সারার মুখে কোন কথা নেই, যেনো তার বাকশক্তি হারিয়ে গেছে। ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে বৃদ্ধের প্রতি। দূত ভয়জড়িত এবং বিশ্বায়ভিভূত কণ্ঠে বলে ওঠে- সায়েরা! তুমি সায়েরা? পরক্ষণে মুখে জোরপূর্বক হাসি টেনে বললো- না, মানে আমার এক মেয়ে দেখতে ঠিক তোমার মতো। তার নাম সায়েরা। তোমাকে দেখে হঠাৎ মনে হলো, তুমিই বুঝি সায়েরা।
আমিই আপনার কন্যা সায়েরা- হঠাৎ সারার জবান খুলে যায়। মৃণায় দাঁত কড়মড় করে বললো- আমিই আপনার কন্যা। যারা মহলে মহলে অন্যের মেয়েদের নাচিয়ে বেড়ায়, তাদের মেয়েরাও নাচতে পারে। আমি এক আত্মমর্যাদাহীন পিতার আত্মমর্যাদাহীন কন্যা।
ইযযুদ্দীনের দূত অকস্মাৎ কেঁপে ওঠে। খাটের উপর লুটিয়ে পড়ার মতো করে বসে পড়ে। মুখে কোন কথা নেই। সারা তার কন্যা। পিতা-কন্যার বিরহ ঘটেছে দুবছর হয়েছে।
ঈমান নিলামকারীদের কন্যারা ঈমান নিলামকারীই হয়ে থাকে সারা অগ্রসর হয়ে পিতার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘৃণায় দাঁত কড়মড় করতে শুরু করে। বললো- আজ নিজের আত্মমর্যাদা ও ইয্যতের পরিণতি দেখো। আজ তুমি নিজ কন্যার সম্মুমের খদ্দের। তোমার মেয়ে তোমারই শয্যায় ভাড়ায় রাত কাটাতে এসেছে। সারা বিদ্যুতিতে নিজের একটা হাত সম্মুখে এগিয়ে ধরে বললো- দাও, আমার পারিশ্রমিক বের করো। আমি তোমার সঙ্গে রাত কাটাতে এসেছি।
তু… তু…- সারার পিতার মুখ দিয়ে কথা সরছে না- তুমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলে। আমি নই- তুমিই আত্মমর্যাদাহীন।
যে পিতা নিজ যুবতী কন্যার সামনে কন্যার বয়সী মেয়েদের সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করতে পারে এবং আপন কন্যার বয়সী মেয়েদেরকে নাচাতে ও মদপান করে মাতাল হয়ে তার সঙ্গে কন্যার সম্মুখে অসদাচরণ করতে পারে, সেই পিতার কন্যা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হতে পারে না। তার কন্যাও নর্তকী কিংবা বেশ্যা হতে বাধ্য। পিতা যদি সেই কন্যাকে বিবাহও দিয়ে দেয়, তো সে স্বামীর সঙ্গে প্রতারণা করে এবং তলে তলে একাধিক পুরুষের শয্যায় রাত কাটায়। আমি তোমাকে তোমার অতীত আর আমার নিজের বর্তমান বলছি। আমি দামেশকে তোমার ঘরে যখন বুঝমান হই, তখনই তোমাকে নারী নিয়ে ফুর্তি করতে দেখি। নূরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর পর তুমি আল-মালিকুস সালিহর সঙ্গে হাল্ব পালিয়ে গিয়েছিলো। আমাকে ও মাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে। হালবে গিয়ে মদও পান করতে শুরু করেছিলে। তখন আমি কিশোরী ছিলাম। তোমার নিকট খৃস্টানরা আসতে শুরু কয়েছিলো। তোমার ঘরে মদ এবং নাচ-গানের আসর বসতে শুরু হয়েছিলো। খৃলনরা আমার সঙ্গে অসদাচরণ শুরু করলে তুমি খুশি হয়েছিলো।
