আমি যদি কাউকে বলে দিই, তুমি খৃষ্টান নও মুসলমান, তাহলে কী করবেঃ- সারা হেসে জিজ্ঞেস করে- তুমি গোয়েন্দা হতে পারো না। গোয়েন্দারা নিজেদেরকে এভাবে প্রকাশ করে না।
বলে দাও- হাসান বললো- আমি তোমার চোখের সামনে এই ঝড় তুফানের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাবে। তবে সারা! আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তুমি বলবে না।
হাসান আরো সম্মুখে অগ্রসর হয়ে নিজের হাত দুটো পেয়ালার মতো করে সারার মুখমণ্ডলটা তাতে নিয়ে কাছে টেনে আনে। তার চোখে চোখ রেখে ক্ষীণ অথচ ক্রিয়াশীল ও যাদুময় কণ্ঠে বললো- আমি জানি, তুমি কাউকে বলবে না লোকটা জ্যাকব নয়- হাসান। তুমি বলতে পারবেই না। আমাদের শিরায় আল্লাহর রাসূলের প্রেমিকদের রক্ত আছে। এই রক্ত সাদা হতে পারে না। এই রক্ত কাউকে ধোকা দিতে পারে না।
হাসানের চোখ দুটো সারার চোখে আটকে যায়। সারা অনুভব করতে শুরু করে, যেনো এই সুদর্শন যুবকটা সুন্দর একটা ভূতের ন্যায় তার মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের উপর জেঁকে বসেছে। হাসান বলছে- তুমি নাচের জন্য নয় মসজিদে আকসাকে কাফেরদের দখল থেকে মুক্ত করতে জন্মলাভ করেছে। আল্লাহ আমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন। এখন আর বলো না তুমি মুসলমান নও। বলতে পারবেই না। কথা বলো সারা! আমি তোমাকে আমার তথ্য দিয়েই দিয়েছি। আমাকে তুমি তোমার তথ্য দিয়ে দাও। তোমার দেহের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তোমার আত্মাটাকে আমি পবিত্র দেখতে চাই।
সারার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। টল টল করে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। ক্ষীণ স্বরে বললো- হ্যাঁ হাসান! আমি মুসলমান। আমি আমার পিতার পাপের শাস্তি ভোগ করছি। আমি সারা নই- সায়েরা।
পাপটা যারই থাকুক- হাসান বললো- আজ পর্যন্ত আমি তোমার যেসব কথাবার্তা শুনেছি এবং তুমি যে ধারায় কথা বলছিলে, তাতেই আমি ধরে নিয়েছি সেই পাপ তোমাকে দংশন করছে। তুমি খৃস্টানদের বিরুদ্ধে মৃণা এবং মুসলমানদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করছিলে। তাতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে এই দংশন তোমাকে অস্থির করে রাখছে।
যখন থেকে তুমি আমার আত্মাটাকে পবিত্র ভালোবাসায় ধন্য করেছে, আমার কাছে ভোগ-বিলাসিতার এই জীবনটা জাহান্নামের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক অনুভব হতে শুরু করেছে। আমি পাপের মধ্যে লালিত-পালিত হয়ে বড় হয়েছি এবং পাপের মধ্যেই যৌবন লাভ করেছি। সেই পাপের সৌন্দর্য আজ বিষাক্ত নাগিনী হয়ে আমাকে দংশন করছে। এখন আর আমি বেঁচে থাকতে চাই না।
নিজের জীবন হরণ করাও পাপ- হাসান বললো- আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। এটা তার ওয়াদা। তুমি পাপের কাফফারা আদায় করো। তোমার সকল অস্থিরতা-অশান্তি শান্তিতে পরিবর্তন হয়ে যাবে।
বল, কী করবো?- সারা চোখের অশ্রু মুছতে মুছতে বললো- নামায পড়বো? দুনিয়াত্যাগী হয়ে যাবো? বলল হাসান! আমি কিভাবে পাপের কাফফারা আদায় করবো?
গুপ্তচরবৃত্তি- হাসান উত্তর দেয়- মাত্র একবার প্রথম ও শেষবার। আগে লক্ষ্য বুঝে নাও। মানুষের লক্ষ্য যতো মহৎ হয়, মানুষ ততো মহান হয়। জানো, নূরুদ্দীন জঙ্গীর লক্ষ্য কী ছিলো? সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর লক্ষ্য কী? এতো অনেক বড় লোকদের কথা। তাদের মোকাবেলায় আমি কিছুই না। তারপরও তুমি আমার ব্যক্তিসত্ত্বায় এবং আমার চোখে এমন প্রভাব দেখে থাকবে, যা তোমার থেকে সত্য বের করিয়ে ছেড়েছে। এটা মূলত আমার ব্যক্তিত্বের ক্রিয়া নয়। এটা আমার জীবনের লক্ষ্যের ক্রিয়া, যা আমার নিকট ঈমানের চেয়েও বেশি প্রিয়। আমার লক্ষ্যের মহত্ব এবং পবিত্রতার কারণেই তোমার এই রূপ-যৌবন আমার উপর ক্রিয়া করতে পারেনি। কেন পারেনি। কারণ, আমি মানুষ ও বস্তুকে আত্মার চোখে দেখে থাকি।
আমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর লক্ষ্য ভালোভাবে জানি- সারা বললো- আমি এও জানি, খৃষ্টান শাসকবর্গ মুসলিম আমীর ও শাসকদেরকে সাহায্য এবং বিলাসিতার উপকরণ দিয়ে তাদেরকে সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাচ্ছে। আমি আরো জানি, ক্রুসেডাররা ইসলামী জগতটাকে ক্রুশের ছায়ায় নিয়ে আসতে চাচ্ছে। হাসান। সুলতান সালাহুদ্দীন ও খৃস্টানদের এই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আমি এখানে এসে জানতে পেরেছি। অন্যথায় আমিও ক্রুশের বানে ভেসে গিয়েছিলাম। এই বান আমাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। শোনো হাসান! আজ কিছুদিন হলো মসজিদে আকসা আমার হৃদয়ের উপর জয়ী হয়ে আছে। দুরাত আমি স্বপ্নে মসজিদে আকসা দেখেছি। আমি, এ যাবত চর্মচক্ষে এই মসজিদটি দেখিনি। আমি জানি না, মসজিদে আকসা দেখতে কেমন। স্বপ্নে দেখেছি। ভেতরে গিয়েছি। মসজিদটা শূন্য এবং বিরান। আমি একটি কণ্ঠ শুনতে পেলাম- এটি তোমার খোদার ঘর। তুমি একে আবাদ করো। আমি এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতে শুরু করলাম, শব্দটা কোন্ দিক থেকে আসলো। এমন সময় আমার চোখ খুলে যায়। শব্দটা আমার হৃদয়ে গেঁথে যায়। আচ্ছা, আমি কি একেই আমার লক্ষ্য বানাতে পারি না?
এটা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য- হাসান বললো- কিন্তু এর জন্য বহু কুরবানী দিতে হবে। আমি বৈরুতে প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকি। যেদিন ধরা পড়বে, সেদিনটি হবে আমার জীবনের শেষ দিন।
আমি কুরবানী দিতে প্রস্তুত আছি- সারা বললো- আমাকে কর্তব্য বুঝিয়ে দাও।
ঐ বৃদ্ধা তোমাকে মসুলের যে দূতের বিনোদনের জন্য যেতে বলেছে, তুমি তার নিকট চলে যাও। হাসান বললো।
