সারা বিস্ময়াভিভূত অপলক নয়নে হাসানের প্রতি তাকিয়ে থাকে, যেনো তার চোখ দুটো আটকে গেছে।
হ্যাঁ সারা!- হাসান বললো- এই ত্যাগ তোমাকে দিতেই হবে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী গুপ্তচরবৃত্তির জন্য মেয়েদের কোথাও প্রেরণ করেন না। তিনি বলে থাকেন, এক নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য আমি একটি শক্ত দুর্গ শত্রুকে দিয়ে দিতে রাজি। আমরা নারীর সম্ভ্রমের সংরক্ষক। কিন্তু সারা! তুমি এখানে উপস্থিত আছে। এই মুহূর্তে আমাদেরকে যে কাজটি না করলেই নয়, সেটি কেবল তোমার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন হতে পারে। কোন পুরুষের বিনোদনের উপকরণ হওয়া তোমার পক্ষে নতুন কোন বিষয় নয়। আমি তোমাকে দুএকটি কৌশল বলে দেবো, যার মাধ্যমে তুমি বৃদ্ধের বক্ষ থেকে তথ্য বের করে আনতে পারবে এবং নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারবে। তোমার লক্ষ্য অতিশয় পবিত্র ও মহান। আমি আশাবাদী, আল্লাহ তোমার ইজ্জতের হেফাজত করবেন।
বলো কী করতে হবে- সারা বললো- আমি একটা কুলটা মেয়ে। আল্লাহ যদি আমার থেকে এই কুরবানী নিয়ে খুশি হন, তাহলে আমি দিতে প্রস্তুত আছি।
মনোযোগ সহকারে শোনো- হাসান বললো- এই দূত দুজন মসুলের শাসনকর্তা ইযযুদ্দীনের পক্ষ থেকে এসেছে। আমি নিশ্চিত, তারা বল্ডউইন থেকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে সাহায্য নিতে এসেছে। এ সময়ে আমাদের বাহিনী নাসীবা নামক স্থানে ছাউনি ফেলে অবস্থান করছে। সুলতান এই আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত যে, তিনি তাঁর বন্ধুদের মাঝে অবস্থান করছেন। কিন্তু আসলে তিনি তার মুসলিম শত্রুদের বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছেন। খৃষ্টানরা কিরূপ সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে এবং মসুল, হাল্ব ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি কী হতে পারে, এসব ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে সুলতানকে জানাতে হবে।
হাসান বিস্তারিত বিবরণের মাধ্যমে সারাকে কর্তব্য বুঝিয়ে দেয় এবং শেষে বললো- তুমি আত্মহত্যা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে না। আমি তোমাকে পবিত্র ও আনন্দময় জীবনে অনুপ্রবেশ করাচ্ছি। তুমি নির্যাতিত মেয়ে। সম্ভবত শৈশবে কোন কাফেলা থেকে খৃস্টানরা তোমাকে অপহরণ করে এনেছিলো। তারাই তোমাকে পাপের জীবনে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
না হাসান!- সারা বললো- আমি নিজেই নিজেকে অপহরণ করেছিলাম। সেই কাহিনী পরে একসময় শোনাবো। এখন আমাকে কাজ করতে দাও। দুআ করো আল্লাহ যেনো আমাকে সফল করেন এবং আমি আমার জীবনের সব পাপের কাফফারা আদায় করতে পারি।
বৃষ্টি থেমে গেছে। সারা নিজের পোশাক পরিধান করে হাসানের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। যে ভবনটিতে তার কক্ষ, সেই ভবনে প্রবেশ করামাত্র বৃদ্ধাকে পেয়ে যায়। বৃদ্ধা সারাকে দেখে মুচকি একটা হাসি দিয়ে বললো রাতে প্রস্তুত থাকবে। আমার লোকেরা মসুলের এক দূতের সঙ্গে কথা পাকা করেছে। আজ রাত না কোথাও নাচ-গান হবে, না জেয়াফত আছে। আমি তোমাকে তার কক্ষে দিয়ে আসবে।
আমি প্রস্তুত থাকবে। সারা হাসিমুখে বললো।
***
মসুলের দূত দুজন যেনো ক্ষুধার্ত নেকড়ে। তারা নিজেদের ও ইযুদ্দীনের ঈমান বিক্রি করতে এখানে এসেছে। এসেছে গাদ্দারীতে সফল হওয়ার জন্য খৃস্টান সম্রাট বল্ডউইনের সাহায্য নিতে। এই সম্রাট নিজের স্বার্থ এবং মুসলিম শাসকদেরকে পরস্পর যুদ্ধে জড়িয়ে রাখার লক্ষ্যে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা দিয়ে আসছেন। এই মুসলমান দূতদের মাঝে ঈমান অবশিষ্ট আছে, না ব্যক্তিগত ও জাতীয় মর্যাদার অনুভূতি। সম্রাট বল্ডউইনের মদদে পুষ্ট হয়ে বিলাসী জীবন লাভ করাই এখন তাদের একমাত্র সাধনা। বন্ডউইনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও সন্ধি-চুক্তি সম্পাদনের পর বৈরুত নগরী এবং সমুদ্র ভ্রমণের জন্য এখনো তারা রয়ে গেছে। এই সময়ে মহলের মেয়েদের নেত্রী বৃদ্ধা মহিলা একজন লোক মারফত প্রস্তাব পাঠায়, আপনারা চাইলে এমন এক রূপসী মেয়ের ব্যবস্থা করে দেবো, যেমনটি জীবনে কখনো দেখেননি। প্রস্তাব পেয়ে তাদের জিতে পানি এসে যায়। বিনিময় নির্ধারণের মাধ্যমে মুক্তি পাকাঁপোক্ত হয়ে যায়। তাদের একজনের নিকট পাঠানোর জন্য সারাকে প্রস্তুত করা হয়।
রাতে কালো চাদরে আবৃত করে সারাকে মসুলের এক দূতের কক্ষে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। দূত- যে কিনা মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীনের সামরিক উপদেষ্টাও পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধ- গত রাতে মাত্রাতিরিক্ত মদপান করে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আজ নিজ কক্ষে বসে ধীরে ধীরে অল্প অল্প পান করছেন। কক্ষে বসে বসে সে এমন এক নর্তকীর আগমনের অপেক্ষা করছে, যার রূপের বিবরণ শুনে তার মাথাটা গরম হয়ে আছে।
দূতের কক্ষের দরজা খুলে যায়। একটি মেয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। মেয়েটি আপাদমস্তক কালো চাদরে আবৃত। দরজা বন্ধু হয়ে যায়। দূত মেয়েটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম হয় এবং তার মুখমণ্ডল আবরণমুক্ত হওহ্মার আগেই অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করে তাকে জড়িয়ে ধরে। নিজের বয়সের কথা ভুলে যায় বৃদ্ধ।
সারা তার বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে গায়ের কালো চাদরটা খুলে দূরে ফেলে দেয়। দূতের মুখের প্রতি তাকায়। সহসা মেয়েটির মুখ বিস্ময়ে পাংশু হয়ে যায়। মাথাটা অবনত করে পেছন দিকে সরে যেতে শুরু করে। সরতে সরতে তার পিঠ দেয়ালের সঙ্গে ঠেকে যায়। সারার অনাবৃত মুখটা দেখার পর দূতও হঠাৎ চমকে ওঠে মনে মনে বলে উঠে- সায়েরা!
