দরজায় দাঁড়িয়ে সারা হাসছে। এতে মুষলধারা বৃষ্টি পড়ছে যে, বারান্দার বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সারার গায়ের পোশাক আর মাথার চুল থেকে টপ টপ করে পানি ঝরছে।
এই ঝড়ের মধ্যে তুমি আমার নিকট এসেছো? সারাকে ভেতরে আসতে বলে হাসান বললো।
না, জ্যাকব!- সারা উত্তর দেয়- আমি অন্য একজনের নিকট গিয়েছিলাম। পাইনি। গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছে। সারাটা রাত মদপান করেছে আর ফস্টিনষ্টি করেছে। এখন লাশের মতো ঘুমাচ্ছে। জাগবে সেই সন্ধ্যায়। আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিরাশ মনে এদিকে চলে এসেছি। ঝড় আমাকে সামনের দিকে হাঁটতে দিচ্ছিলো না। তোমার কাছে দিনের বেলা আসতে তো কেউ আমাকে ঠেকাতে পারে না।
হাসান একটা কাপড় হাতে নিয়ে সারার মাথার উপর ছড়িয়ে দেয়। তারপর নিজ হাতে সেই কাপড় দ্বারা তার চুলগুলো মুছে দিতে শুরু করে। হাসানের এই অকৃত্রিম আচরণ সারার ভালো লাগে। হাসান তার মুখটাও মুছে দেয়। তারপর একটা চাদর ধরিয়ে দিয়ে বললো- আমি ওদিকে ফিরে থাকছি, তুমি ভেজা কাপড়টা খুলে এটা পেঁচিয়ে নাও।
সারা পরিধানের ভেজা পোশাকটা খুলতে গিয়ে ভাবে, আমার প্রতি লোকটার ভালোবাসা এতই আত্মিক যে, আমার দেহটার সঙ্গে এই প্রেমের কোনই সম্পর্ক নেই নাকি তার অন্তরটা একেবারেই মৃত? সারা যখন হাসানকে বললো, আমি কাপড় পরিবর্তন করেছি, তখন হাসান অন্যদিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে আনে এবং সারার ভেজা কাপড়টা বারান্দায় নিয়ে চিপে শুকাতে দেয়।
এবার বলো, কোথায় গিয়েছিলে?- হাসান জিজ্ঞেস করে- আর রাতে আমার চলে যাওয়ার পর কী হয়েছিলো? মহিলা কি ভেতরে এসেছিলো?
সে সূত্রেই এদিকে এসেছিলাম- সারা উত্তর দেয়- মহিলা কক্ষে প্রবেশ করে শর্ত সাপেক্ষে আমাকে ক্ষমা করার প্রস্তাব দেয়। তুমি আমার কক্ষে এসেছিলে আমি স্বীকার করিনি। তার শর্তটা শুধু এই জন্য মেনে নিয়েছি যে, না হলে তোমার কথা বলতে হতো। তখন আমার সঙ্গে তোমাকেও শাস্তি ভোগ করতে হতো। আর তুমি জানো, শাস্তিটা কতো ভয়ানক হতো। আমি কোন পবিত্র মেয়ে নই। তারপরও মসুলের অতিথি কিংবা অন্য কারো শয়নকক্ষে যাওয়া আমার ভালো লাগে না। আমি নর্তকী ঠিক, কিন্তু বুড়িটা আমাকে যেভাবে খেলনা বানিয়ে রাখতে চায়, আমি তা মেনে নিতে পানি না। আমার নিজের একটা পছন্দ-অপছন্দ আছে। জীবনে বহু পাপ করেছি। কিন্তু কারো উপার্জন কিংবা অন্য কারো পাপের মাধ্যম হতে পারি না। মহিলা আমাকে বললো, এ কাজে তুমিও বিনিময় পাবে। চুপি চুপি দেবো, কেউ টের পাবে না। আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, ঠিক আছে, তোমার কথামতো আজ রাতে আমি মসুলের একজন মেহমানের নিকট চলে যাবে। কিন্তু এখন চেষ্টা করছি, সম্রাটদের বলে দেবো, এই মহিলা মহলে গোপন ব্যবসা চালু করেছে।
