাচ্ছি, ইসলাম বেঁচে থাকবে তবে সেই সিংহের ন্যায়, যে ভুলে গেছে সে বনের রাজা। এরূপ সিংহ ভেড়া-বকরিকেও ভয় করে থাকে। মুসলমান কাফেরদের আঙ্গুলের ইশারায় নাচবে। পৃথিবীতে আল্লাহর সৈনিক থাকবে; কিন্তু তার হাতে তরবারী থাকবে না। থাকেও যদি তা হবে কোন খৃস্টানের উপহার, যার কোষ থেকে বের হতে হলে খৃস্টানদের অনুমতির প্রয়োজন হবে।
সুলতান বলতে বলতে থেমে যান। তিনি চোখ ঘুরিয়ে সকলকে এক নজর দেখে নেন এবং বললেন- আমিও আলাপচারিতায় জড়িয়ে পড়েছি। আমার বন্ধুগণ! আমাদেরকে কাজ করতে হবে। আমরা যদি এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি যে, এই পাপ কার, এই ভুল কার এবং কে সত্য, কে মিথ্যা- তাহলে আমরা কথাই বলতে থাকবো। কথা শেষ হবে না। এখন হাল্ব ও মসুলের গবর্নরদ্বয় খৃস্টানদের সঙ্গে কী চুক্তি সম্পাদন করেছে এবং আমাদেরকে কোন্ জাতীয় শত্রুর সঙ্গে কী রকম যুদ্ধ করতে হবে, এহতেশামুদ্দীন তার বিবরণ প্রদান করবে।
***
এহতেশামুদ্দীন উঠে সকলের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ায়। সকলের প্রতি একবার দৃষ্টি বুলিয়ে বলতে শুরু করে
আমার বন্ধুগণ! আমি তোমাদের দৃষ্টিতে তাচ্ছিল্য ও রোষ দেখতে পাচ্ছি। আমি যে অপরাধ করেছি, তার জন্য তোমরা আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারো। কিন্তু আমি তোমাদের জন্য একটা শিক্ষার উপকরণ। আমি একটা নমুনা। কথা ঠিক যে, আমি মসুলের শাসনকর্তা ইযযুদ্দীনের সন্তুষ্টির জন্য নিজের ঈমান ক্রয় করেছি, তার দূত হয়ে বৈরুত গিয়েছি এবং খৃস্টানদের নিকট সাহয্য কামনা করেছি। তবে এ কথাও ঠিক, যে যাদু আমার বিবেক ও ঈমানকে কজা করে নিয়েছে, তোমরাও তার থেকে রক্ষা পাবে না। তোমাদের কোন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সেনা অধিনায়ক কি বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে ধরা পড়েনি? তাদের অনেকে তো এমন ছিলো, যাদের উপর সুলতান আইউবীর এতোটুকু আস্থা ছিলো, যতোটুকু আস্থা আছে তার নিজের উপর। কিন্তু তারা ঈমান নিলামকারী প্রমাণিত হয়েছে। আমি তোমাদেরকে বলতে চাই, মানবীয় স্বভাবে এমন একটি দুর্বলতা আছে, যেটি মানুষকে বিলাসিতার পথে ঠেলে দেয়। আর যেখানে দিন-রাত সারাক্ষণ ক্ষমতা আর সমাজে অপরাধ বিস্তারের উৎসাহ দানকারী আলোচনা চলে, সেখানে একজন অতি বুযুর্গও বিলাসপ্রিয় এবং পাপাচারী হয়ে ওঠেন। তখন যে কেউ আমীর এবং সুলতান হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তোমরা যদি আমাকে অপরাধী মনে করো, তাহলে আমার মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দাও। তবে যদি আমাকে তওবা করার সুযোগ দান করো, তাহলে ইসলামের মর্যাদার সুরক্ষা এবং সালতানাতে ইসলামিয়ার সম্প্রসারণে আমি তোমাদের অনেক সহযোগিতা করতে পারি।
খৃস্টানরা সম্ভবত তোমাদের মুখোমুখি যুদ্ধ করার ঝুঁকি নেবে না এহতেশামুদ্দীন বললো- তারা আমাদেরকে আমাদেরই তরবারী দ্বারা হত্যা করার আয়োজন সম্পন্ন করেছে। আমাদেরকে নিঃশেষ করতে তাদের একজন সৈন্যকেও প্রাণ দিতে হবে না। তারা মুসলমানকে মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াবার জন্য একদলকে সাহায্য দিচ্ছে। এই ছোট-বড় মুসলিম এমারত ও প্রজাতন্ত্র- যেগুলো মূলত বাগদাদের খেলাফতের প্রদেশ- সকলে তলে তলে খৃস্টানদের গোলাম হয়ে গেছে, যাতে তারা স্বাধীন থাকতে পারে। কেন্দ্র থেকে সটকে স্বাধীন তখনই–কা যায়, যখন শত্রুর সাহায্য মিলে। তাদের নীতি হলো, শত্রুর নিকট থেকে সাহায্য নাও আর নিজের ভাইকে শত্রু বলো। গৃহযুদ্ধে যে কোন এক পক্ষ সঠিক ও দেশপ্রেমিক হয়ে থাকে। অপূরপক্ষ হয় শত্রুর বন্ধু। শত্রু তাদেরকে নিষ্ঠার সাথে সহযোগিতা দেয় না। তারা নিজেদের স্বার্থে ও নিজেদের মতলবে একদল মুসলমানকে সাহায্য দিয়ে থাকে। খৃস্টানরা তোমাদের প্রতিপক্ষকে সাহায্য দিচ্ছে। তারা মসুলে তাদের গেরিলা বাহিনীর আস্তানা গড়তে যাচ্ছে। বহুদিন পর্যন্ত তারা গেরিলা ও কমান্ডো যুদ্ধ লড়বে। এভাবে পর্যায়ক্রমে হাবকে এবং অন্য সকল মুসলিম প্রজাতন্ত্রকে আস্তানা বানিয়ে সেগুলোকে তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। মসুল থাকাকালে আমি জানতে পেরেছি, খৃস্টানরা মসুলের সামান্য দূরে পাহাড়ী এলাকায় বিপুল অস্ত্র ও সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখবে। তাতে অনেক দাহ্য পদার্থ থাকবে! সেগুলোকে তারা গেরিলা অপারেশনে ব্যবহার করবে এবং পরে প্রকাশ্য যুদ্ধেও। তারা অনেকগুলো মুসলিম প্রজাতন্ত্রে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি স্থাপনের পর প্রকাশ্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। সেই অস্ত্র ও দাহ্য পদার্থগুলো ঠিক কোন্ স্থানে রাখা হবে, তা অবশ্য আমি জানতে পারিনি। এ তথ্য সংগ্রহ করা আপনাদের গোয়েন্দাদের কাজ।