তারপর আল-মালিকুস সালিহ মারা গেলেন। তোমার নিকট খৃস্টানদের আনাশোনা আরো বেড়ে গেলো। তুমি আগের চেয়ে বেশি বিলাসী হয়ে ঈমানদী কোন উঠেছিলে। ইযযুদ্দীন তোমাকে অনেক বড় পদমর্যাদা দান করলেন। আমি তোমার নর্তকী মেয়েদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে লাগলাম। তাদের থেকেই আমি নাচ শিখেছি। তুমি জানতে পেয়ে খুশি হয়েছিলে। খৃস্টানরা তোমার সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। তুমি আপত্তি করোনি। তার কারণ; তারা আমার পরিবর্তে তোমাকে ইউরোপের একটি মেয়ে দান করেছিলো। তুমি তোমার ঈমান বিক্রি করে ফেলেছে। সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছো। তোমার নীতি-নৈতিকতা সব শেষ হয়ে গেছে। নিজের মেয়েটাকে পর্যন্ত পাপের পথে ছেড়ে দিয়েছে। তারপর খৃস্টানরা আমাকে সবুজ বাগান দেখায়। আমি তোমার গৃহকে বিদায় জানিয়ে স্বপ্নের স্বর্গের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। আজ রাতের ন্যায় এরূপ আর কজনের শয়নকক্ষে রাত কাটিয়েছি আমাকে সে প্রশ্ন করো না। সেই খৃস্টান আমাকে ভালোবাসার ধোকা দিয়ে বিক্রি করে ফেলে। আমি তোমার ন্যায় বিপুল সম্পদের মালিকদের বিনোদনের উপকরণ হয়ে বৈরুত এসে পৌঁছি। এখানে আমি রাজ নর্তকী। আজ আমার পিতা আমার সম্ভ্রমের গ্রাহক।
ইযুদ্দীনের দূত মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। শরীরটা তার কাঁপছে।
আজ তুমি তোমার ঈমানের মূল্য উসূল করতে এসেছো- সারা তাচ্ছিল্যমাখা কণ্ঠে বললো- তুমি ফিলিস্তীন ও প্রথম কেবলা বিক্রি করতে এসেছে। নিজ কন্যার মূল্য আদায় করতে এসেছে। সারার কণ্ঠ তুঙ্গে উঠে যায়। এটি আমার জীবনের শেষ রাত। আমি পিতার পাপের শাস্তি ভোগ করে এই জগত থেকে বিদায় নিচ্ছি।
সারার পিতা ধীরে ধীরে মাথা উঠায়। তার দুচোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে গড়িয়ে গণ্ডদেশ ভিজিয়ে ফেলেছে। উঠে দাঁড়িয়ে দেয়াল থেকে ঝুলন্ত তরবারীটা খুলে হাতে নেয়। খাপ থেকে বের করে তরবারীটা সারার দিকে এগিয়ে ধরে বলে- এই নাও, নিজ হাতে আমাকে শেষ করে দাও। সম্ভবত এতে তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে।
সারা পিতার হাত থেকে তরবারীটা নিয়ে নেয় এবং বলে- আজ আল্লাহর রাসূলের উম্মত এমন এক অবস্থানে এসে উপনীত হয়েছে যে, পিতা কন্যার হাতে তরবারী দিয়ে যাও প্রথম কেবলাকে এই তরবারী দ্বারা মুক্ত ও আবাদ করে না বলে বলছেন, নাও, এই তরবারী দ্বারা আমাকে খুন করো, আমার পাপের কাফফারা আদায় করো। পিতার আবেগময় অবস্থা এবং অশ্রুসজল চোখ দেখে সারার বলার ধরন পাল্টে যায়। হৃদয়ে পিতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ফিরে আসে। কণ্ঠটা শান্ত করে বললো- মৃত্যুবরণ করে গুনাহের কাফফারা আদায় করা যায় না। একটা পন্থা এও আছে, বেঁচে থাকুন এবং দুশমনকে হত্যা করুন। বলবো কী করবেন?