আর সে বলে দেবে, রাতে তোমার কক্ষে পুরুষ মানুষ যাওয়া-আসা করছে। হাসান বললো।
বলুক- সারা বললো- আমি এখন যে কোন শাস্তি মাথা পেতে বরণ করে নিতে প্রস্তুত আছি। প্রয়োজনে আত্মহত্যা করতেও প্রস্তুত। মহিলাটার মুখোশ আমি খুলেই ছাড়বো। আমি নর্তকী। বেশ্যাবৃত্তি আমি করবো না। আচ্ছা, নাকি আমিই এগিয়ে গিয়ে বলে দেবো, রাতে তোমার কক্ষে আমি গিয়েছিলাম?- হাসান বললো- বলবো, তোমার সঙ্গে আমার দৈহিক নয়- আবেগের সম্পর্ক রয়েছে।
এ কথাটা যদি বলা যেতো, তাহলে আমি নিজেই বলে দিতাম, আমার কক্ষে জ্যাকব এসেছিলো- সারা বললো- কিন্তু এ তথ্য স্বীকার করা আর নিজেকে ঘোড়ার পেছনে বেঁধে ঘোড় হাঁকানো সমান। কেউই মেনে নেবো না, তোমার-আমার মাঝে আত্মিক সম্পর্ক আছে। এরা মানুষের আবেগ চেতনা সম্পর্কে অবহিত হয়। এদের কাছে সম্পর্ক মানেই দৈহিক। তুমি এ্যালবার্তুকে চিনে থাকবে। ইতালির নাগরিক। একজন সৎ ও হৃদয়বান অফিসার। বল্ডউইনের উপর তার বেশ প্রভাব আছে। শুধু এই একজন অফিসার আছেন, যিনি আমার প্রতি পবিত্র চোখে তাকিয়ে থাকেন। আমি তাকে রাতের ঘটনা শোনাবো এবং নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করার চেষ্টা করবো। যদি আমার এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে আমি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করবো। সমুদ্র যদি আমার লাশটা উগরে দেয়, তাহলে হয়তো তুমি আমাকে দেখবে। অন্যথায় এখনই বিদায়। রোম উপসাগরের মাছ খেলে তাতে আমার দেহের ঘ্রাণ পাবে।
সারা!- হাসান বললো- তুমি খৃস্টান নও। তোমার সহকর্মীদের মধ্যে একটি মেয়েও এমন নেই, যে দৈহিক বিলাসিতা এবং উপহার-উপঢৌকনের প্রস্তাবকে তোমার ন্যায় প্রত্যাখ্যান করবে। আজ অবধি তুমি আমার সঙ্গে যেসব কথাবার্তা বলেছে, তাতে আমি নিশ্চিত হয়ে গেছি, তোমার শিরায় মুসলমানের রক্ত আছে। সেই রক্তই আজ তোমার মধ্যে টগবগ করছে। বলো, আমি কি মিথ্যে বলছি?
সারা হাসানের প্রতি তাকায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো- শোনো জ্যাকব!…
আমি জ্যাকব নই সারা!- হাসান বললো- আমার নাম হাসান আল ইদরীস। বাড়ি সিরিয়া। এখানে এসে জ্যাকব গলবার্ট হয়েছি।
গোয়েন্দা?
অন্য কোন কারণও হতে পারে- হাসান বললো- গুপ্তচরবৃত্তিই একমাত্র কারণ নয়। দেখো, আমরা দুজন একজন অপরজনের আত্মায় ঢুকে পড়েছি। তার কারণ, আমরা উভয়ে মুসলমানের সন্তান। জ্যাকব গোপন একটা জায়গা থেকে জায়নামাযটা বের করে। একস্থান থেকে একটি পাথর সরিয়ে তার পেছন থেকে ছোট্ট এক কপি কুরআন হাতে নেয়। জায়নামায ও কুরআনখানা সারাকে দেখিয়ে বললো- এগুলো ছাড়া আমি থাকতে পারি না। এই মূর্তি, এই ছবি, এই ক্রুশ প্রতারণা মাত্র।
