কাবার প্রভুর কসম! আমি হাল্ব ও মসুল দখল করতে চাই না সুলতান আইউবী বার কয়েক বললেন- আমি কোন মুসলিম প্রজাতন্ত্রের উপর দিয়ে বাহিনী অতিক্রম করাতেও পছন্দ করি না। আমার একটাই কামনা, এই আমীর ও শাসকগণ খৃস্টানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাক। তারা সকলে বাগদাদের খেলাফতের অফাদার হয়ে যাক, যা কিনা কুরআনেরই নির্দেশ। আমি তাদেরকে আমার পদানত করে রাখবো না। আমি খলীফা নই- খলীফার একজন অনুসারী এবং সেবক মাত্র।
তাদের ভয় হলো, খেলাফতের অধীনে চলে এলে তাদের বিলাসিতা এবং এখন খৃস্টানদের পক্ষ থেকে নারী ও মদের যে উপহার-উপঢৌকন পেয়ে আসছে বন্ধ হয়ে যাবে। তারা ক্ষমতা আর জগতের মিথ্যা আড়ম্বর ও ভোগ-বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের দৃষ্টিতে সালতানাতে ইসলামিয়ার কোন মর্যাদা নেই।
১১৮৩ সালের শুরুর দিক। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নাসীবার সেনা ছাউনিতে অবস্থান করছেন। এখান থেকে তার বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রা করার কথা। কিন্তু তিনি মুসলিম আমীর-শাসকদের নিয়তে গড়বড় লক্ষ্য করছেন। তিনি জানবার চেষ্টা করছেন, হাল্ব ও মসুলের দুই গবর্নরের গোপন তৎপরতাটা কী এবং খৃস্টানরা কী পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে।
গোয়েন্দা হাসান আল-ইদরীস বৈরুত থেকে এসে তাকে পূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে। সুলতান আইউবী এখন ইযযুদ্দীন-ইমাদুদ্দীনের অবস্থান এবং খৃস্টানদের পরিকল্পনা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিফহাল। হাসান আরো একটি কীর্তির স্বাক্ষর রেখেছে যে, সে ইযযুহীনের এক সামরিক উপদেষ্টা এবং তার এক কন্যাকে- যে কিনা এক সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে খৃস্টানদের ওখানে নর্তকীর কাজ করছিলো- সঙ্গে নিয়ে এসেছে। হাসান আল-ইদরীস সুলতান আইউবীর নিকট এসে জানালো, ইযুদ্দীন বৈরুতে খৃস্টানদের নিকট সাহায্যের জন্য দুজন দূত প্রেরণ করেছেন। এই তথ্যে সুলতান বিস্মিত হননি। তবে এই তথ্যটা ছিলো তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তৎক্ষণাৎ সালারদের ডেকে পাঠান এবং মানচিত্রটা সামনে নিয়ে তাদেরকে পৃস্টানদের পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে দেন।
ইযুদ্দীনের যে দূত বৈরুতে খৃস্টানদের থেকে সাহায্য নিতে গিয়েছিলো, তার নাম এহতেশামুদ্দীন। সুলতান আইউবীর নিকট অর মর্যাদা একজন বন্দির সমান হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সুলতান তাকে সম্মানের সাথে তার সালারদের সঙ্গে বসালেন। এহতেশামুদ্দীনকে প্রায় সকল সালারই চিনতেন। কেউ তার প্রতি তাচ্ছিল্যের চোখে তাকাচ্ছেন। আবার কারো চেহারায় আনন্দের দ্যোতি যে, এহতেশামুদ্দীন তাদের মাঝে উপবিষ্ট এবং তাদের কয়েদী হয়েছে। সুলতান আইউবী হাসান আল-ইদরীসের রিপোর্ট শুনেছেন।
আমি আশা করি আমাদের বন্ধু এহতেশামুদ্দীন নিজেই আপনাদেরকে বলবে, ইযযুদ্দীন ও ইমাদুদ্দীনের নিয়ত কী- সুলতান আইউবী বললেন- আমি এহতেশামুদ্দীনের উপর এই অভিযোগ আরোপ করবো না যে, সে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য খৃস্টানদের সাহায্য নিতে গিয়েছিলো। তাকে মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীন প্রেরণ করেছিলো। এতো ইযযুদ্দীনের কর্মচারি।
সুলতানে মুহতারাম!- এক সালার বললেন- আমি আশা করি, আপনি আমাকে বলতে নিষেধ করবেন না, এহতেশামুদ্দীন তার সরকারের সাধারণ কোন কর্মচারী নয়। লোকটা ইযযুদ্দীনের সামরিক উপদেষ্টা। একজন সেনা অধিনায়ক। গবর্নরকে খৃস্টানদের থেকে সাহায্য নেয়ার পরামর্শ তার না দেয়া উচিত ছিলো।
আমাকে আদেশ করা হয়েছিলো- এহতেশামুদ্দীন উত্তর দেয় আমি যদি আদেশ অমান্য করতাম, তাহলে…।
তাহলে আপনাকে জল্লাদের হাতে তুলে দেয়া হতো- এক নায়েব সালার বললেন- আপনি মৃত্যুর ভয়ে আপনার রাজার এমন একটি আদেশ মান্য করেছেন, যা কিনা নিজ জাতি ও আপন ধর্মের অপদন্তের কারণ। আমরা কি বাড়ি-ঘর, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে এবং স্ত্রী সন্তানদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থেকে ইসলাম ও দেশ-জাতির জন্য কাজ করছি না? দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত আমরা এই পাহাড়ে-পর্বতে ঘুরে ফিরছি এবং এই পাথুরে জমিনের উপর শুয়ে রাত কাটাচ্ছি। অথচ আপনার কিনা হালবের প্রাসাদে রাজা-রাজপুত্রদের ন্যায় জীবন-যাপন করছেন। আপনি মদপান করছেন, ইহুদী-খৃস্টান ও মুসলমান রূপসী নর্তকীরা আপনাদের মনোরঞ্জন করছে। আপনারা পালঙ্কের উপর নরম গালিচায় ঘুমাচ্ছেন। আর আমরা কিনা এই বন-বাদাড়ে, পাহাড়-জঙ্গল মরু বিয়াবানে মরতে বসে আছি। আমাদের সহকর্মীদের লাশ কোথায় কোথায় হারিয়ে গেছে আমরা জানি না। আমাদের সৈনিকদের হাড় কঙ্কাল সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। কোন শহীদের হাড় চোখে পড়লে আপনি বলবেন, এটা মানুষের নয়- পশুর হাড়। ভোগ-বিলাসিতা আপনাদের হৃদয়ে শহীদদের প্রতি কোন শ্রদ্ধা থাকতে দেয়নি। আপনারা শত্রু-বন্ধুকে এক করে ফেলেছেন। আমরা যখন মরতে এসেছি তো আপনাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার নেই।
আহরাম!- সুলতান আইউবী বললেন- এহতেশামুদ্দীন আমার নিকট এসে জীবনের সব পাপের কাফফারা আদায় করে দিয়েছে। তাকে তিরষ্কার করতে হলে আমিও করতে পারতাম।
মহান সুলতান! অপর এক সালার বললেন।
আল্লাহর ওয়াস্তে তোমরা আমাকে শুধু সুলতান নামে ডাকো- সুলতান আইউবী বললেন- আমাকে শান-শওকত থেকে দূরে থাকতে দাও। আমাকে রাজা বানাবার চেষ্টা করো না। আমি একজন সৈনিক। তোমরা আমাকে সৈনিকই থাকতে দাও। আচ্ছা বলো, কী যেনো বলতে চেয়েছিলে?
