পিতা পরাজিতের ন্যায় মেয়েরে প্রতি তাকায়।
সম্রাট বল্ডউইনের সঙ্গে আপনার যে চুক্তি হয়েছে এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করার লক্ষ্যে যে পরিকল্পনা প্রস্তুত ও স্থির, হয়েছে, তা আমাকে বলে দিন- সারা বললো- আমি সুলতানকে এই তথ্য পৌঁছিয়ে দেবো। এর চেয়ে বড় পুণ্য আর কিছু হতে পারে না। আল্লাহ আপনার সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন।
পিতা নীরবে কথা শুনছে। সারা বললো- অন্যথায় আসুন আমরা উভয়ে এখান থেকে পালিয়ে মুক্তি লাভ করি এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট গিয়ে আপনি তাকে সব খুলে বলবেন।
আমি প্রস্তুত- পিতা বললো- কিন্তু এখান থেকে আমরা বের হবো কীভাবে?
ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সারা বললো।
পিতা কন্যাকে বুকে জড়িয়ে নেয় এবং ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে।
বৃদ্ধা বেজায় আনন্দিত, সে অনেক মোটা একজন খদ্দের পেয়ে গেছে এবং সারার মতো রূপসী মেয়ে তার শয্যায় রাত কাটাতে চলে গেছে। এখন মনে তার শুধুই আনন্দ। মহিলা জানে, সারা সকালে ফিরে আসবে। কিন্তু সারা রাতের বাকি অংশটুকু অতিবাহিত করেছে হাসান আল ইদরীসের কক্ষে পরিকল্পনা প্রণয়নে। সারা হাসানকে বললো- রাত কাটাতে যার নিকট গিয়েছিলাম, তিনি আমার পিতা। শুনে হাসানের মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। সারা হাসানকে তার পিতার চরিত্র ও নিজের ইতিবৃত্ত শোনায়। সারা জানায়, তিনি এখান থেকে পালিয়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট চলে যেতে প্রস্তুত আছেন।
আমি তোমাকে বলেছিলাম, তোমার লক্ষ্য পবিত্র- হাসান বললো আমি আশাবাদী আল্লাহ তোমার সম্ভ্রম রক্ষা করবেন। আমি তোমার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো এবং প্রস্তুত থাকতে বলবো।
দিনের বেলা হাসান সারার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সাবধানে কথা বলে। তার আত্মমর্যাদা উস্কে দেয়। হাসান অনুভব করলো, লোকটা অত্যন্ত অনুতপ্ত। হাসান তাকে পালাবার সহজ পন্থা বলে দেয়।
সারার পিতাকে পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিয়ে হাসান সারার সঙ্গে দেখা করে। সারার পিতা তার মেজবানদের কাছে আকাঙ্খ ব্যক্ত করে, আমি একাকী একটু বেড়াতে যেতে চাই। তাকে ঘোড়া দেয়া হলো। সঙ্গী দূতকে বলে যান, আমি সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসবো। ঘোড়ায় চড়ে তিনি শহর থেকে বেরিয়ে যান। হাসান ঘোড়ায় চড়ে এক স্থানে তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। সারা লুকিয়ে আছে অন্য এক স্থানে। তিনজন একত্রিত হয়। সারার পিতা তাকে নিজের ঘোড়ায় বসিয়ে নেন। তিনজন নাসীবা অভিমুখে রওনা হয়ে যায়।
তারা অতি সাবধানে পথ চলতে থাকে। অনেক পথ অতিক্রম করার পর এবার দ্রুতবেগে ঘোড়া হাঁকায়। সফর অনেক দীর্ঘ ছিলো। কিন্তু এই পথ তারা একদিন ও একরাতে অতিক্রম করে ফেলে।
সম্রাট বল্ডউইন আকাশটা মাথায় তুলে নেন। বৈরুতের গোয়েন্দাদের জন্য তিনি গজবরূপে আবির্ভূত হন। মসুলের এক দূত পালিয়ে গেছে। এক রাজ নর্তকী- যার সঙ্গে বল্ডউইনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিলো- নিখোঁজ। গলবার্ট জ্যাকব নামক এক নিরাপত্তা কর্মীও উধাও। তিনজনের একজনেরও কোন সন্ধান মিলছে না। বৃদ্ধার জবানও বন্ধ। সারাকে সে রাতে পালিয়ে যাওয়া দূতের কক্ষে প্রেরণ করেছিলো, এ তথ্য দিতে ভয় পাচ্ছে মহিলা।
বৈরুতে মাত্র এক ব্যক্তি জানে এই তিন ব্যক্তির কী হয়েছে এবং কোথায় আছে। তার নাম হাতেম। কিন্তু হাতেম তো অখ্যাত একজন মুচি। তাকে তারাই চেনে, যারা তার দ্বারা ছেঁড়া জুতায় তালি লাগায়। আর চেনে মুচি হিসেবে। কেউ কি জানে, এই ছা-পোষা নিরীহ মানুষটা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একজন গোয়েন্দা নেতা, যিনি বৈরুতের সব খবরাখবর পৌঁছিয়ে দিচ্ছেন,আইউবীর কানে? কোন কিনারা করতে ব্যর্থ হয় বৈরুতের গোয়েন্দারা।
৭.৬ হেজাজের কাফেলা
হেজাজের কাফেলা
হাসান আল-ইদরীস, সারা এবং সারার পিতা সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছে গেছে। সুলতান তাঁর অভ্যাস মতো তাঁবুতে পায়চারি করছেন। সারার পিতা আইউবীকে বল্ডউইনের সঙ্গে তাদের চুক্তি ও পরিকল্পনার বিবরণ প্রদান করে। সুলতান আইউবী তৎক্ষণাৎ তার সালারদের তলব করেন। মানচিত্রটা সামনে মেলে নিয়ে তাদেরকে খৃষ্টানদের পরিকল্পনা বুঝাতে শুরু করেন এবং তার বিপরীতে নিজের পরিকল্পনা ঠিক করে নেন।
হালব ও মসুলের শাসনকর্তা ইযযুদ্দীন ও ইমাদুদ্দীন খৃস্টানদের সঙ্গে যোগসাজশ করেছে এই সংবাদে সুলতান আইউবী বিচলিত বা বিস্মিত হননি। খৃস্টানদের সঙ্গে তলে তলে খাতির পাতানো সে কালের ছোট বড় মুসলিম আমীরদের রেওয়াজে পরিণত হয়েছিলো। তার একমাত্র কারণ ছিলো সুলতান আইউবী তাদের সকলকে এক খেলাফতের অধীনে এনে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু এই আমীরগণ আপন আপন রাজ্য বহাল রেখে তার শাসক হয়ে থাকাকে জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে নিয়েছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিলো, এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে খৃস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাততে হবে।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাসক ছিলেন ইযযুদ্দীন ও ইমামুদ্দীন। ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তৃতি এবং নিরাপত্তার দিক থেকে এদের রাজ্য মসুল ও হাল্ব ছিলো বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। খৃষ্টানদের সর্বাত্মক চেষ্টা ছিলো, কীভাবে মুসলমানদের এই অঞ্চল দুটি দখল করা যায় কিংবা সুলতান আইউবীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা যায়। সুলতান আইউবী যদি এই অঞ্চল দুটি দখল করে নিতে পারেন, তাহলে সৈন্য ও রসদ ইত্যাদির জন্য তা এমন দুটি আস্তানা হয়ে যায়, যেখান থেকে তিনি অতি সহজে বায়তুল মুকাদ্দাসের উপর সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন।
